সপ্তম শ্রেণি: ইতিহাস, অধ্যায় -6: নগর বণিক ও বাণিজ্য, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।
অধ্যায় 6: নগর, বণিক ও বাণিজ্য
(সংক্ষিপ্ত ও বিশ্লেষণমূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 2/3)
✍️ 2/3 নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ 15টি প্রশ্নোত্তর:
1. ‘যোগিনীপুর’ কীভাবে ‘দিল্লি’ নামে পরিচিত হলো বলে মনে করা হয়?
উত্তর: একাদশ শতকের আগে দিল্লির নাম ছিল ‘যোগিনীপুর’। লোককথা বা কিংবদন্তি অনুযায়ী, এই অঞ্চলে একটি লোহার স্তম্ভ ছিল। একবার এক রাজা ওই স্তম্ভটি খুঁড়ে তোলার চেষ্টা করেন, যার ফলে স্তম্ভটি আলগা বা ‘ঢিল্লি’ হয়ে যায়। মনে করা হয়, এই ‘ঢিল্লি’ বা ঢিলা শব্দ থেকেই পরবর্তীকালে জায়গাটির নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘দিল্লি’ বা ‘দিল্লী’ হয়েছে।
2. মধ্যযুগে সুফি সাধকদের কেন্দ্র হিসেবে দিল্লির গুরুত্ব কী ছিল?
উত্তর: মধ্যযুগে দিল্লি কেবল সুলতানদের রাজধানী ছিল না, এটি ছিল সুফি সাধকদের এক পবিত্র কেন্দ্র। খাজা কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী এবং নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মতো বিখ্যাত সুফি সাধকদের মাজার বা দরগা দিল্লিতে অবস্থিত ছিল। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করত যে এই পির বা সাধকদের আশীর্বাদেই সুলতানি সাম্রাজ্য টিকে আছে। তাই দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এই সুফি সাধকদের আশীর্বাদ নিতে দিল্লিতে আসত।
3. সুলতানি আমলে দিল্লির আশেপাশে গড়ে ওঠা তিনটি নতুন শহরের নাম ও তাদের প্রতিষ্ঠাতার নাম লেখো।
উত্তর: সুলতানি আমলে দিল্লির আশেপাশে গড়ে ওঠা তিনটি নতুন শহর এবং তাদের প্রতিষ্ঠাতা হলেন:
1. সিরি: এটি প্রতিষ্ঠা করেন সুলতান আলাউদ্দিন খলজি।
2. তুঘলকাবাদ: এটি নির্মাণ করেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক।
3. ফিরোজাবাদ: এই শহরটি তৈরি করেন সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক।
4. শাহজাহানাবাদ শহরটি কে, কবে এবং কোথায় নির্মাণ করেন?
উত্তর: নির্মাতা: মোগল সম্রাট শাহজাহান নিজের নামে এই নতুন শহরটি নির্মাণ করেন।
সময় ও স্থান: 1639 খ্রিষ্টাব্দে যমুনা নদীর পশ্চিম তীরে, পুরোনো দিল্লির কিছুটা উত্তরে এই শহরটি তৈরি করা হয়েছিল। বিখ্যাত লালকেল্লা এবং জামা মসজিদ এই শাহজাহানাবাদ শহরেরই অংশ ছিল।
5. শাহজাহানাবাদের ‘চাঁদনি চক’ বাজারের বর্ণনা দাও।
উত্তর: চাঁদনি চক ছিল শাহজাহানাবাদ শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সুন্দর বাজার।
1. সম্রাট শাহজাহানের কন্যা জাহানারা এই বাজারের নকশা তৈরি করেছিলেন।
2. এই বাজারটি ছিল আটচালা বা অষ্টভুজাকৃতির। বাজারের ঠিক মাঝখান দিয়ে একটি জলের খাল বয়ে যেত।
3. চাঁদের আলো যখন খালের জলে পড়ে চিকমিক করত, তখন পুরো বাজারটি আলোয় ভরে উঠত, সেই থেকেই এই বাজারের নাম হয় ‘চাঁদনি চক’।
6. ‘কসবা’ ও ‘গঞ্জ’ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: কসবা: এটি একটি আরবি শব্দ। গ্রামের চেয়ে বড়ো কিন্তু শহরের চেয়ে ছোটো জনবসতিপূর্ণ এলাকা বা শহরতলিকে ‘কসবা’ বলা হতো।
গঞ্জ: গঞ্জ হলো এমন একটি নির্দিষ্ট বাজার যেখানে প্রতিদিন হাট বসত না, কিন্তু কৃষকদের উৎপাদিত শস্য এবং অন্যান্য কৃষিজাত জিনিসপত্র পাইকারি দরে কেনাবেচা করা হতো।
7. ‘বঞ্জারা’ কাদের বলা হতো? বাণিজ্যে তাদের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: বঞ্জারা: মধ্যযুগে যেসব বণিকরা বলদ বা গোরুর পিঠে মালপত্র চাপিয়ে ঘুরে ঘুরে (ভ্রাম্যমাণ) ব্যবসা করত, তাদের ‘বঞ্জারা’ বলা হতো।
ভূমিকা: তারা মূলত গ্রাম থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করে শহরের বড়ো বাজারগুলোতে বিক্রি করত। মোগল সেনাবাহিনী যখন যুদ্ধে যেত, তখন বঞ্জারারাই তাদের বিশাল গরুর গাড়ির বহর নিয়ে সেনাবাহিনীর জন্য খাবার সরবরাহ করত।
8. ‘সরাফ’ কাদের বলা হতো? অর্থনীতিতে তাদের কাজ কী ছিল?
উত্তর: মধ্যযুগে যারা টাকা-পয়সা বা মুদ্রা বিনিময়ের কাজ করত, তাদের ‘সরাফ’ বলা হতো। আজকের দিনে ব্যাংক যে কাজ করে, সরাফরা তখন সেই কাজই করত।
কাজ: তারা বিভিন্ন রাজ্যের মুদ্রার মান ও খাঁটিত্ব পরীক্ষা করত এবং তার বিনিময়ে অন্য মুদ্রা দিত। এছাড়া তারা বণিকদের ঋণ দিত এবং ‘হুন্ডি’ বা কাগজের দলিলের মাধ্যমে নিরাপদে টাকা স্থানান্তরের কাজও করত।
9. ‘হুন্ডি’ কী? দূরপাল্লার বাণিজ্যে এটি কীভাবে সাহায্য করত?
উত্তর: ‘হুন্ডি’ ছিল সরাফদের দ্বারা প্রচলিত এক বিশেষ ধরনের কাগজের দলিল বা বিনিময়পত্র।
সুবিধা: দূরপাল্লার বাণিজ্যে বণিকদের পক্ষে থলি ভর্তি নগদ টাকা বা সোনার মুদ্রা বয়ে নিয়ে যাওয়া খুব বিপজ্জনক ছিল, কারণ পথে দস্যুদের ভয় থাকত। তাই বণিকরা কোনো সরাফকে টাকা জমা দিয়ে তার বদলে একটি ‘হুন্ডি’ বা কাগজের রসিদ কিনে নিত। অন্য শহরে গিয়ে সেই হুন্ডি দেখালেই তারা স্থানীয় সরাফের কাছ থেকে আবার নগদ টাকা পেয়ে যেত। এতে ব্যবসা অনেক নিরাপদ হয়েছিল।
10. মধ্যযুগে ভারতের প্রধান আমদানিকৃত ও রফতানিকৃত দ্রব্যগুলি কী কী ছিল?
উত্তর: রফতানি (Export): ভারত থেকে মূলত সুতির ও রেশমের কাপড়, গোলমরিচ, লবঙ্গ, দারুচিনি ইত্যাদি নানা রকমের মশলা, নীল এবং চিনি বিদেশে রফতানি করা হতো।
আমদানি (Import): বিদেশ থেকে ভারতে প্রধানত উন্নত মানের ঘোড়া (আরব ও পারস্য থেকে), সোনা, রুপো, মূল্যবান পাথর এবং কাঁচের জিনিসপত্র আমদানি করা হতো।
11. সুলতানি ও মোগল যুগে ভারতের পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলের প্রধান বন্দরগুলির নাম লেখো।
উত্তর: পশ্চিম উপকূলের বন্দর: আরব সাগর তীরবর্তী গুজরাটের সুরাট, ব্রোচ, খাম্বাত এবং কেরালার কালিকট ছিল পশ্চিম ভারতের প্রধান বন্দর। এর মধ্যে সুরাট ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ।
পূর্ব উপকূলের বন্দর: বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী বাংলার হুগলি, চট্টগ্রাম, তাম্রলিপ্ত এবং দক্ষিণ ভারতের মসলিপত্তনম ছিল পূর্ব ভারতের প্রধান বন্দর।
12. ইউরোপীয় বণিকরা কেন নতুন সমুদ্রপথ আবিষ্কার করে ভারতে বাণিজ্য করতে এসেছিল?
উত্তর: প্রাচীনকাল থেকেই স্থলপথে বা রেশম পথ দিয়ে ভারতের সাথে ইউরোপের বাণিজ্য চলত। কিন্তু 1453 খ্রিষ্টাব্দে তুর্কিরা কনস্টান্টিনোপল শহর দখল করে নিলে, ইউরোপীয় বণিকদের স্থলপথে ভারতে আসার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে ইউরোপে ভারতের মশলা ও সুতির কাপড়ের ব্যাপক চাহিদা ছিল। তাই বাধ্য হয়ে ইউরোপীয় নাবিকরা (যেমন- ভাস্কো-দা-গামা) মশলার খোঁজে সরাসরি ভারতে আসার জন্য নতুন সমুদ্রপথ আবিষ্কার করেন।
13. কোন্ কোন্ ইউরোপীয় বণিক কোম্পানি ভারতে এসেছিল এবং বাংলায় তাদের প্রধান ঘাঁটি কোথায় ছিল?
উত্তর: সমুদ্রপথে যে চারটি প্রধান ইউরোপীয় বণিক কোম্পানি ভারতে এসেছিল, তারা হলো:
1. পর্তুগিজ: বাংলায় তাদের প্রধান ঘাঁটি ছিল হুগলি।
2. ডাচ বা ওলন্দাজ: বাংলায় তাদের প্রধান ঘাঁটি ছিল চুঁচুড়া।
3. ফরাসি: বাংলায় তাদের প্রধান ঘাঁটি ছিল চন্দননগর।
4. ইংরেজ: বাংলায় তাদের প্রধান ঘাঁটি ছিল কলকাতা।
14. স্যার টমাস রো কে ছিলেন? তিনি কেন ভারতে এসেছিলেন?
উত্তর: স্যার টমাস রো ছিলেন ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের প্রেরিত রাজদূত বা প্রতিনিধি।
আসার কারণ: ভারতে ইংরেজ বণিকদের (ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি) ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা আদায় করার জন্য এবং বিভিন্ন জায়গায় বাণিজ্যকুঠি নির্মাণের অনুমতি পাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি 1615 খ্রিষ্টাব্দে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজদরবারে এসেছিলেন।
15. মধ্যযুগে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য (দেশের ভেতরের বাণিজ্য) কেমন ছিল?
উত্তর: মধ্যযুগে ভারতের অভ্যন্তরে প্রধানত দুই ধরনের বাণিজ্য হতো: গ্রাম থেকে গ্রাম এবং গ্রাম থেকে শহর।
কৃষকরা তাদের উৎপাদিত বাড়তি ফসল স্থানীয় হাট বা গঞ্জে বিক্রি করত। সেখান থেকে ‘বঞ্জারা’-দের মতো ব্যবসায়ীরা সেইসব মালপত্র কিনে বড়ো বড়ো শহরের বাজারে সরবরাহ করত। মালপত্র বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য মূলত বলদ বা গোরুর গাড়ি এবং নদীর জলপথ ব্যবহার করা হতো।