সপ্তম শ্রেণি: ইতিহাস, মুঘল সাম্রাজ্য, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
অধ্যায় ৫: মোগল সাম্রাজ্য
(সংক্ষিপ্ত ও বিশ্লেষণমূলক প্রশ্নোত্তর – মান: ২/৩)
✍️ ২/৩ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ ১৫টি প্রশ্নোত্তর:
১. ‘মোগল’ কাদের বলা হয়?
উত্তর: ‘মোগল’ শব্দটি এসেছে ‘মোঙ্গল’ থেকে। ভারতের মোগল সম্রাটরা ছিলেন মধ্য এশিয়ার দুজন দুর্ধর্ষ বীরের বংশধর। সম্রাট বাবর তাঁর মায়ের দিক থেকে ছিলেন মোঙ্গল বীর চেঙ্গিজ খানের বংশধর এবং বাবার দিক থেকে ছিলেন তুর্কি বীর তৈমুর লঙের বংশধর। এই দুই দুর্ধর্ষ জাতির সংমিশ্রণেই ‘মোগল’ জাতির উৎপত্তি।
২. পানিপথের প্রথম যুদ্ধে (১৫২৬ খ্রিঃ) বাবরের জয়ের দুটি প্রধান কারণ কী ছিল?
উত্তর: ইব্রাহিম লোদির বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে বাবরের জয়ের দুটি প্রধান কারণ হলো:
১. কামানের ব্যবহার: বাবর ভারতে প্রথম যুদ্ধে গোলন্দাজ বাহিনী বা কামানের ব্যবহার করেছিলেন, যা ভারতীয়দের অজানা ছিল।
২. তুলঘুমা রণকৌশল: এটি ছিল এক বিশেষ ধরনের যুদ্ধকৌশল, যেখানে বাহিনীকে কয়েক ভাগে ভাগ করে শত্রুকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলা হতো। এছাড়া বাবরের অত্যন্ত সুশিক্ষিত ও অনুগত অশ্বারোহী বাহিনীও তাঁর জয়ের অন্যতম কারণ ছিল।
৩. খানুয়ার যুদ্ধ (১৫২৭ খ্রিঃ) কেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
উত্তর: খানুয়ার যুদ্ধ হয়েছিল সম্রাট বাবর এবং মেওয়ারের রাজপুত বীর রানা সাঙ্গার মধ্যে। এই যুদ্ধটি পানিপথের প্রথম যুদ্ধের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, পানিপথের যুদ্ধে বাবর কেবল আফগানদের হারিয়েছিলেন, কিন্তু খানুয়ার যুদ্ধে তিনি রাজপুতদের পরাস্ত করে উত্তর ভারতে তাঁর প্রধান শত্রুদের ধ্বংস করেন। এর ফলেই ভারতে মোগল সাম্রাজ্য পাকাপাকিভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
৪. শেরশাহের যেকোনো দুটি জনকল্যাণমূলক কাজের উল্লেখ করো।
উত্তর: আফগান শাসক শেরশাহ মাত্র পাঁচ বছর রাজত্ব করলেও অনেক জনকল্যাণমূলক কাজ করেছিলেন:
১. সড়ক নির্মাণ: যাতায়াত ও বাণিজ্যের সুবিধার জন্য তিনি সোনারগাঁ (বাংলাদেশ) থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত দীর্ঘ ‘সড়ক-ই-আজম’ (বর্তমান গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড) নির্মাণ করেন।
২. সরাইখানা: পথিক ও বণিকদের বিশ্রামের জন্য তিনি রাস্তার ধারে ধারে প্রচুর সরাইখানা বা বিশ্রামাগার এবং কুয়ো তৈরি করেছিলেন।
৫. ‘পাট্টা’ ও ‘কবুলিয়ত’ কী?
