সপ্তম শ্রেণি: ইতিহাস, অধ্যায়- 9, আজকের ভারত: সরকার, স্বশাসন ও গণতন্ত্র, সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর
অধ্যায় ৯: আজকের ভারত
(সংক্ষিপ্ত ও বিশ্লেষণমূলক প্রশ্নোত্তর – মান: ২/৩)
✍️ ২/৩ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ ১৪টি প্রশ্নোত্তর:
১. সংবিধান বলতে কী বোঝো?
উত্তর: যেকোনো দেশ পরিচালনা করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট নিয়মকানুন ও আইনের প্রয়োজন হয়। এই নিয়মাবলি ও আইনের লিখিত সংকলনকেই বলা হয় ‘সংবিধান’। ভারতের সংবিধান হলো বিশ্বের বৃহত্তম লিখিত সংবিধান, যার ভিত্তিতে দেশের সরকার ও শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়।
২. ড. বি. আর. আম্বেদকরকে কেন ভারতীয় সংবিধানের জনক বলা হয়?
উত্তর: ভারতের সংবিধান তৈরির জন্য যে খসড়া কমিটি (Drafting Committee) গঠিত হয়েছিল, ড. বি. আর. আম্বেদকর ছিলেন তার সভাপতি। সংবিধানের মূল কাঠামো তৈরি এবং বিভিন্ন আইনের সমন্বয় সাধনে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। এই অসামান্য অবদানের জন্যই তাঁকে ‘ভারতীয় সংবিধানের জনক’ বা প্রধান রূপকার বলা হয়।
৩. ভারত একটি ‘গণতান্ত্রিক’ দেশ— ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: গণতন্ত্র মানে হলো জনগণের শাসন। ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ কারণ এ দেশে সরকার গঠনের মূল ক্ষমতা দেশের সাধারণ মানুষের হাতে থাকে। নাগরিকরা নির্দিষ্ট সময় অন্তর গোপন ব্যালটে ভোটের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দমতো প্রতিনিধি নির্বাচন করেন এবং সেই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারাই দেশের শাসনকার্য পরিচালিত হয়।
৪. ‘সাধারণতন্ত্র’ বা ‘প্রজাতন্ত্র’ শব্দটির অর্থ কী?
উত্তর: সাধারণতন্ত্র মানে হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রধান (যেমন রাষ্ট্রপতি) বংশপরম্পরায় নিযুক্ত হন না। তিনি জনগণের দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচিত হন। ভারত একটি সাধারণতন্ত্র কারণ এ দেশে রাষ্ট্রপ্রধান উত্তরাধিকার সূত্রে নয়, বরং নির্বাচনের মাধ্যমে মনোনীত হন।
৫. ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ভারত একটি যুক্তরাষ্ট্র কারণ এ দেশে দু-ধরনের সরকার ব্যবস্থা আছে— একটি হলো কেন্দ্রীয় সরকার (পুরো দেশের জন্য) এবং অন্যটি হলো রাজ্য সরকার (প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের জন্য)। সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে শাসন ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের শাসনব্যবস্থাকেই ‘যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা’ বলা হয়।
৬. পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত ব্যবস্থার তিনটি স্তর কী কী?
উত্তর: পশ্চিমবঙ্গে ত্রিস্তর বিশিষ্ট পঞ্চায়েত ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। নিচ থেকে উপরের দিকে এই তিনটি স্তর হলো:
১. গ্রাম পঞ্চায়েত: এটি গ্রাম স্তরের সর্বনিম্ন প্রশাসনিক সংস্থা।
২. পঞ্চায়েত সমিতি: এটি ব্লক স্তরের মধ্যবর্তী প্রশাসনিক সংস্থা।
৩. জেলা পরিষদ: এটি জেলা স্তরের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক সংস্থা।
৭. গ্রাম পঞ্চায়েত কী কী জনকল্যাণমূলক কাজ করে?
উত্তর: গ্রাম পঞ্চায়েত মূলত গ্রামের সার্বিক উন্নতির জন্য কাজ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— গ্রামের রাস্তাঘাট নির্মাণ ও মেরামত, পানীয় জলের ব্যবস্থা করা, জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতি, রাস্তার আলো এবং গ্রামের প্রাথমিক শিক্ষা ও কৃষি উন্নয়নের তদারকি করা।
৮. পুরসভা বা মিউনিসিপ্যালিটি কীভাবে গঠিত হয়?
উত্তর: ছোটো ও মাঝারি শহর এলাকার শাসনকার্য পরিচালনার জন্য পুরসভা গঠিত হয়। শহরটিকে কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় ভাগ করা হয়, যাকে বলা হয় ‘ওয়ার্ড’। প্রতিটি ওয়ার্ডের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকরা ভোটের মাধ্যমে একজন করে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন, যাঁদের বলা হয় ‘পৌরপিতা’ (Councillor)। এই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে একজন ‘পৌরপ্রধান’ (Chairman) নির্বাচিত হন।
৯. মেয়র (Mayor) ও পৌরপ্রধানের (Chairman) মধ্যে তফাত কী?
উত্তর: দুজনেই শহর এলাকার স্বশাসিত সংস্থার প্রধান। পার্থক্য হলো— ছোটো বা মাঝারি শহর এলাকার স্বশাসিত সংস্থাকে বলা হয় ‘পুরসভা’ এবং এর প্রধান হলেন ‘পৌরপ্রধান’ বা চেয়ারম্যান। অন্যদিকে, কলকাতা বা শিলিগুড়ির মতো বড়ো শহরগুলির স্বশাসিত সংস্থাকে বলা হয় ‘পৌরনিগম’ (Corporation) এবং এর প্রধানকে বলা হয় ‘মেয়র’।
১০. কেন্দ্রীয় আইনসভার দুটি কক্ষের নাম ও প্রকৃতি লেখো।
উত্তর: ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভার (সংসদ) দুটি কক্ষ হলো:
১. লোকসভা: এটি নিম্নকক্ষ। এখানকার সদস্যরা জনগণের দ্বারা সরাসরি নির্বাচিত হন এবং এর মেয়াদ ৫ বছর।
২. রাজ্যসভা: এটি উচ্চকক্ষ। এখানকার সদস্যরা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। এটি একটি স্থায়ী কক্ষ এবং এর সদস্যদের মেয়াদ ৬ বছর।
১১. শাসনবিভাগ ও বিচারবিভাগের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: শাসনবিভাগ: রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভা নিয়ে গঠিত এই বিভাগটি মূলত দেশের আইন কার্যকর করে এবং দেশ পরিচালনা করে।
বিচারবিভাগ: সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট ও নিম্ন আদালত নিয়ে গঠিত এই বিভাগটি আইনের ব্যাখ্যা দেয় এবং কেউ আইন ভাঙলে বা অপরাধ করলে তার বিচার করে শান্তি ও ন্যায়বিচার বজায় রাখে।
১২. স্বাধীন দেশে ভোটাধিকারের গুরুত্ব কেন অপরিসীম?
উত্তর: গণতন্ত্রে ভোটাধিকার হলো নাগরিকের সবচেয়ে বড়ো শক্তি। ভোটের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষ শাসনকার্যে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। কোনো সরকার যদি জনগণের ইচ্ছানুযায়ী কাজ না করে, তবে পরবর্তী নির্বাচনে ভোট দিয়ে নাগরিকরা সেই সরকারকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে। এটি গণতান্ত্রিক সাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
১৩. ভারতের সংবিধানকে কেন ‘নমনীয় ও কঠোরের সংমিশ্রণ’ বলা হয়?
উত্তর: ভারতের সংবিধানের কিছু অংশ খুব সহজেই পরিবর্তন বা সংশোধন করা যায় (নমনীয়), আবার কিছু বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিবর্তন করা খুবই কঠিন ও জটিল পদ্ধতির মাধ্যমে করতে হয় (কঠোর)। দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী যাতে পরিবর্তন করা যায় আবার কেউ যেন অনৈতিকভাবে সংবিধান বদলে না দেয়— সেই ভারসাম্য রাখতেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে।
১৪. সুপ্রিম কোর্টকে কেন সংবিধানের রক্ষক ও অভিভাবক বলা হয়?
উত্তর: সুপ্রিম কোর্ট হলো ভারতের সর্বোচ্চ আদালত। যদি সরকার এমন কোনো আইন তৈরি করে যা সংবিধানের আদর্শের পরিপন্থী, তবে সুপ্রিম কোর্ট সেই আইন বাতিল করে দিতে পারে। এছাড়া নাগরিকদের মৌলিক অধিকার আক্রান্ত হলে সুপ্রিম কোর্ট তার প্রতিকার করে। এই কারণেই একে সংবিধানের রক্ষক বলা হয়।