মকটেস্ট বেছে নাও

অফলাইন মকটেস্ট

খুব শীঘ্রই আপলোড হবে!

সপ্তম শ্রেণি: ইতিহাস, মুঘল সাম্রাজ্য, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর।

অধ্যায় ৫: মোগল সাম্রাজ্য
(দীর্ঘ উত্তরধর্মী বা রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: ৫)

📝 ৫ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ ৭টি প্রশ্নোত্তর:

১. পানিপথের প্রথম যুদ্ধের (১৫২৬ খ্রিঃ) কারণ ও ফলাফল বিস্তারিত আলোচনা করো।

উত্তর: ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদি এবং জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবরের মধ্যে ঐতিহাসিক পানিপথের প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

যুদ্ধের কারণ:

  • সুলতানের স্বৈরাচার: ইব্রাহিম লোদি অত্যন্ত অহংকারী ও স্বৈরাচারী ছিলেন। তিনি নিজের আত্মীয় ও আফগান অভিজাতদের ওপর অকথ্য অত্যাচার করতেন। ফলে তাঁরা সুলতানের ওপর ক্ষুব্ধ হন।
  • বাবরকে আমন্ত্রণ: সুলতানের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পাঞ্জাবের শাসক দৌলত খান লোদি এবং ইব্রাহিমের কাকা আলম খান লোদি, বাবরকে ভারত আক্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানান। বাবর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাম্রাজ্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে ভারত আক্রমণ করেন।

যুদ্ধের ফলাফল ও গুরুত্ব:

  • ইব্রাহিম লোদির বিশাল বাহিনী থাকা সত্ত্বেও, বাবরের সুদক্ষ সেনাবাহিনী, গোলন্দাজ বা কামান বাহিনী এবং ‘তুলঘুমা’ নামক অভিনব রণকৌশলের কাছে ইব্রাহিম লোদি শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও নিহত হন।
  • এই যুদ্ধের ফলে ভারতে দীর্ঘকাল ধরে চলা সুলতানি শাসনের চিরতরে অবসান ঘটে।
  • বাবর জয়লাভ করে দিল্লিতে অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন এবং ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন।

২. শাসক হিসেবে শেরশাহের কৃতিত্ব এবং তাঁর শাসনব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি কী ছিল?

উত্তর: আফগান শাসক শেরশাহ মাত্র পাঁচ বছর (১৫৪০-১৫৪৫ খ্রিঃ) রাজত্ব করলেও তিনি যে অপূর্ব শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, তা ভারতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর শাসনব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:

  • ভূমি রাজস্ব ও কৃষক কল্যাণ: কৃষকদের স্বার্থরক্ষার জন্য তিনি জমি জরিপ করেন। কৃষকদের জমির ওপর তাদের অধিকার স্বীকার করে তিনি ‘পাট্টা’ (সরকারি স্বীকৃতিপত্র) প্রদান করেন এবং এর বদলে কৃষকরা নির্দিষ্ট কর দেওয়ার কথা স্বীকার করে সরকারকে ‘কবুলিয়ত’ নামক দলিল দিত।
  • যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি: ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেনাবাহিনীর দ্রুত যাতায়াতের জন্য তিনি সোনারগাঁ থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত সুদীর্ঘ ‘সড়ক-ই-আজম’ নির্মাণ করেন।
  • জনকল্যাণমূলক কাজ: রাস্তার দু-ধারে তিনি প্রচুর গাছ লাগান এবং পথিকদের বিশ্রামের জন্য বহু সরাইখানা (বিশ্রামাগার) ও পানীয় জলের কুয়ো তৈরি করেন।
  • মুদ্রা ব্যবস্থা: ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার জন্য তিনি ‘রূপিয়া’ নামক খাঁটি রুপোর মুদ্রা এবং তামার মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন।
  • বিচার ব্যবস্থা: তাঁর বিচার ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কঠোর ও নিরপেক্ষ। অপরাধী যেই হোক না কেন, সে কঠোর শাস্তি পেত।

৩. সম্রাট আকবরের রাজপুত নীতির কারণ ও ফলাফল আলোচনা করো।

উত্তর: সম্রাট আকবর অত্যন্ত দূরদর্শী শাসক ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতের বীর রাজপুত জাতিকে শত্রু বানিয়ে মোগল সাম্রাজ্যকে স্থায়ী ও শক্তিশালী করা যাবে না। তাই তিনি তাঁদের প্রতি মৈত্রী ও বন্ধুত্বের নীতি গ্রহণ করেন।

রাজপুত নীতির বৈশিষ্ট্য:

  • বৈবাহিক সম্পর্ক: তিনি নিজে বেশ কয়েকজন রাজপুত রাজকন্যাকে বিবাহ করেন (যেমন- যোধাবাঈ)।
  • উচ্চ পদে নিয়োগ: মানসিংহ, টোডরমল, ভগবান দাসের মতো যোগ্য রাজপুত নেতাদের তিনি সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে এবং নিজের রাজসভায় স্থান দিয়েছিলেন।
  • ধর্মীয় স্বাধীনতা: তিনি রাজপুতদের জোর করে ধর্মান্তরিত করেননি, বরং তাঁদের সম্পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছিলেন এবং হিন্দুদের ওপর থেকে তীর্থকর ও জিজিয়া কর তুলে নিয়েছিলেন।
  • কঠোরতা: যেসব রাজপুত রাজা (যেমন- মেওয়ারের রানা প্রতাপ সিংহ) তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেননি, তাঁদের বিরুদ্ধে তিনি কঠোর যুদ্ধনীতিও গ্রহণ করেছিলেন (যেমন- হলদিঘাটির যুদ্ধ)।

ফলাফল:

আকবরের এই নীতির ফলে রাজপুতরা মোগলদের বিশ্বস্ত মিত্রে পরিণত হয়। তাদের সামরিক দক্ষতা ও বীরত্ব মোগল সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ও সুরক্ষায় এক বিশাল ভূমিকা পালন করেছিল।

৪. আকবরের প্রবর্তিত ‘মনসবদারি প্রথা’ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করো।

উত্তর: সম্রাট আকবর তাঁর সেনাবাহিনী এবং প্রশাসনকে সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী করার জন্য যে অভিনব ব্যবস্থা চালু করেন, তাকে ‘মনসবদারি প্রথা’ বলা হয়। ফারসি শব্দ ‘মনসব’-এর অর্থ হলো ‘পদ’ বা ‘পদমর্যাদা’।

  • মনসবদার কারা: মোগল প্রশাসনে বা সেনাবাহিনীতে যাঁদের কোনো পদে নিয়োগ করা হতো, তাঁদের সকলকেই ‘মনসবদার’ বলা হতো।
  • পদের বিভাজন (জাট ও সওয়ার): মনসবদারদের দুটি দায়িত্ব ছিল। তাঁদের ব্যক্তিগত পদমর্যাদাকে বলা হতো ‘জাট’, যার ওপর ভিত্তি করে তাঁদের বেতন স্থির হতো। আর তাঁদের যে নির্দিষ্ট সংখ্যক ঘোড়সওয়ার সৈন্য পালন করতে হতো, তাকে বলা হতো ‘সওয়ার’।
  • নিয়োগ ও পদোন্নতি: মনসবদারদের নিয়োগ, পদোন্নতি এবং পদচ্যুতি সম্পূর্ণভাবে সম্রাটের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করত। এই পদ বংশানুক্রমিক ছিল না। কোনো মনসবদারের মৃত্যু হলে তাঁর পদ ও সম্পত্তি রাষ্ট্র বাজেয়াপ্ত করে নিত।
  • বেতন: মনসবদারদের বেতনের বদলে অনেক সময় নগদ অর্থ অথবা নির্দিষ্ট এলাকার রাজস্ব আদায়ের অধিকার (জায়গির) দেওয়া হতো।
  • ফলাফল: এই প্রথার ফলে সম্রাটের প্রতি অনুগত এক বিশাল ও শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে ওঠে, যা মোগল সাম্রাজ্যের নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করেছিল।

৫. আকবরের ধর্মনীতি ও ‘দ্বীন-ই-ইলাহি’ সম্পর্কে যা জানো লেখো।

উত্তর: সম্রাট আকবর ছিলেন চরম ধর্মসহিষ্ণু এবং উদার মানসিকতার শাসক। তিনি বিশ্বাস করতেন যে কোনো ধর্মই সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়, আবার সব ধর্মেই কিছু না কিছু ভালো দিক আছে।

  • ইবাদতখানা নির্মাণ: সকল ধর্মের ভালো দিকগুলো জানার জন্য তিনি ফতেপুর সিক্রিতে ‘ইবাদতখানা’ (প্রার্থনা গৃহ) নির্মাণ করেন। সেখানে ইসলাম, হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মের পণ্ডিতদের ডেকে তিনি নিয়মিত ধর্মীয় আলোচনা করতেন।
  • উদার নীতি: তিনি হিন্দুদের ওপর থেকে অমানবিক জিজিয়া কর এবং তীর্থকর তুলে নেন। তাঁর রাজ্যে সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার ভোগ করত।
  • দ্বীন-ই-ইলাহি: বিভিন্ন ধর্মের মূল নির্যাস এবং ভালো দিকগুলো একত্রিত করে ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে আকবর এক নতুন ধর্মীয় আদর্শ প্রচার করেন, যার নাম ‘দ্বীন-ই-ইলাহি’ বা ‘তৌহিদ-ই-ইলাহি’।
  • মূল নীতি: এটি কোনো প্রথাগত ধর্ম ছিল না। এর মূল লক্ষ্য ছিল ঈশ্বরের একত্ববাদ (ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়) এবং সর্বজনীন শান্তি ও সম্প্রীতি (সুলহ্-ই-কুল) প্রতিষ্ঠা করা। এই মতবাদ গ্রহণ করা কারও জন্যই বাধ্যতামূলক ছিল না, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাধীন ছিল।

৬. মোগল স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে সম্রাট শাহজাহানের অবদান আলোচনা করো।

উত্তর: সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালকে মোগল স্থাপত্যের ‘সুবর্ণ যুগ’ বলা হয়। ইমারত নির্মাণের প্রতি তাঁর এতই প্রবল আকর্ষণ ছিল যে ঐতিহাসিকরা তাঁকে ‘স্থপতিদের যুবরাজ’ আখ্যা দিয়েছেন।

  • তাজমহল: তাঁর শ্রেষ্ঠ এবং অমর কীর্তি হলো আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত ‘তাজমহল’। প্রিয় পত্নী মমতাজ মহলের স্মৃতির উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ শ্বেতপাথর দিয়ে নির্মিত এই স্মৃতিসৌধটি পৃথিবীর অন্যতম এক বিস্ময়।
  • দিল্লির লালকেল্লা: তিনি নিজের রাজধানী আগ্রা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করেন এবং সেখানে লাল বেলেপাথর দিয়ে এক বিশাল ও সুরক্ষিত দুর্গ নির্মাণ করেন, যা ‘লালকেল্লা’ নামে পরিচিত।
  • জামা মসজিদ: দিল্লির লালকেল্লার কাছেই তিনি ভারতের বৃহত্তম মসজিদ ‘জামা মসজিদ’ নির্মাণ করেন।
  • ময়ূর সিংহাসন: স্থাপত্যের পাশাপাশি তিনি বহুমূল্য মণি-মুক্তো এবং কোহিনূর হিরে দিয়ে অপূর্ব সুন্দর ‘ময়ূর সিংহাসন’ তৈরি করিয়েছিলেন, যা তাঁর ঐশ্বর্য ও শিল্পবোধের চরম নিদর্শন।

৭. সম্রাট ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি মোগল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য কতটা দায়ী ছিল?

উত্তর: সম্রাট ঔরঙ্গজেবের দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চলা দাক্ষিণাত্য বা দক্ষিণ ভারত দখলের নীতি মোগল সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

  • অর্থনৈতিক বিপর্যয়: মারাঠাদের দমন এবং বিজাপুর ও গোলকুণ্ডা জয়ের জন্য দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে যুদ্ধ চালাতে গিয়ে মোগল রাজকোষ সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে যায়। সাম্রাজ্যের অর্থনীতি ভয়াবহভাবে ভেঙে পড়ে।
  • প্রশাসনিক শিথিলতা: সম্রাট নিজে দিনের পর দিন সুদূর দক্ষিণ ভারতে পড়ে থাকায় উত্তর ভারতে (রাজধানীতে) প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ চরমভাবে শিথিল হয়ে পড়ে। দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
  • মারাঠাদের প্রতিরোধ: শিবাজি এবং তাঁর পরবর্তী মারাঠা নেতাদের গেরিলা যুদ্ধনীতির কাছে মোগল সেনাবাহিনী চরম নাজেহাল হয়। ঔরঙ্গজেব মারাঠাদের কখনোই সম্পূর্ণভাবে দমন করতে পারেননি, বরং এই যুদ্ধ মোগলদের সামরিক মর্যাদাকে ধুলিসাৎ করে দেয়।
  • কৃষক বিদ্রোহ: দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধের খরচ জোগাতে গিয়ে সাধারণ কৃষক ও প্রজাদের ওপর করের বোঝা চাপানো হয়, যার ফলে জাঠ, সৎনামী এবং শিখরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

সব মিলিয়ে ঔরঙ্গজেবের এই দাক্ষিণাত্য নীতি বিশাল মোগল সাম্রাজ্যের ভিতকে সম্পূর্ণ নড়বড়ে করে দিয়েছিল, যা তাঁর মৃত্যুর পরেই পতনের দিকে এগিয়ে যায়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার