সপ্তম শ্রেণি: ইতিহাস, অধ্যায় – ৩ ভারতের সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির কয়েকটি ধারা দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
অধ্যায় ৩: ভারতের সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি
(দীর্ঘ উত্তরধর্মী বা রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: ৫)
📝 ৫ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ ৭টি প্রশ্নোত্তর:
১. পাল ও সেন যুগে বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল? কৃষি ও বাণিজ্যের বিবরণ দাও।
উত্তর: পাল ও সেন যুগে বাংলার অর্থনীতি মূলত কৃষি ও হস্তশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এই সময়কার অর্থনৈতিক অবস্থার পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:
- কৃষিকাজ: বাংলার অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর। প্রধান ফসল ছিল ধান। এছাড়া সরষে, ইক্ষু (আখ), তুলো, পান, সুপারি এবং নানা ধরনের ফলের চাষ হতো। কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬ ভাগ) রাজাকে কর হিসেবে দিতে হতো।
- হস্তশিল্প: কৃষির পাশাপাশি কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্পেরও যথেষ্ট কদর ছিল। কার্পাস বা তুলো দিয়ে তৈরি সুতির কাপড় এবং রেশমের কাপড় সেযুগে খুব বিখ্যাত ছিল। এছাড়া কাঠ, লোহা ও মাটির নানা জিনিসের চল ছিল।
- ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা: অষ্টম শতক থেকে বাংলার বাণিজ্যে কিছুটা অবনতি দেখা দেয়। আরব বণিকদের উত্থান, সমুদ্রপথে জলদস্যুদের ভয় এবং রোমান সাম্রাজ্যের পতনের ফলে বাংলার রফতানি বাণিজ্য মার খায়।
- কড়ির ব্যবহার: বাণিজ্যে মন্দার কারণে সোনা ও রুপোর আমদানি কমে যায়। তাই রাজারা বহুমূল্য ধাতুর মুদ্রা তৈরি কমিয়ে দেন। ফলে দৈনন্দিন জীবনে জিনিসপত্র কেনাবেচার প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে ‘কড়ি’।
২. সেন যুগের হিন্দু সমাজব্যবস্থা বা বর্ণব্যবস্থা কেমন ছিল তা আলোচনা করো।
উত্তর: পাল যুগে সমাজে বৌদ্ধদের প্রভাব বেশি থাকলেও সেন রাজারা ছিলেন গোঁড়া ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী। তাই সেন যুগে বাংলার সমাজব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে।
- ব্রাহ্মণদের আধিপত্য: সেন যুগে হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণদের ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা ছিল সবচেয়ে বেশি। তাঁরাই সমাজের আইনকানুন ও নিয়ম তৈরি করতেন এবং সমাজ পরিচালনা করতেন।
- কঠোর বর্ণপ্রথা: এই সময়ে বর্ণপ্রথা বা জাতপাতের ভেদাভেদ অত্যন্ত কঠোর আকার ধারণ করে। রাজা বল্লাল সেন হিন্দু সমাজে রক্ষণশীলতা বজায় রাখার জন্য ‘কৌলীন্য প্রথা’ চালু করেছিলেন বলে জানা যায়।
- অস্পৃশ্যতা: সমাজে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ বা নিম্নবর্ণের মানুষদের (যেমন- জেলে, ডোম, চণ্ডাল, তাঁতি) কোনো সম্মান ছিল না। ব্রাহ্মণরা তাদের ‘অস্পৃশ্য’ বলে মনে করত এবং তাদের সঙ্গে মেলামেশা বা খাওয়াদাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।
- বৌদ্ধদের অবস্থা: সেন রাজারা গোঁড়া হিন্দু হওয়ায় এই যুগে বৌদ্ধরা সমাজে কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং অনেকেই সমাজ থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসে।
৩. নালন্দা মহাবিহারের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করো।
উত্তর: বর্তমান ভারতের বিহার রাজ্যে অবস্থিত নালন্দা মহাবিহার ছিল প্রাচীন ও মধ্যযুগের ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্র বা বিশ্ববিদ্যালয়।
- আন্তর্জাতিক খ্যাতি: নালন্দায় কেবল ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই নয়, বরং সুদূর চীন, তিব্বত, কোরিয়া এবং মধ্য এশিয়া থেকেও বহু ছাত্র উচ্চশিক্ষার জন্য আসত। এখানে প্রায় ১০,০০০ ছাত্র এবং ১,৫০০ শিক্ষক ছিলেন।
- পাঠ্য বিষয়: এখানে মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শনের পাশাপাশি বেদ, ব্যাকরণ, চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র, গণিত এবং নানা ধরনের ভাষা শিক্ষা দেওয়া হতো।
- কঠোর ভর্তি প্রক্রিয়া: নালন্দায় ভর্তি হওয়া মোটেও সহজ ছিল না। মহাবিহারের দ্বারপণ্ডিতরা অত্যন্ত কঠিন প্রবেশিকা পরীক্ষা নিতেন। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই তবেই ছাত্ররা ভিতরে ঢোকার অনুমতি পেত।
- গ্রন্থাগার ও খরচ: এই মহাবিহারের একটি বিশাল গ্রন্থাগার ছিল। ছাত্রদের পড়াশোনা, থাকা-খাওয়া এবং চিকিৎসার সব খরচ মহাবিহারের তরফ থেকেই বহন করা হতো। রাজা ও ধনী ব্যবসায়ীদের অনুদান এবং বহু গ্রামের রাজস্ব থেকে এই খরচ মেটানো হতো।
৪. ‘চর্যাপদ’ কী? এর ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক গুরুত্ব আলোচনা করো।
উত্তর: চর্যাপদ: পাল যুগে (খ্রিষ্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে) বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের লেখা ধর্মীয় গান ও কবিতার সংকলন হলো ‘চর্যাপদ’। পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে এটি আবিষ্কার করেন। এর ভাষাকে বলা হয় ‘সন্ধ্যা ভাষা’ বা আলো-আঁধারি ভাষা।
ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক গুরুত্ব:
- আদি বাংলা ভাষার নিদর্শন: চর্যাপদ হলো প্রাচীন বাংলা ভাষার আদি বা প্রথম নিদর্শন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস রচনা করতে গেলে চর্যাপদই হলো একমাত্র ভিত্তি।
- সমাজের চিত্র: চর্যাপদের কবিতাগুলোতে সেযুগের সাধারণ, গরিব এবং নিচুতলার মানুষদের (যেমন- ডোম, শবর, জেলে) দৈনন্দিন জীবনের ছবি ফুটে উঠেছে। তাঁরা কীভাবে কুঁড়েঘরে থাকতেন, কীভাবে মাছ ধরতেন বা শিকার করতেন—তার সুন্দর বিবরণ এতে পাওয়া যায়।
- ধর্মীয় মতবাদ: তৎকালীন বজ্রযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের গভীর সাধনভজনের তত্ত্ব চর্যাপদের শ্লোকগুলোতে লুকিয়ে আছে। তাই ধর্মীয় ইতিহাসের উপাদান হিসেবেও এটি অমূল্য।
৫. পাল ও সেন যুগে বাংলার শিল্প ও স্থাপত্যের (বিশেষত ভাস্কর্য ও টেরাকোটা) পরিচয় দাও।
উত্তর: পাল ও সেন যুগে বাংলার শিল্পকলা, বিশেষ করে ভাস্কর্য ও টেরাকোটা বা পোড়ামাটির শিল্প চরম উৎকর্ষ লাভ করেছিল।
- ভাস্কর্য শিল্প: এই যুগের ভাস্কর্যগুলো মূলত পাথর, ব্রোঞ্জ এবং অষ্টধাতু দিয়ে তৈরি হতো। পাল যুগের দুজন সর্বশ্রেষ্ঠ ভাস্কর ছিলেন ধীমান এবং তাঁর পুত্র বীটপাল। তাঁরা নিজস্ব দক্ষতায় পাল শিল্পরীতি বা ‘পূর্বভারতীয় শিল্পরীতি’-র জন্ম দিয়েছিলেন। পাল যুগে বেশিরভাগ বুদ্ধমূর্তি তৈরি হলেও, সেন যুগে বিষ্ণু, শিব এবং পার্বতীর অপরূপ সুন্দর মূর্তি তৈরি হয়েছিল।
- টেরাকোটা বা পোড়ামাটির শিল্প: সাধারণ নরম কাদামাটি দিয়ে নকশা তৈরি করে তাকে আগুনে পুড়িয়ে এই শিল্প তৈরি করা হতো। পাহাড়পুর এবং ময়নামতী বৌদ্ধবিহারে এর প্রচুর নিদর্শন পাওয়া গেছে।
- বিষয়বস্তু: টেরাকোটার ফলকগুলোতে শুধু দেবদেবীর মূর্তি নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবন, শিকার, কৃষিকাজ, পশুপাখি ও নানা সামাজিক অনুষ্ঠানের ছবি ফুটে উঠেছে, যা তৎকালীন বাংলার সমাজজীবনের বাস্তব দলিল।
- স্থাপত্য: স্থাপত্যের দিক থেকেও এই যুগ পিছিয়ে ছিল না। ধর্মপাল প্রতিষ্ঠিত ‘সোমপুরী মহাবিহার’ (পাহাড়পুর) ছিল সেযুগের বিশাল এবং অসামান্য এক স্থাপত্য কীর্তি।
৬. পাল যুগের ধর্মীয় অবস্থা কেমন ছিল? মহাযান থেকে বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের রূপান্তর ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: পাল রাজারা নিজেরা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক। কিন্তু তাঁদের আমলে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মে অনেক পরিবর্তন এসেছিল। ধর্মীয় সমন্বয় এবং সহনশীলতা ছিল এই যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
- ধর্মীয় পরমতসহিষ্ণুতা: পাল রাজারা বৌদ্ধ হলেও তাঁরা হিন্দু বা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাঁরা ব্রাহ্মণদের নিষ্কর জমি দান করতেন এবং অনেক ব্রাহ্মণ পাল রাজসভায় মন্ত্রীর পদ অলংকৃত করতেন।
- বজ্রযানের উদ্ভব: অষ্টম ও নবম শতকে মহাযান বৌদ্ধধর্মের সাথে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অনেক রীতিনীতি, দেবদেবী, তন্ত্রমন্ত্র এবং জাদুবিদ্যা মিশে যেতে থাকে। এর ফলে মহাযান বৌদ্ধধর্ম একটি নতুন রূপ লাভ করে, যাকে বলা হয় ‘বজ্রযান’ বা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম।
- সিদ্ধাচার্যদের প্রভাব: এই বজ্রযান মতবাদের নেতাদের সিদ্ধাচার্য বলা হতো। এই মতবাদ অনুযায়ী, জাদুবিদ্যা ও গুপ্ত মন্ত্রের (তন্ত্র) মাধ্যমেই মোক্ষ বা মুক্তি লাভ সম্ভব। চর্যাপদের শ্লোকগুলোতে এই তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের সাধনভজনের কথাই বলা হয়েছে।
৭. অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান কে ছিলেন? তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে তাঁর কী অবদান ছিল?
উত্তর: অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (৯৮২-১০৫৪ খ্রিঃ) ছিলেন একাদশ শতকের প্রাচীন বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ পণ্ডিত, দার্শনিক এবং বিক্রমশীল মহাবিহারের অধ্যক্ষ। তিনি বঙ্গদেশের বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে এক রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তিব্বতে তাঁর অবদান:
- বৌদ্ধধর্মের সংস্কার: তিব্বতের রাজা জ্ঞানপ্রভের বারংবার আমন্ত্রণে তিনি তিব্বতে যান। সেই সময় তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম নানা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল। তিনি তিব্বতে গিয়ে তন্ত্রমন্ত্রের বদলে মহাযান বৌদ্ধধর্মের বিশুদ্ধ রূপটি প্রচার করেন এবং ধর্মীয় কুসংস্কার দূর করেন।
- গ্রন্থ রচনা ও অনুবাদ: তিনি তিব্বতি ভাষায় বহু সংস্কৃত বৌদ্ধ গ্রন্থ অনুবাদ করেন এবং নিজে বেশ কিছু ধর্মীয় বই লেখেন। এর ফলে তিব্বতি ভাষা ও সাহিত্যেরও যথেষ্ট উন্নতি হয়।
- অভূতপূর্ব সম্মান: তাঁর অসীম পাণ্ডিত্য এবং চরিত্রগুণের জন্য তিব্বতিরা তাঁকে ‘বুদ্ধের অবতার’ বা অতীশ (শ্রেষ্ঠ) বলে মনে করতেন। তিব্বতেই তাঁর মৃত্যু হয় এবং আজও তিব্বতে তিনি একজন অত্যন্ত পূজনীয় দেবতা হিসেবে পূজিত হন।