সপ্তম শ্রেণি: ইতিহাস, অধ্যায় ৪: দিল্লির সুলতানি (তুর্কি-আফগান শাসন) দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
অধ্যায় ৪: দিল্লির সুলতানি
(দীর্ঘ উত্তরধর্মী বা রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: ৫)
📝 ৫ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ ৭টি প্রশ্নোত্তর:
১. সুলতান ইলতুৎমিসকে কেন দিল্লি সুলতানির ‘প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা’ বলা হয়?
উত্তর: কুতুবুদ্দিন আইবক ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লি সুলতানির প্রতিষ্ঠা করলেও, সুলতান ইলতুৎমিসকেই এর প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। এর প্রধান কারণগুলি হলো:
- বিদ্রোহ দমন ও সাম্রাজ্য রক্ষা: সিংহাসনে বসেই তিনি বাংলার বিদ্রোহী শাসক এবং অন্যান্য তুর্কি আমিরদের (যেমন- তাজুদ্দিন ইয়ালদোজ ও নাসিরুদ্দিন কুবাচা) কঠোর হাতে দমন করে সাম্রাজ্যকে টুকরো হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচান।
- মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত: ১২২১ খ্রিষ্টাব্দে দুর্ধর্ষ মোঙ্গল বীর চেঙ্গিজ খান ভারত সীমান্তে উপস্থিত হলে, ইলতুৎমিস অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তাঁকে এড়িয়ে যান এবং নবগঠিত সুলতানি সাম্রাজ্যকে ভয়ংকর ধ্বংসলীলার হাত থেকে রক্ষা করেন।
- খলিফার স্বীকৃতি লাভ: ১২২৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাগদাদের খলিফার কাছ থেকে অনুমোদন বা স্বীকৃতিপত্র লাভ করেন। এর ফলে দিল্লি সুলতানি একটি স্বাধীন ও বৈধ রাষ্ট্রের মর্যাদা পায়।
- প্রশাসনিক সংস্কার: তিনি তাঁর বিশ্বস্ত দাসদের নিয়ে ‘তুর্কান-ই-চিহলগানী’ বা ‘চল্লিশ চক্র’ গঠন করেন এবং ইকতা ব্যবস্থার মাধ্যমে শাসনকাজ সুদৃঢ় করেন। রূপোর ‘তঙ্কা’ ও তামার ‘জিতল’ নামক মুদ্রার প্রচলনও তিনি করেছিলেন।
২. সুলতানা রাজিয়ার শাসনকালের প্রধান কৃতিত্ব ও তাঁর পতনের কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: সুলতানা রাজিয়া (১২৩৬-১২৪০ খ্রিঃ) ছিলেন দিল্লির সিংহাসনে বসা প্রথম ও একমাত্র নারী শাসক।
তাঁর কৃতিত্ব:
- সিংহাসনে বসেই তিনি পুরুষদের মতো পোশাক পরে খোলা মুখে রাজদরবার পরিচালনা করতেন।
- তিনি নিজে হাতির পিঠে চড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিতেন এবং অসাধারণ সাহসিকতার সঙ্গে সাম্রাজ্যের বিশৃঙ্খলা দূর করে শান্তি ফিরিয়ে এনেছিলেন।
পতনের কারণ:
- পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা: সেযুগের তুর্কি আমির-ওমরাহরা একজন নারীর অধীনে কাজ করাকে অত্যন্ত অপমানজনক বলে মনে করত।
- উলেমাদের বিরোধিতা: রাজিয়া পর্দা প্রথা না মানায় এবং পুরুষদের মতো জীবনযাপন করায় গোঁড়া ধর্মীয় নেতারা (উলেমা) তাঁর বিরুদ্ধে চলে যান।
- অ-তুর্কিদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব: তিনি জালালুদ্দিন ইয়াকুত নামক একজন আবিসিনীয় (অ-তুর্কি) দাসকে অত্যন্ত উচ্চ পদে নিয়োগ করেছিলেন, যা তুর্কি আমিরদের তাঁর প্রবল শত্রুতে পরিণত করেছিল। এদের ক্রমাগত ষড়যন্ত্রেই রাজিয়ার পতন ঘটে।
৩. সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের রাজতান্ত্রিক আদর্শ বা শাসননীতি কেমন ছিল?
উত্তর: গিয়াসউদ্দিন বলবন ছিলেন দাস বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং কঠোর শাসক। সুলতানের পদকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি একটি বিশেষ রাজতান্ত্রিক আদর্শ বা শাসননীতি গ্রহণ করেছিলেন:
- ঈশ্বরের প্রতিনিধি (জিল-ই-ইলাহি): বলবন মনে করতেন যে সুলতান হলেন পৃথিবীতে ঈশ্বরের ছায়া বা প্রতিনিধি। সুলতানের ক্ষমতা ঈশ্বরপ্রদত্ত, তাই সাধারণ মানুষ বা আমিররা তাঁর কাজের সমালোচনা করতে পারে না।
- সিজদা ও পাইবস প্রথা: দরবারে সুলতানের সর্বোচ্চ ক্ষমতা বোঝানোর জন্য তিনি পারসিক প্রথা ‘সিজদা’ (হাঁটু গেড়ে সুলতানকে প্রণাম করা) এবং ‘পাইবস’ (সুলতানের পা চুম্বন করা) চালু করেন।
- রক্ত ও লৌহ নীতি (Blood and Iron Policy): তিনি অত্যন্ত কঠোর হাতে সাম্রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। অপরাধী ও বিদ্রোহীদের তিনি নির্মমভাবে হত্যা করতেন।
- চল্লিশ চক্রের বিনাশ: যে ‘চল্লিশ চক্র’ বা তুর্কি অভিজাতরা সুলতানের ক্ষমতার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, বলবন অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে তাদের ক্ষমতা ধ্বংস করেন এবং নিজের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করেন।
৪. আলাউদ্দিন খলজির ‘বাজারদর নিয়ন্ত্রণ’ ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করো।
উত্তর: সুলতান আলাউদ্দিন খলজি তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য রক্ষা এবং ক্রমাগত মোঙ্গল আক্রমণ ঠেকানোর জন্য একটি বিশাল স্থায়ী সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। এই বিপুল সেনাদলকে কম বেতন দিয়েও যাতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারে, সেই উদ্দেশ্যে তিনি ‘বাজারদর নিয়ন্ত্রণ’ ব্যবস্থা চালু করেন।
- জিনিসপত্রের দাম নির্দিষ্ট করা: চাল, ডাল, গম থেকে শুরু করে কাপড়, ঘোড়া এমনকি দাস-দাসীদের দামও সুলতান নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়ার অধিকার কারও ছিল না।
- আলাদা বাজার স্থাপন: খাদ্যশস্য, কাপড় ও ঘোড়ার জন্য তিনি দিল্লিতে আলাদা আলাদা বাজার তৈরি করেন।
- কঠোর নজরদারি: বাজার তদারকি করার জন্য ‘শাহনা-ই-মান্ডি’ এবং ‘দিওয়ান-ই-রিয়াসত’ নামক উচ্চপদস্থ কর্মচারী নিয়োগ করা হয়। গুপ্তচরদের মাধ্যমে সুলতান নিজে বাজারের খবর রাখতেন।
- কঠোর শাস্তি: কোনো ব্যবসায়ী যদি নির্ধারিত দামের বেশি দাম নিত বা ওজনে কম দিত, তবে তাকে অত্যন্ত কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো। ওজনে যতটুকু কম দেওয়া হতো, সেই ব্যবসায়ীর শরীর থেকে ততটুকু মাংস কেটে নেওয়ার নির্দেশ ছিল।
- রেশনিং ব্যবস্থা: দুর্ভিক্ষের সময় যাতে খাদ্যাভাব না হয়, তার জন্য সুলতান সরকারি গুদামে শস্য মজুত রাখতেন এবং আপৎকালীন সময়ে তা সাধারণ মানুষের মধ্যে রেশনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বিতরণ করতেন।
৫. মুহম্মদ বিন তুঘলকের রাজধানী স্থানান্তর এবং তামার মুদ্রা প্রচলনের পরিকল্পনা কেন ব্যর্থ হয়েছিল?