উত্তর: শেরশাহ কৃষকদের স্বার্থরক্ষার জন্য এই দুটি প্রথা চালু করেন।
পাট্টা: কৃষকদের জমির ওপর তাদের অধিকার স্বীকার করে সরকার বা রাষ্ট্রের তরফ থেকে যে দলিল দেওয়া হতো, তাকে ‘পাট্টা’ বলা হতো। এতে কৃষকের নাম এবং জমির পরিমাণ লেখা থাকত।
কবুলিয়ত: পাট্টার বিনিময়ে নির্দিষ্ট রাজস্ব বা কর দেওয়ার কথা কবুল (স্বীকার) করে কৃষক সরকারকে যে দলিল দিত, তাকে ‘কবুলিয়ত’ বলা হতো।
৬. পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ (১৫৫৬ খ্রিঃ) কাদের মধ্যে হয়েছিল? এর ফলাফল কী?
উত্তর: যোদ্ধা: পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল মোগল সম্রাট আকবর (তাঁর অভিভাবক বৈরাম খাঁর নেতৃত্বে) এবং আফগান শাসক আদিল শাহের সেনাপতি হিমুর মধ্যে।
ফলাফল: এই যুদ্ধে আকবর জয়লাভ করেন এবং হিমু নিহত হন। এর ফলে আফগানদের ক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় এবং ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের ভিত পুনরায় মজবুত হয়।
৭. আকবরের রাজপুত নীতির মূল কথা কী ছিল?
উত্তর: আকবর বুঝতে পেরেছিলেন যে বীর রাজপুতদের শত্রু বানিয়ে মোগল সাম্রাজ্য টেঁকানো যাবে না। তাই তিনি মৈত্রী ও বন্ধুত্বের নীতি গ্রহণ করেন।
১. তিনি বহু রাজপুত রাজকন্যাকে বিবাহ করেন (যেমন- যোধাবাঈ)।
২. রাজপুতদের তিনি জোর করে ধর্মান্তরিত করেননি, বরং তাঁদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।
৩. মানসিংহ, টোডরমল, ভগবান দাসের মতো যোগ্য রাজপুতদের তিনি সেনাবাহিনীর উচ্চ পদে এবং রাজসভায় নিয়োগ করেছিলেন।
৮. ‘মনসবদারি’ প্রথা বলতে কী বোঝো?
উত্তর: সম্রাট আকবর তাঁর সেনাবাহিনী ও প্রশাসনকে সুষ্ঠুভাবে চালানোর জন্য ‘মনসবদারি’ প্রথা চালু করেন। ফারসি শব্দ ‘মনসব’-এর অর্থ হলো ‘পদ’ বা ‘পদমর্যাদা’। মোগল প্রশাসনে যাঁরা এই পদ পেতেন, তাঁদের ‘মনসবদার’ বলা হতো। মনসবদারদের দুটি দায়িত্ব ছিল—তাঁদের একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার সৈন্য বা ঘোড়া পালন করতে হতো (‘সওয়ার’) এবং নিজেদের পদমর্যাদা (‘জাট’) অনুযায়ী তাঁরা বেতন বা জায়গির পেতেন।
৯. ‘দ্বীন-ই-ইলাহি’ কী?
উত্তর: সম্রাট আকবর সকল ধর্মের মধ্যে সম্প্রীতি ও সমন্বয় বজায় রাখার জন্য ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে একটি নতুন ধর্মমত বা আদর্শ প্রচার করেন, যাকে ‘দ্বীন-ই-ইলাহি’ বা ‘তৌহিদ-ই-ইলাহি’ বলা হয়। এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম ছিল না, বরং ইসলাম, হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মের ভালো দিকগুলোর একটি সুন্দর সংমিশ্রণ ছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল ঈশ্বরের একত্ববাদ এবং ‘সুলহ্-ই-কুল’ বা সর্বজনীন শান্তি প্রতিষ্ঠা।
১০. ‘জবতি’ বা ‘দহশালা’ ব্যবস্থা কী?
উত্তর: সম্রাট আকবরের রাজস্ব মন্ত্রী টোডরমল ১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দে যে বিজ্ঞানসম্মত জমি জরিপ ও রাজস্ব ব্যবস্থা চালু করেন, তাকে ‘জবতি’ বা ‘দহশালা’ ব্যবস্থা বলে। ‘দহশালা’ অর্থাৎ ১০ বছর। বিগত ১০ বছরের ফসলের উৎপাদন ও তার বাজারদরের গড় হিসাব করে কৃষকদের রাজস্ব বা খাজনা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো। এই ব্যবস্থা কৃষকদের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক ছিল।
১১. আবুল ফজল কে ছিলেন? তাঁর লেখা দুটি বিখ্যাত বইয়ের নাম লেখো।
উত্তর: আবুল ফজল ছিলেন সম্রাট আকবরের রাজসভার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত, ঐতিহাসিক এবং আকবরের সবচেয়ে বিশ্বস্ত নবরত্নের একজন।
তাঁর লেখা দুটি বিখ্যাত বই হলো:
১. ‘আকবরনামা’ (এতে আকবরের রাজত্বকালের বিস্তারিত ইতিহাস রয়েছে)।
২. ‘আইন-ই-আকবরি’ (এতে মোগল প্রশাসন, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার নিখুঁত বর্ণনা রয়েছে)।
১২. ‘নূরজাহান চক্র’ (Nur Jahan Junta) কী?
উত্তর: মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর রাজ্যশাসনে বেশি মাথা ঘামাতেন না। সেই সুযোগে তাঁর স্ত্রী নূরজাহান অত্যন্ত ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন। নূরজাহান তাঁর বাবা ইতমাদ-উদ-দৌল্লা, ভাই আসফ খাঁ এবং শাহজাদা খুররমকে (শাহজাহান) নিয়ে একটি শক্তিশালী দল বা চক্র তৈরি করেছিলেন, যা ‘নূরজাহান চক্র’ নামে পরিচিত। বেশ কিছুদিন মোগল সাম্রাজ্যের প্রকৃত শাসনক্ষমতা এই চক্রের হাতেই ছিল।
১৩. সম্রাট শাহজাহানকে ‘প্রিন্স অফ বিল্ডার্স’ (Prince of Builders) বলা হয় কেন?
উত্তর: সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালকে মোগল স্থাপত্যের ‘সুবর্ণ যুগ’ বলা হয়। তিনি স্থাপত্য ও ইমারত নির্মাণের প্রতি এতটাই পাগল ছিলেন যে তাঁকে ‘প্রিন্স অফ বিল্ডার্স’ বা ‘স্থপতিদের যুবরাজ’ বলা হয়। তিনি বিশ্ববিখ্যাত তাজমহল, দিল্লির লালকেল্লা, জামা মসজিদ এবং অমূল্য রত্নখচিত ‘ময়ূর সিংহাসন’ নির্মাণ করেছিলেন।
১৪. ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতির ফলাফল কী হয়েছিল?
উত্তর: সম্রাট ঔরঙ্গজেব তাঁর জীবনের শেষ ২৫ বছর দক্ষিণ ভারত বা দাক্ষিণাত্য জয় এবং মারাঠাদের দমনের জন্য কাটিয়েছিলেন, যা মোগল সাম্রাজ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর প্রমাণ হয়।
১. বছরের পর বছর যুদ্ধের ফলে মোগল রাজকোষ শূন্য হয়ে যায়।
২. উত্তর ভারতে প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং কৃষকরা বিদ্রোহ শুরু করে।
৩. মারাঠাদের তিনি পুরোপুরি হারাতে তো পারেনইনি, উলটে দাক্ষিণাত্য নীতিই মোগল সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৫. পুরন্দরের সন্ধি (১৬৬৫ খ্রিঃ) কাদের মধ্যে হয়েছিল? এর দুটি শর্ত লেখো।
উত্তর: স্বাক্ষরকারী: ১৬৬৫ খ্রিষ্টাব্দে মারাঠা বীর শিবাজি এবং মোগল সেনাপতি রাজা জয়সিংহের মধ্যে পুরন্দরের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়।
শর্ত:
১. শিবাজি তাঁর ৩৫টি দুর্গের মধ্যে ২৩টি দুর্গ মোগলদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
২. শিবাজি মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের বশ্যতা স্বীকার করেন এবং মোগলদের সবরকম সামরিক সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন।