সপ্তম শ্রেণি: ভূগোল, অধ্যায়- ১, পৃথিবীর পরিক্রমণ, রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
অধ্যায় ১: পৃথিবীর পরিক্রমণ
(দীর্ঘ উত্তরধর্মী বা রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: ৫)
📝 ৫ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ ৬টি প্রশ্নোত্তর:
১. পৃথিবীতে ঋতু পরিবর্তনের কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: পৃথিবীতে ঋতু পরিবর্তনের মূল কারণগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
[Image of cause of seasons on Earth]
- পৃথিবীর পরিক্রমণ গতি: পৃথিবী তার উপবৃত্তাকার কক্ষপথে সূর্যের চারদিকে ঘোরে। এর ফলে বছরের বিভিন্ন সময়ে পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব ও কৌণিক অবস্থানের পরিবর্তন হয়, যা ঋতু পরিবর্তনের মূল কারণ।
- পৃথিবীর অক্ষের নতি: পৃথিবীর অক্ষরেখা তার কক্ষতলের সঙ্গে ৬৬.৫ ডিগ্রি কোণে হেলে থাকে। এই হেলানো অবস্থানের জন্য পরিক্রমণের সময় পৃথিবীর এক এক গোলার্ধ সূর্যের দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে।
- অক্ষের সমান্তরাল অবস্থান: পরিক্রমণের সময় পৃথিবীর অক্ষরেখা সর্বদা মহাকাশে একই দিকে (উত্তর মেরু ধ্রুবতারার দিকে) মুখ করে থাকে। এর ফলে পরিক্রমণের সময় উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধ পর্যায়ক্রমে সূর্যের সামনে আসে।
- উপবৃত্তাকার কক্ষপথ: কক্ষপথ উপবৃত্তাকার হওয়ায় সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সারা বছর সমান থাকে না। ফলে সৌর তাপের কিছুটা তারতম্য ঘটে।
২. পৃথিবীর পরিক্রমণ গতির ফলাফলগুলি সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর: পৃথিবীর পরিক্রমণ গতির প্রধান ফলাফলগুলি হলো:
- দিন ও রাত্রির দৈর্ঘ্যের হ্রাস-বৃদ্ধি: পরিক্রমণের ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বছরের বিভিন্ন সময়ে দিন বড় ও রাত ছোট হয়, আবার কোথাও এর বিপরীত ঘটে।
- ঋতু পরিবর্তন: সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর ঘোরার ফলে এবং অক্ষের হেলানো অবস্থানের জন্য পৃথিবীতে পর্যায়ক্রমে গ্রীষ্ম, শরৎ, শীত ও বসন্ত—এই চারটি ঋতুর আগমন ঘটে।
- সূর্যের আপাত বার্ষিক গতি বা রবিমার্গ: পৃথিবী থেকে মনে হয় সূর্য সারা বছর উত্তর ও দক্ষিণ দিকে চলাচল করছে। এই ভ্রমের সৃষ্টি হয় পৃথিবীর পরিক্রমণ গতির জন্য।
- বছর গণনা: পৃথিবী সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে যে সময় নেয় তাকে ভিত্তি করেই আমাদের সৌর বছর বা ক্যালেন্ডার তৈরি হয়।
৩. উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে কেন বিপরীত ঋতু বিরাজ করে? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: পৃথিবী তার কক্ষতলের সঙ্গে ৬৬.৫ ডিগ্রি কোণে হেলে সূর্যকে পরিক্রমণ করে। এই হেলানো অবস্থানের জন্য বিপরীত ঋতু ঘটে:
- উত্তর গোলার্ধ যখন সূর্যের দিকে থাকে: ২১ জুন তারিখের আশেপাশে উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে। তখন উত্তর গোলার্ধে সূর্যরশ্মি লম্বভাবে পড়ে এবং দিনের দৈর্ঘ্য বড় হয়। ফলে সেখানে গ্রীষ্মকাল চলে। ঠিক একই সময়ে দক্ষিণ গোলার্ধ সূর্য থেকে দূরে থাকায় সেখানে শীতকাল বিরাজ করে।
- দক্ষিণ গোলার্ধ যখন সূর্যের দিকে থাকে: ২২ ডিসেম্বর তারিখের আশেপাশে দক্ষিণ গোলার্ধ সূর্যের দিকে ঝুঁকে থাকে। তখন সেখানে সূর্যরশ্মি লম্বভাবে পড়ে এবং গ্রীষ্মকাল বিরাজ করে। এই সময় উত্তর গোলার্ধে দিন ছোট হয় এবং সেখানে শীতকাল থাকে।
- বসন্ত ও শরৎ: একইভাবে ২১ মার্চ ও ২৩ সেপ্টেম্বর পৃথিবী এমন অবস্থানে থাকে যে কোনো গোলার্ধই সূর্যের দিকে ঝুঁকে থাকে না, ফলে এক গোলার্ধে বসন্ত ও অন্য গোলার্ধে শরৎকাল দেখা যায়।
৪. চিত্রসহ পৃথিবীর অনুসূর ও অপসূর অবস্থানের বর্ণনা দাও।
উত্তর: পৃথিবীর কক্ষপথ উপবৃত্তাকার হওয়ায় বছরের বিভিন্ন সময়ে সূর্য ও পৃথিবীর দূরত্ব পরিবর্তিত হয়।
- অনুসূর অবস্থান: ৩ জানুয়ারি পৃথিবী সূর্যের সবচেয়ে কাছে অবস্থান করে। এই সময়ে সূর্য ও পৃথিবীর দূরত্ব হয় প্রায় ১৪ কোটি ৭০ লক্ষ কিমি। এই অবস্থানকে অনুসূর অবস্থান বলে। এই সময় পৃথিবীর পরিক্রমণের গতিবেগ সামান্য বৃদ্ধি পায়।
- অপসূর অবস্থান: ৪ জুলাই পৃথিবী সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করে। এই সময়ে সূর্য ও পৃথিবীর দূরত্ব হয় প্রায় ১৫ কোটি ২০ লক্ষ কিমি। এই অবস্থানকে অপসূর অবস্থান বলে। এই সময় পৃথিবীর পরিক্রমণের গতিবেগ সামান্য হ্রাস পায়।
৫. দিন-রাত্রির দৈর্ঘ্যের হ্রাস-বৃদ্ধির কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: পৃথিবীতে দিন-রাত্রির দৈর্ঘ্য সব সময় সমান থাকে না। এর কারণগুলি হলো:
- অক্ষের কৌণিক অবস্থান: পৃথিবীর অক্ষ তার কক্ষতলের সঙ্গে ৬৬.৫ ডিগ্রি কোণে হেলে থাকার ফলে পরিক্রমণের সময় সূর্যের আলো গোলার্ধ ভেদে কম বা বেশি সময় ধরে পড়ে।
- পরিক্রমণ গতি: পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে বলে ছায়াবৃত্তের অবস্থান ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। ফলে বিভিন্ন অক্ষাংশে দিন ও রাত্রির দৈর্ঘ্যের পার্থক্য ঘটে।
- অয়নান্ত ও বিষুব: ২১ জুন উত্তর গোলার্ধে দিন সবচেয়ে বড় হয় কারণ ওই গোলার্ধ সূর্যের কাছে থাকে। আবার ২২ ডিসেম্বর ওই গোলার্ধে দিন সবচেয়ে ছোট হয়। কেবল ২১ মার্চ ও ২৩ সেপ্টেম্বর পৃথিবী এমনভাবে থাকে যে সব জায়গায় দিন-রাত সমান হয়।
৬. মহাবিষুব ও জলবিষুবের বৈশিষ্ট্যগুলি বর্ণনা করো।
উত্তর: বিষুব কথাটির অর্থ ‘সমান দিন ও রাত’। বছরে দুদিন এই পরিস্থিতি ঘটে:
- মহাবিষুব (২১ মার্চ): এই দিন সূর্য নিরক্ষরেখার ওপর লম্বভাবে কিরণ দেয়। এর ফলে উত্তর গোলার্ধে শীতকাল শেষ হয়ে বসন্তকাল শুরু হয়। দিন ও রাত উভয়ই ১২ ঘণ্টা করে হয়। একে বসন্তকালীন বিষুবও বলা হয়।
- জলবিষুব (২৩ সেপ্টেম্বর): এই দিনটিও সূর্য নিরক্ষরেখার ওপর লম্বভাবে থাকে। উত্তর গোলার্ধে এই সময় গ্রীষ্মকাল শেষ হয়ে শরৎকাল শুরু হয়। পৃথিবীজুড়ে দিন-রাত সমান থাকে। একে শারদীয় বিষুব বলা হয়।
- সার্বজনীন প্রভাব: এই দুই বিষুবীয় দিনেই পৃথিবীর কোনো মেরুই সূর্যের দিকে হেলে থাকে না, ফলে উভয় গোলার্ধ সূর্য থেকে সমান তাপ ও আলো পায়।