সপ্তম শ্রেণি: ইতিহাস, অধ্যায় – ৩ ভারতের সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির কয়েকটি ধারা, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
অধ্যায় ৩: ভারতের সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি
(সংক্ষিপ্ত ও বিশ্লেষণমূলক প্রশ্নোত্তর – মান: ২/৩)
✍️ ২/৩ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ ১৫টি প্রশ্নোত্তর:
১. পাল ও সেন যুগে বাংলার কৃষিকাজ কেমন ছিল?
উত্তর: পাল ও সেন যুগে বাংলার মানুষের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষিকাজ। এখানকার মাটি উর্বর হওয়ায় প্রচুর ফসল ফলত।
১. প্রধান ফসল: বাংলার প্রধান ফসল ছিল ধান।
২. অন্যান্য ফসল: ধান ছাড়াও সরষে, তুলো, পান, সুপারি, এলাচ এবং নানা ধরনের ফলের (যেমন- আম, কাঁঠাল, কলা) চাষ হতো।
৩. অর্থকরী ফসল: ইক্ষু বা আখ এবং তুলো ছিল সেই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল।
২. অষ্টম শতক থেকে বাংলার বাণিজ্যে কেন মন্দা বা অবনতি দেখা দেয়?
উত্তর: অষ্টম শতক থেকে বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেওয়ার প্রধান কারণগুলি হলো:
১. রোমান সাম্রাজ্যের পতন: এই সময়ে রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে ভারতের সাথে পাশ্চাত্যের বাণিজ্যে ধাক্কা লাগে।
২. আরব বণিকদের উত্থান: সমুদ্রপথে আরব বণিকদের দাপট বৃদ্ধি পায়, ফলে বাংলার বণিকদের ব্যবসা কমে যায়।
৩. জলদস্যুর ভয়: সমুদ্রপথে জলদস্যুদের আক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় দূরপাল্লার বাণিজ্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল।
৩. পাল যুগে মুদ্রার ব্যবহার কমে গিয়ে ‘কড়ি’-র প্রচলন বেড়েছিল কেন?
উত্তর: অষ্টম শতকের পর ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা দেখা দিলে বিদেশ থেকে সোনা ও রুপোর আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে রাজারা মূল্যবান ধাতুর মুদ্রা তৈরি করা কমিয়ে দেন। দৈনন্দিন কেনাকাটা এবং ছোটখাটো ব্যবসার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ তাই বাধ্য হয়েই মুদ্রার বিকল্প হিসেবে সমুদ্রের শামুক জাতীয় প্রাণীর খোলস অর্থাৎ ‘কড়ি’-র ব্যবহার শুরু করে।
৪. পাল যুগে বৌদ্ধধর্মের কী রূপান্তর ঘটেছিল (বজ্রযান কী)?
উত্তর: পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক হলেও তাঁদের আমলে বৌদ্ধধর্মে অনেক পরিবর্তন আসে। মহাযান বৌদ্ধধর্মের সাথে স্থানীয় নানা দেবদেবী, তন্ত্রমন্ত্র, জাদুবিদ্যা ও হিন্দু ধর্মের কিছু প্রভাব মিশে গিয়ে এক নতুন মতবাদের সৃষ্টি হয়, যাকে বলা হতো ‘বজ্রযান’ বা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম। এই মতবাদের নেতাদের সিদ্ধাচার্য বলা হতো।
৫. সেন যুগে বাংলার সমাজব্যবস্থা কেমন ছিল?
উত্তর: সেন যুগে বাংলার সমাজে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের (হিন্দু ধর্ম) প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছিল।
১. বর্ণপ্রথা: এই সময়ে সমাজে জাতপাতের বিভেদ বা বর্ণপ্রথা অত্যন্ত কঠোর আকার ধারণ করে। ব্রাহ্মণরা সমাজের সর্বোচ্চ মর্যাদা ভোগ করত।
২. অস্পৃশ্যতা: সমাজে নিম্নবর্ণের মানুষ এবং সাধারণ শ্রমজীবী মানুষদের (যেমন- জেলে, ডোম, চণ্ডাল) অস্পৃশ্য বলে গণ্য করা হতো এবং তাদের সামাজিক অধিকার ছিল না বললেই চলে।
৬. চর্যাপদ কী? এর আবিষ্কারক কে ছিলেন?
উত্তর: চর্যাপদ হলো প্রাচীন বাংলার ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন। এটি মূলত পাল যুগে (খ্রিষ্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে) রচিত বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের ধর্মীয় গান বা কবিতার সংকলন।
আবিষ্কারক: বাঙালি পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে এই চর্যাপদের পুঁথি আবিষ্কার করেন।
৭. চর্যাপদের ভাষাকে ‘সন্ধ্যা ভাষা’ বা ‘আলো-আঁধারি ভাষা’ বলা হয় কেন?
উত্তর: চর্যাপদ লেখা হয়েছিল আদি বাংলা ভাষায়। এর ভাষাকে ‘সন্ধ্যা ভাষা’ বলা হয় কারণ এর দুটি অর্থ আছে। সন্ধ্যার সময় যেমন আলো ও অন্ধকারের মিলনে সবকিছু অর্ধেক বোঝা যায় আর অর্ধেক অস্পষ্ট থাকে, তেমনি চর্যাপদের ভাষার একটি বাইরের সাধারণ অর্থ আছে, আর একটি গভীর ধর্মীয় বা সাধনভজনের গোপন অর্থ আছে, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন।
৮. লক্ষণ সেনের রাজসভার ‘পঞ্চরত্ন’ কাদের বলা হতো? তাঁদের সাহিত্যকীর্তি উল্লেখ করো।
উত্তর: সেন রাজা লক্ষণ সেনের রাজসভায় পাঁচজন অত্যন্ত জ্ঞানী ও গুণী কবি ছিলেন, যাঁদের একত্রে ‘পঞ্চরত্ন’ বলা হতো।
তাঁরা হলেন:
১. জয়দেব (তিনি ‘গীতগোবিন্দম’ রচনা করেন)।
২. ধোয়ী (তিনি ‘পবনদূত’ কাব্য রচনা করেন)।
৩. গোবর্ধন, ৪. উমাপতিধর এবং ৫. শরণ।
৯. ‘দানসাগর’ ও ‘অদ্ভুতসাগর’ গ্রন্থ দুটির রচয়িতা কে? এই গ্রন্থগুলি থেকে কী জানা যায়?
উত্তর: ‘দানসাগর’ ও ‘অদ্ভুতসাগর’ গ্রন্থ দুটির রচয়িতা হলেন সেন বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা বল্লাল সেন।
বিষয়বস্তু: ‘দানসাগর’ গ্রন্থ থেকে হিন্দু সমাজের বর্ণাশ্রম, নানা ধরনের ধর্মীয় নিয়মকানুন ও দানধ্যান সম্পর্কে জানা যায়। অন্যদিকে ‘অদ্ভুতসাগর’ হলো মূলত জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং নানা শুভ-অশুভ লক্ষণ সম্পর্কিত একটি বই।
১০. অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান কে ছিলেন? তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি কী?
উত্তর: অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ছিলেন একাদশ শতকের বাংলার একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ পণ্ডিত ও দার্শনিক। তিনি বিক্রমশীল মহাবিহারের অধ্যক্ষ ছিলেন।
কীর্তি: তিব্বতের রাজার আমন্ত্রণে তিনি তিব্বতে যান এবং সেখানে মহাযান বৌদ্ধধর্মের বিশুদ্ধ রূপ প্রচার করেন। তাঁর পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে তিব্বতিরা তাঁকে ‘বুদ্ধের অবতার’ বা অত্যন্ত পূজনীয় হিসেবে সম্মান করতেন।
১১. নালন্দা মহাবিহার সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর: নালন্দা মহাবিহার ছিল প্রাচীন ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাকেন্দ্র। বর্তমান বিহার রাজ্যে এটি অবস্থিত ছিল।
১. এখানে কেবল ভারত থেকে নয়, চীন, তিব্বত, কোরিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে ছাত্ররা পড়তে আসত।
২. এখানে বৌদ্ধ ধর্মের পাশাপাশি বেদ, ব্যাকরণ, চিকিৎসাবিদ্যা ও জ্যোতিষশাস্ত্র পড়ানো হতো। বাঙালি পণ্ডিত শীলভদ্র একসময় এই মহাবিহারের অধ্যক্ষ ছিলেন।
১২. পাল যুগের দুজন বিখ্যাত শিল্পী ও ভাস্করের নাম লেখো এবং তাঁদের অবদান কী ছিল?
উত্তর: পাল যুগের দুজন সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী ও ভাস্কর ছিলেন ধীমান এবং তাঁর পুত্র বীটপাল।
অবদান: তাঁরা পাথর, ব্রোঞ্জ ও অষ্টধাতু দিয়ে অপূর্ব সুন্দর দেবদেবীর মূর্তি ও বৌদ্ধ ভাস্কর্য নির্মাণে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। তাঁরা প্রাচীন শিল্পরীতির সাথে নিজেদের কল্পনার মিশেল ঘটিয়ে পাল শিল্পরীতি বা ‘পূর্বভারতীয় শিল্পরীতি’-র জন্ম দিয়েছিলেন।
১৩. পাল ও সেন যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞানের কেমন উন্নতি হয়েছিল?
উত্তর: পাল ও সেন যুগে আয়ুর্বেদ বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছিল। এই সময়ের সবচেয়ে বিখ্যাত চিকিৎসক ও পণ্ডিত ছিলেন চক্রপাণি দত্ত। তিনি প্রাচীন ভারতের শ্রেষ্ঠ দুই চিকিৎসক চরক ও সুশ্রুতের রচনার ওপর সুন্দর টীকা লিখেছিলেন। এছাড়া, তাঁর নিজের লেখা বিখ্যাত চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থটির নাম হলো ‘চিকিৎসাসংগ্রহ’।
১৪. ‘স্তূপ’ এবং ‘বিহার’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর:
স্তূপ: গৌতম বুদ্ধ বা কোনো সম্মানীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুর পবিত্র দেহাবশেষ (যেমন- চুল, দাঁত, হাড়) মাটির নিচে পুঁতে রেখে তার ওপর যে গম্বুজের মতো ইটের বা পাথরের ঢিবি তৈরি করা হতো, তাকে স্তূপ বলে।
বিহার: বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বা ভিক্ষুদের একসঙ্গে থাকার স্থান এবং শিক্ষাকেন্দ্রগুলিকে বিহার বা মহাবিহার বলা হতো।
১৫. পাল যুগের ‘টেরাকোটা’ বা পোড়ামাটির শিল্প সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর: পাল যুগে পাথরের পাশাপাশি পোড়ামাটি বা টেরাকোটার শিল্পের ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল। নরম কাদামাটি দিয়ে নানা রকম নকশা বা মূর্তি বানিয়ে তা আগুনে পুড়িয়ে এই শিল্প তৈরি করা হতো। পাহাড়পুর এবং ময়নামতী বৌদ্ধবিহারে প্রচুর পোড়ামাটির ফলক পাওয়া গেছে। এই ফলকগুলিতে কেবল দেবদেবী নয়, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কৃষিকাজ, শিকার, পশুপাখি ও খেলাধুলার চমৎকার ছবি ফুটে উঠেছে।