সপ্তম শ্রেণি: ভূগোল, অধ্যায় – 7 আবহাওয়া ও জলবায়ু, রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
অধ্যায় 7: আবহাওয়া ও জলবায়ু
(দীর্ঘ উত্তরধর্মী বা রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
📝 5 নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ 6টি প্রশ্নোত্তর:
1. আবহাওয়া ও জলবায়ুর মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো।
উত্তর: আবহাওয়া ও জলবায়ু একে অপরের পরিপূরক হলেও এদের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে:
| বিষয় | আবহাওয়া (Weather) | জলবায়ু (Climate) |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা | কোনো নির্দিষ্ট স্থানের বায়ুমণ্ডলের প্রতিদিনের সাময়িক অবস্থা। | কোনো বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অন্তত 30-35 বছরের আবহাওয়ার গড় অবস্থা। |
| স্থায়িত্ব | এটি খুব অল্প সময়ের জন্য স্থায়ী হয় এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল। | এটি দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থায়ী হয় এবং সহজে পরিবর্তিত হয় না। |
| ব্যাপ্তি | এটি একটি ক্ষুদ্র এলাকার (যেমন একটি গ্রাম বা শহর) ওপর নির্ভর করে। | এটি একটি বৃহৎ ভৌগোলিক অঞ্চল বা দেশের ওপর নির্ভর করে। |
| উপাদান | আবহাওয়ার উপাদানগুলি হলো তাপ, চাপ, আর্দ্রতা ইত্যাদি। | জলবায়ু হলো আবহাওয়ার উপাদানগুলির গড় ফলাফল। |
2. বায়ুর উষ্ণতার তারতম্যের প্রধান কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: পৃথিবী পৃষ্ঠের সব জায়গায় বায়ুর উষ্ণতা সমান থাকে না। এর প্রধান কারণগুলি হলো:
- অক্ষাংশ: নিরক্ষরেখা থেকে যত মেরুর দিকে যাওয়া যায়, সূর্যরশ্মি তত তির্যকভাবে পড়ে। ফলে উষ্ণতা কমতে থাকে।
- উচ্চতা: সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা বাড়লে বায়ুর উষ্ণতা কমে। প্রতি 1000 মিটার উচ্চতায় 6.4°C হারে উষ্ণতা হ্রাস পায়।
- সমুদ্র থেকে দূরত্ব: সমুদ্রের কাছের জলবায়ু সমভাবাপন্ন (নাতিশীতোষ্ণ) এবং সমুদ্র থেকে দূরের স্থানের জলবায়ু চরমভাবাপন্ন হয়।
- বায়ুপ্রবাহ: কোনো স্থানের ওপর দিয়ে প্রবাহিত উষ্ণ বা শীতল বায়ু সেই অঞ্চলের তাপমাত্রাকে প্রভাবিত করে।
- ভূমির ঢাল: পর্বতের যে ঢালে সূর্যের আলো লম্বভাবে পড়ে সেখানে উষ্ণতা বেশি, আর বিপরীত ঢালে উষ্ণতা কম হয়।
3. চিত্রসহ শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত কীভাবে ঘটে তা বর্ণনা করো।
উত্তর: ‘শৈল’ মানে পাহাড় এবং ‘উৎক্ষেপ’ মানে ওপরে ওঠা।
- প্রক্রিয়া: সমুদ্র থেকে আসা জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু প্রবাহপথে কোনো পাহাড় বা পর্বত দ্বারা বাধা পেলে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে যায়। ওপরে শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এসে এই বায়ু ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে।
- প্রতিবাত ঢাল: পাহাড়ের যে ঢালে বায়ু প্রথম বাধা পায় তাকে প্রতিবাত ঢাল (Windward Side) বলে। এখানে প্রচুর বৃষ্টি হয়। যেমন— পশ্চিমঘাট পর্বতের পশ্চিম ঢাল।
- অনুবাত ঢাল: পাহাড়ের বিপরীত ঢালকে অনুবাত ঢাল (Leeward Side) বলে। বায়ু পাহাড় টপকে ওই পাশে পৌঁছালে জলীয় বাষ্প কমে যায়, তাই সেখানে বৃষ্টি হয় না বললেই চলে। একে বৃষ্টির ছায়া অঞ্চল বলে। যেমন— শিলং।
4. পরিচলন বৃষ্টিপাত (Convectional Rainfall) কাকে বলে? এর বৈশিষ্ট্য ও প্রক্রিয়া আলোচনা করো।
সংজ্ঞা: প্রখর সূর্যের তাপে ভূপৃষ্ঠ উত্তপ্ত হয়ে যখন বায়ু হালকা হয়ে সোজা ওপরে উঠে গিয়ে বৃষ্টি ঘটায়, তখন তাকে পরিচলন বৃষ্টি বলে।
- প্রক্রিয়া: তীব্র রোদে জলভাগ ও স্থলভাগ থেকে বায়ু গরম হয়ে প্রসারণের মাধ্যমে হালকা হয়ে যায়। এই হালকা বায়ু ওপরে গিয়ে শীতল ও সম্পৃক্ত হয় এবং বিকেলের দিকে বজ্রসহ প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটায়।
- অঞ্চল: নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারাবছর এই বৃষ্টি হয়। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে গ্রীষ্মকালের শুরুতে এটি দেখা যায়।
- বৈশিষ্ট্য: (i) এই বৃষ্টিপাত সাধারণত বিকেলে বা সন্ধ্যার আগে হয়। (ii) আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢেকে যায় এবং বজ্রপাতসহ বৃষ্টি হয়। (iii) এটি খুব অল্প এলাকা জুড়ে ঘটে কিন্তু প্রবল বেগে হয়।
5. কোনো স্থানের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে উচ্চতার প্রভাব ব্যাখ্যা করো। দার্জিলিং কলকাতার চেয়ে ঠান্ডা কেন?
উচ্চতার প্রভাব: বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তর ভূপৃষ্ঠের বিকিরণে বেশি উত্তপ্ত হয়। ওপরে বায়ুর ঘনত্ব কম এবং ধূলিকণা কম থাকায় তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায়। ফলে উচ্চতা বাড়লে বায়ুর উষ্ণতা হ্রাস পায়।
- দার্জিলিং বনাম কলকাতা: কলকাতা ও দার্জিলিং একই অক্ষাংশের কাছাকাছি অবস্থিত হলেও তাদের উচ্চতা ভিন্ন।
- কলকাতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র 6 মিটার উঁচুতে অবস্থিত, কিন্তু দার্জিলিং প্রায় 2134 মিটার উঁচুতে অবস্থিত।
- উষ্ণতা হ্রাসের স্বাভাবিক হার (6.4°C / 1000 মিটার) অনুযায়ী, কলকাতার তুলনায় দার্জিলিং-এর উষ্ণতা প্রায় 13-14°C কম থাকে।
- এই কারণেই কলকাতার আবহাওয়া যখন গরম ও ভ্যাপসা থাকে, তখনও দার্জিলিং অত্যন্ত মনোরম ও শীতল থাকে।
6. বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর ফলাফলগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলাফলগুলি ভয়াবহ:
- মেরু অঞ্চলের বরফ গলন: তাপমাত্রা বাড়ার ফলে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর বরফ দ্রুত গলতে শুরু করেছে।
- সমুদ্রের জলস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি: বরফ গলা জল সমুদ্রে মিশে জলস্তর বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে নিচু উপকূলীয় এলাকা ও দ্বীপগুলি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
- আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা: খরা, বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
- বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি: তাপমাত্রা সহ্য করতে না পেরে অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
- রোগের প্রাদুর্ভাব: উষ্ণ আবহাওয়ায় মশা বা বাহকবাহিত রোগের (যেমন ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু) প্রকোপ বেড়ে যাচ্ছে।