সপ্তম শ্রেণি: ইতিহাস, অধ্যায়- 9, আজকের ভারত: সরকার, স্বশাসন ও গণতন্ত্র, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
অধ্যায় ৯: আজকের ভারত
(দীর্ঘ উত্তরধর্মী বা রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: ৫)
📝 ৫ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ ৬টি প্রশ্নোত্তর:
১. ভারতীয় সংবিধান রচনার প্রেক্ষাপট এবং ড. বি. আর. আম্বেদকরের ভূমিকা আলোচনা করো।
উত্তর: ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হওয়ার পর দেশকে সঠিক পথে চালানোর জন্য একটি স্থায়ী আইনের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই উদ্দেশ্যেই সংবিধান রচনার কাজ শুরু হয়।
- সংবিধান সভা গঠন: ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে গণপরিষদ বা সংবিধান সভা গঠিত হয়। এর প্রধান কাজ ছিল ভারতের জন্য একটি সংবিধান তৈরি করা। ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ ছিলেন এই সভার সভাপতি।
- খসড়া কমিটি: সংবিধান রচনার জন্য একটি খসড়া কমিটি তৈরি করা হয়। এই কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন ড. বি. আর. আম্বেদকর।
- আম্বেদকরের ভূমিকা: আম্বেদকর বিভিন্ন দেশের সংবিধান পর্যালোচনা করে ভারতের উপযোগী একটি খসড়া তৈরি করেন। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া ও অবহেলিত মানুষের অধিকার সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য।
- সংবিধান গ্রহণ ও কার্যকর: ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ নভেম্বর সংবিধান চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয় এবং ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি থেকে এটি সারাদেশে কার্যকর হয়। এই অসামান্য অবদানের জন্যই তাঁকে ‘সংবিধানের জনক’ বলা হয়।
২. ভারতীয় সংবিধানের প্রধান আদর্শ ও বৈশিষ্ট্যগুলি সংক্ষেপে বর্ণনা করো।
উত্তর: ভারতের সংবিধান হলো বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লিখিত দলিল। এর প্রধান আদর্শগুলি সংবিধানের মুখবন্ধ বা প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
- সার্বভৌম রাষ্ট্র: ভারত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র, অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সব বিষয়েই ভারত সম্পূর্ণ স্বাধীন। কোনো বিদেশি শক্তি ভারতের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
- গণতন্ত্র: ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এ দেশের শাসনক্ষমতার উৎস হলো সাধারণ মানুষ। নাগরিকরা ভোটের মাধ্যমে সরকার নির্বাচন করেন।
- সাধারণতন্ত্র: ভারত একটি সাধারণতন্ত্র কারণ এ দেশের সর্বোচ্চ প্রধান (রাষ্ট্রপতি) বংশপরম্পরায় নিযুক্ত হন না, তিনি পরোক্ষভাবে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন।
- যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো: এ দেশে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
- মৌলিক অধিকার: সংবিধানে দেশের নাগরিকদের কিছু মৌলিক অধিকার প্রদান করা হয়েছে, যাতে কেউ তাঁদের ওপর অন্যায় করতে না পারে।
৩. পশ্চিমবঙ্গের ত্রিস্তর বিশিষ্ট পঞ্চায়েত ব্যবস্থার গঠন ও কার্যাবলি আলোচনা করো।
উত্তর: গ্রামে স্বশাসন বা নিজেদের শাসন নিজেরা চালানোর ব্যবস্থাকেই বলা হয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ব্যবস্থা তিনটি স্তরে বিভক্ত:
- গ্রাম পঞ্চায়েত: এটি সর্বনিম্ন স্তর। গ্রামের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকরা ভোটের মাধ্যমে এর সদস্য নির্বাচন করেন। এর প্রধানকে বলা হয় ‘প্রধান’। এরা গ্রামের ছোটোখাটো বিরোধ মেটানো এবং উন্নয়নমূলক কাজ করে।
- পঞ্চায়েত সমিতি: এটি ব্লক স্তরের স্বশাসিত সংস্থা। কয়েকটি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে একটি ব্লক গঠিত হয়। ব্লকের উন্নয়নমূলক কাজ সমন্বয় করা এর প্রধান কাজ।
- জেলা পরিষদ: এটি জেলা স্তরের সর্বোচ্চ সংস্থা। জেলার সামগ্রিক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন তদারকি করা এর দায়িত্ব।
- কার্যাবলি: পঞ্চায়েত মূলত গ্রামের রাস্তাঘাট তৈরি, পানীয় জলের ব্যবস্থা, কৃষি উন্নয়ন, প্রাথমিক শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার কাজ করে থাকে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সরাসরি শাসনকার্যে অংশ নিতে পারে।
৪. ভারতীয় সংসদের গঠন ও কক্ষ দুটির ভূমিকা আলোচনা করো।
উত্তর: ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভাকে বলা হয় পার্লামেন্ট বা সংসদ। এটি রাষ্ট্রপতি এবং দুটি কক্ষ নিয়ে গঠিত।
- লোকসভা (নিম্নকক্ষ): লোকসভার সদস্যরা দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের দ্বারা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। এটি একটি শক্তিশালী কক্ষ কারণ দেশের বাজেট ও নতুন আইন তৈরির ক্ষেত্রে এর ভূমিকা প্রধান।
- রাজ্যসভা (উচ্চকক্ষ): এটি একটি স্থায়ী কক্ষ। এর সদস্যরা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। এর মেয়াদ ৬ বছর এবং প্রতি ২ বছর অন্তর এক-তৃতীয়াংশ সদস্য অবসর নেন। উপরাষ্ট্রপতি রাজ্যসভার সভাপতিত্ব করেন।
- আইন প্রণয়ন: কোনো নতুন বিল বা আইন পাস করতে হলে উভয় কক্ষের সম্মতির প্রয়োজন হয়। উভয় কক্ষে পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর পেলে তবেই সেটি আইনে পরিণত হয়।
৫. শহর এলাকার স্বশাসিত সংস্থা হিসেবে পুরসভা বা পৌরনিগমের গুরুত্ব আলোচনা করো।
উত্তর: বড়ো শহর বা নগরীর জনজীবনকে সুস্থ ও সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য পুরসভা বা পৌরনিগম (কর্পোরেশন) কাজ করে।
- গঠন: শহরকে কতগুলো ওয়ার্ডে ভাগ করা হয়। ওয়ার্ডের প্রতিনিধি বা কাউন্সিলাররা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। পুরসভার প্রধানকে চেয়ারম্যান এবং পৌরনিগমের প্রধানকে ‘মেয়র’ বলা হয়।
- নাগরিক সুবিধা: শহরের রাস্তাঘাট সংস্কার, জঞ্জাল পরিষ্কার, নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতি এবং মহামারীর হাত থেকে শহরবাসীকে রক্ষা করা এদের প্রধান দায়িত্ব।
- পানীয় জল ও আলো: নাগরিকদের ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ করা এবং রাস্তায় আলোর ব্যবস্থা করা পুরসভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
- জন্ম-মৃত্যু নথিভুক্তকরণ: এলাকায় কেউ জন্মালে বা মারা গেলে তার শংসাপত্র দেওয়ার কাজও পুরসভা করে থাকে। শহরের শৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্য রক্ষায় এদের ভূমিকা অপরিসীম।
৬. গণতান্ত্রিক সরকার বলতে কী বোঝো? একটি আদর্শ গণতন্ত্রে নাগরিকের ভূমিকা কী?
উত্তর: গণতান্ত্রিক সরকার মানে হলো ‘জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা সরকার এবং জনগণের জন্য সরকার’।
- মূল বৈশিষ্ট্য: গণতন্ত্রে সরকার পরিচালনার চূড়ান্ত ক্ষমতা কোনো রাজা বা একনায়কের হাতে থাকে না। সাধারণ নাগরিকরা ভোটের মাধ্যমে ঠিক করেন কারা দেশ শাসন করবেন।
- নাগরিকের ভূমিকা: একটি আদর্শ গণতন্ত্রে নাগরিকরা কেবল ৫ বছর অন্তর ভোট দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন না। তাঁরা সরকারের কাজের ওপর নজর রাখেন।
- অধিকার ও সচেতনতা: নাগরিকরা গঠনমূলক সমালোচনা করে সরকারের ভুল ধরিয়ে দিতে পারেন। সংবাদমাধ্যম ও জনমতের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের মতামত প্রকাশ করেন।
- উপসংহার: গণতন্ত্র তখনই সফল হয় যখন দেশের প্রতিটি মানুষ সচেতন হন এবং নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে অবগত থাকেন। মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণই গণতন্ত্রের আসল প্রাণশক্তি।