উত্তর: মুহম্মদ বিন তুঘলক ছিলেন অত্যন্ত পণ্ডিত ব্যক্তি, কিন্তু তাঁর কিছু দূরদর্শী অথচ খামখেয়ালি পরিকল্পনা বাস্তবে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল।
রাজধানী স্থানান্তর ব্যর্থ হওয়ার কারণ:
- তিনি সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থলে শাসন করার জন্য এবং মোঙ্গল আক্রমণ থেকে বাঁচতে রাজধানী দিল্লি থেকে ৭০০ মাইল দূরে দেবগিরিতে (দৌলতাবাদ) স্থানান্তরিত করেন।
- কিন্তু তিনি শুধু সরকারি দপ্তর নয়, দিল্লির সমস্ত সাধারণ মানুষ ও পশুপাখিকেও জোর করে দৌলতাবাদে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। দীর্ঘ এবং দুর্গম পথের কষ্টে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। পরে তিনি বুঝতে পারেন, দৌলতাবাদ থেকে যেমন উত্তর ভারত শাসন করা কঠিন, তেমনি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত রক্ষা করাও অসম্ভব। ফলে বাধ্য হয়ে তিনি আবার দিল্লিতে রাজধানী ফিরিয়ে আনেন।
তামার মুদ্রা প্রচলন ব্যর্থ হওয়ার কারণ:
- রুপোর ঘাটতি মেটাতে তিনি রুপোর মুদ্রার বদলে একই মূল্যের তামা বা ব্রোঞ্জের মুদ্রা (টাক্কা) চালু করেন।
- কিন্তু মুদ্রা তৈরির ওপর সরকারের কোনো একচেটিয়া অধিকার বা বিশেষ সিলমোহর তিনি রাখেননি। ফলে ঘরে ঘরে মানুষ নকল তামার মুদ্রা তৈরি করতে শুরু করে। বাজারে নকল মুদ্রায় ছেয়ে গেলে বিদেশি বণিকরা ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। অর্থনীতি ভেঙে পড়ায় সুলতান এই প্রকল্প বাতিল করতে বাধ্য হন।
৬. সুলতানি আমলের ‘ইকতা’ ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করো।
উত্তর: সুলতানি যুগে সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক সুবিধার জন্য যে বিশেষ ভূমি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, তাকেই ‘ইকতা ব্যবস্থা’ বলা হয়। সুলতান ইলতুৎমিস ভারতে এই ব্যবস্থার ব্যাপক প্রচলন করেছিলেন।
- ইকতা কী: সুলতানরা তাঁদের সাম্রাজ্যকে ছোটো ছোটো প্রদেশ বা প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করেছিলেন। এই ভাগগুলিকেই ‘ইকতা’ বলা হতো।
- ইকতাদার বা মুকতি: সুলতান সামরিক সেনাপতি বা রাজকর্মচারীদের নগদ বেতনের বদলে একেকটি ইকতার দায়িত্ব দিতেন। এঁদের বলা হতো ইকতাদার, মুকতি বা ওয়ালি।
- ইকতাদারের দায়িত্ব: ইকতাদারের প্রধান কাজ ছিল নিজের ইকতার এলাকার কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব (ট্যাক্স) আদায় করা এবং এলাকার আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
- সৈন্য পালন ও ফাওয়াজিল: আদায় করা রাজস্ব থেকে ইকতাদার নিজের ও পরিবারের খরচ নিতেন এবং সুলতানের জন্য একদল সৈন্য পালন করতেন। উদ্বৃত্ত বা বাড়তি অর্থ (যাকে ‘ফাওয়াজিল’ বলা হতো) সুলতানের রাজকোষে জমা দিতে হতো। যুদ্ধের সময় এই সৈন্যদের নিয়ে ইকতাদার সুলতানকে সাহায্য করতেন।
- বংশানুক্রমিক নয়: ইকতা ব্যবস্থা বংশানুক্রমিক ছিল না। সুলতান চাইলে যেকোনো সময় ইকতাদারকে এক ইকতা থেকে সরিয়ে অন্য ইকতায় বদলি করতে পারতেন।
৭. পানিপথের প্রথম যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল আলোচনা করো।
উত্তর: ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদি এবং কাবুলের শাসক জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবরের মধ্যে ঐতিহাসিক পানিপথের প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।
যুদ্ধের কারণ:
- ইব্রাহিম লোদির অহংকার: ইব্রাহিম লোদি ছিলেন অত্যন্ত অহংকারী এবং সন্দেহবাতিক। তিনি তাঁর রাজ্যের আফগান অভিজাত ও আত্মীয়দের ওপর অকথ্য অত্যাচার করতেন। ফলে তাঁরা সুলতানের বিরুদ্ধে চলে যান।
- বাবরকে আমন্ত্রণ: ইব্রাহিম লোদির অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পাঞ্জাবের শাসক দৌলত খান লোদি এবং ইব্রাহিমের কাকা আলম খান লোদি, বাবরকে ভারত আক্রমণের আমন্ত্রণ জানান। বাবর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভারত আক্রমণ করেন।
যুদ্ধের ফলাফল:
- ইব্রাহিম লোদির প্রায় এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী থাকা সত্ত্বেও বাবরের মাত্র ১২,০০০ সুশিক্ষিত সৈন্যের কাছে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও নিহত হন।
- বাবরের জয়ের প্রধান কারণ ছিল কামান ও বন্দুকের (গোলন্দাজ বাহিনী) ব্যবহার এবং ‘তুলঘুমা’ নামক এক বিশেষ যুদ্ধকৌশল, যা ভারতীয়দের কাছে সম্পূর্ণ অজানা ছিল।
- এই যুদ্ধের ফলে ভারতে ৩২০ বছর ধরে চলা দিল্লি সুলতানি সাম্রাজ্যের চিরতরে পতন ঘটে এবং বাবর ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন।