সপ্তম শ্রেণি: ভূগোল, অধ্যায় – 5 নদী, রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
অধ্যায় 5: নদী
(দীর্ঘ উত্তরধর্মী বা রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
📝 5 নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ 5টি প্রশ্নোত্তর:
1. নদীর উচ্চগতি বা পার্বত্য গতিতে সৃষ্ট প্রধান ভূমি রূপগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: নদীর উচ্চগতিতে ভূমির ঢাল ও জলের গতিবেগ খুব বেশি থাকে বলে নদী মূলত ক্ষয় কাজ করে। এই পর্যায়ে সৃষ্ট প্রধান ভূমি রূপগুলি হলো:
- I ও V আকৃতির উপত্যকা: নদীর প্রবল নিম্নক্ষয়ের ফলে উপত্যকাটি গভীর ও সংকীর্ণ হয়ে ইংরেজি ‘V’ বা ‘I’ অক্ষরের মতো দেখায়।
- গিরিখাত ও ক্যানিয়ন: আর্দ্র অঞ্চলের গভীর সংকীর্ণ উপত্যকাকে গিরিখাত এবং শুষ্ক অঞ্চলের অত্যন্ত গভীর ও সংকীর্ণ উপত্যকাকে ক্যানিয়ন বলে।
- জলপ্রপাত: নদীর গতিপথে কঠিন ও কোমল শিলা আড়াআড়িভাবে থাকলে কোমল শিলা দ্রুত ক্ষয় পেয়ে নিচু হয়ে যায় এবং নদী উপর থেকে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে জলপ্রপাত সৃষ্টি করে।
- মন্থকূপ: নদীর তলদেশে অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় ছোট ছোট গোল গর্ত তৈরি হয়, যাকে মন্থকূপ বলে।
2. নদীর মধ্যগতিতে কীভাবে মিয়েন্ডার ও অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ গঠিত হয়?
উত্তর: মধ্যগতিতে নদীর ঢাল কমে যায় বলে নদী একেবেঁকে চলতে শুরু করে।
- মিয়েন্ডার গঠন: নদী যখন বাঁক নিয়ে চলে, তখন বাঁকের বাইরের দিকে ক্ষয় এবং ভেতরের দিকে সঞ্চয় ঘটে। ফলে নদীর বাঁকগুলো ক্রমাগত বড় ও জটিল হতে থাকে, একেই মিয়েন্ডার বলে।
- অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ গঠন: বাঁকগুলো খুব কাছাকাছি চলে এলে নদী একসময় বাঁকটি ছেড়ে সোজাপথে বইতে শুরু করে। পরিত্যক্ত বাঁকটি মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘোড়ার খুরের মতো হ্রদ তৈরি করে। একেই অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ বলে।
3. নদীর নিম্নগতিতে বদ্বীপ বা ডেল্টা তৈরির অনুকূল ভৌগোলিক শর্তগুলি লেখো।
উত্তর: সব নদীর মোহনায় বদ্বীপ গড়ে ওঠে না। বদ্বীপ তৈরির জন্য নিচের শর্তগুলি প্রয়োজন:
- অগভীর মোহনা: নদীর মোহনা অঞ্চল বা সমুদ্রের মুখটি অগভীর হতে হবে, যাতে পলি সহজে জমা হতে পারে।
- ধীর গতিবেগ: মোহনায় নদীর গতিবেগ অত্যন্ত কম হওয়া প্রয়োজন যাতে নদী তার বাহিত পলি বহন করতে না পেরে থিতিয়ে পড়ে।
- পলিপাতের পরিমাণ: নদীতে প্রচুর পরিমাণে পলি, বালি ও কাদা থাকতে হবে।
- শান্ত সমুদ্র: মোহনার কাছে সমুদ্রের ঢেউ ও জোয়ার-ভাটার টান কম থাকতে হবে, যাতে সঞ্চিত পলি সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে না যায়।
4. গঙ্গা নদীকে কেন ‘আদর্শ নদী’ বলা হয়? আলোচনা করো।
উত্তর: যে নদীর গতিপথে উচ্চ, মধ্য ও নিম্ন—এই তিনটি প্রবাহই স্পষ্টভাবে দেখা যায়, তাকে আদর্শ নদী বলে। গঙ্গার ক্ষেত্রে এই তিনটি প্রবাহই বিদ্যমান:
- উচ্চগতি: গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে হরিদ্বার পর্যন্ত গঙ্গার উচ্চগতি। এখানে গঙ্গা পাহাড়ের খাড়া ঢাল দিয়ে প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়।
- মধ্যগতি: হরিদ্বার থেকে রাজমহল পাহাড় পর্যন্ত মধ্যগতি। এখানে গঙ্গা সমভূমির ওপর দিয়ে বয়ে যায়।
- নিম্নগতি: রাজমহল পাহাড় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত নিম্নগতি। এখানে গঙ্গা ধীর গতিতে বয়ে গিয়ে বিশাল বদ্বীপ গঠন করেছে।
- উপসংহার: এই তিনটি পর্যায়ের সুষ্পষ্ট অস্তিত্বের জন্যই গঙ্গাকে ভারতের প্রধান ‘আদর্শ নদী’ বলা হয়।
5. নদীর ওপর মানুষের কার্যকলাপের কুপ্রভাবগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: মানুষ নিজের প্রয়োজনে নদীর ওপর বিভিন্নভাবে হস্তক্ষেপ করছে, যার ফলে নদীর ক্ষতি হচ্ছে:
- নদী দূষণ: শহরের আবর্জনা ও কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলার ফলে জল দূষিত হয়ে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর ক্ষতি হচ্ছে।
- কৃষিজ দূষণ: চাষের জমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বৃষ্টির জলে ধুয়ে নদীতে মিশে জল বিষাক্ত করছে।
- বাঁধ নির্মাণ: অনিয়ন্ত্রিতভাবে নদীর ওপর বাঁধ দেওয়ার ফলে নদীর স্বাভাবিক পলি প্রবাহ বাধা পাচ্ছে, যা পরবর্তীকালে বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
- নদী ভরাট: নদীর পাড় দখল করে ঘরবাড়ি ও শিল্পস্থাপনের ফলে নদীর বুক সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে এবং ধারণ ক্ষমতা কমছে।