মকটেস্ট বেছে নাও

অফলাইন মকটেস্ট

খুব শীঘ্রই আপলোড হবে!

সপ্তম শ্রেণি বাংলা, পটলবাবু, ফিল্মস্টার – সত্যজিৎ রায়, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

অধ্যায়: পটলবাবু, ফিল্মস্টার

(দীর্ঘ / রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 4)

নিচের প্রশ্নগুলির প্রাসঙ্গিক ও বিস্তারিত উত্তর দাও:

1. একটিমাত্র শব্দ ‘ওহ্!’-কে পটলবাবু কীভাবে তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ শিল্পের রূপ দিয়েছিলেন, তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করো।

উত্তর দেখো

উত্তর: সত্যজিৎ রায়ের ‘পটলবাবু, ফিল্মস্টার’ গল্পে পটলবাবু যখন জানতে পারেন যে তাঁর সংলাপ কেবল একটি শব্দ—’ওহ্!’, তখন তিনি প্রথমে ভীষণ হতাশ হন। কিন্তু গুরুর উপদেশ মনে পড়ার পর তিনি এই একটি শব্দের মধ্যেই অভিনয়ের চূড়ান্ত উৎকর্ষ খুঁজতে শুরু করেন।
পটলবাবু শুটিং স্পটের পাশে একটি নির্জন গলিতে গিয়ে বারবার শব্দটি উচ্চারণ করতে থাকেন। তিনি আবিষ্কার করেন যে, মানুষের বিভিন্ন আবেগে ‘ওহ্!’ শব্দটির সুর, মাত্রা ও ব্যঞ্জনা আলাদা হয়। যেমন—হতাশার ‘ওহ্’, আক্ষেপের ‘ওহ্’, বিরক্তির ‘ওহ্’ বা হঠাৎ আঘাত পাওয়ার ‘ওহ্’। তিনি গলা উঁচুতে, নিচুতে এবং বিভিন্ন ভঙ্গিতে উচ্চারণ করে একটিমাত্র শব্দের অসংখ্য বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তোলেন। এরপর দৃশ্যটিকে আরও বাস্তবসম্মত করার জন্য তিনি পরিচালকের কাছ থেকে একটি খবরের কাগজ চেয়ে নেন, যাতে তাঁকে সত্যি সত্যিই একজন অন্যমনস্ক পথচারী মনে হয়। চরম একাগ্রতা ও নিখুঁত অনুশীলনের মাধ্যমেই তিনি ওই তুচ্ছ একটি শব্দকে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পে পরিণত করেছিলেন।

2. পটলবাবুর অভিনয়ের গুরু গগন পাকড়াশী তাঁকে কী উপদেশ দিয়েছিলেন? সেই উপদেশ পটলবাবুর জীবনে এবং এই সিনেমায় অভিনয়ের ক্ষেত্রে কীরূপ প্রভাব ফেলেছিল?

উত্তর দেখো

উত্তর: গুরুর উপদেশ: পটলবাবুর অভিনয়ের গুরু গগন পাকড়াশী তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন— “শিল্পীর কাছে কোনো চরিত্রই ছোটো নয়। অভিনয় হলো একটি সমবায় শিল্প। একজন প্রকৃত অভিনেতার কাজ হলো তাঁর চরিত্রের সবটুকু নির্যাস বের করে নিজের সেরাটা দর্শকের সামনে তুলে ধরা। কোনো পার্টকেই অবহেলা করা উচিত নয়।”
উপদেশের প্রভাব: সিনেমায় নিজের চরিত্রটি অত্যন্ত নগণ্য এবং সংলাপটি কেবল একটিমাত্র শব্দ (‘ওহ্!’) শুনে পটলবাবু যখন চরম হতাশায় ও ক্ষোভে শুটিং ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন, ঠিক তখনই তাঁর গুরুর এই অমূল্য উপদেশটি মনে পড়ে যায়। এই একটি উপদেশ পটলবাবুর মানসিকতা সম্পূর্ণ বদলে দেয়। তাঁর সমস্ত হতাশা দূর হয়ে যায় এবং তিনি বুঝতে পারেন একজন প্রকৃত শিল্পীর কাজ হলো যেকোনো ছোটো চরিত্রকেও নিজের অভিনয় গুণে বড়ো করে তোলা। গুরুর কথায় অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি সেই ছোটো চরিত্রটির জন্য চরম নিষ্ঠার সঙ্গে অনুশীলন করেন এবং ক্যামেরার সামনে জীবনের অন্যতম সেরা অভিনয়টি করে দেখান।

3. শুটিংয়ের শেষে দুর্দান্ত অভিনয় করার পরও পটলবাবু কেন পারিশ্রমিকের টাকা না নিয়েই চলে গিয়েছিলেন? এর মধ্য দিয়ে তাঁর চরিত্রের কোন্ দিকটি ফুটে উঠেছে?

উত্তর দেখো

উত্তর: টাকা না নেওয়ার কারণ: শুটিংয়ের সময় নায়ক চঞ্চল কুমারের সঙ্গে ধাক্কা লাগার দৃশ্যটিতে পটলবাবু এত নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত অভিনয় করেছিলেন যে, পরিচালক থেকে শুরু করে উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয়ে যান। এই নিখুঁত অভিনয়ের পর পটলবাবু এক অপূর্ব মানসিক শান্তি ও আত্মতৃপ্তি অনুভব করেন। দীর্ঘকাল পর তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর ভেতরের শিল্পীসত্তা আজও মরে যায়নি। তাঁর অভাবের সংসারে কুড়ি টাকার পারিশ্রমিক খুব প্রয়োজন হলেও, শিল্পের এই পরম আনন্দ এবং নিজের অভিনয়-ক্ষমতা প্রমাণের তৃপ্তির কাছে ওই সামান্য অর্থের কোনো মূল্য তাঁর কাছে ছিল না। শিল্পের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতে পারে ভেবেই তিনি টাকা না নিয়ে নিঃশব্দে চলে যান।
চরিত্রের দিক: এর মধ্য দিয়ে পটলবাবু চরিত্রের এক মহান ও নিবেদিতপ্রাণ ‘প্রকৃত শিল্পী’-র রূপ ফুটে উঠেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সত্যিকারের শিল্পীরা টাকার লোভে নয়, বরং শিল্পের প্রতি ভালোবাসা ও আত্মতৃপ্তির জন্যই কাজ করেন।

4. ‘পটলবাবু, ফিল্মস্টার’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

উত্তর দেখো

উত্তর: সাহিত্যের নামকরণ সাধারণত রচনার মূল চরিত্র বা বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে। আলোচ্য গল্পটির আদ্যোপান্ত আবর্তিত হয়েছে পটলবাবু নামের এক ছাপোষা, মধ্যবয়স্ক এবং অভিনয়-পাগল মানুষকে কেন্দ্র করে।
গল্পে দেখা যায়, পটলবাবু কোনো গ্ল্যামারাস ‘ফিল্মস্টার’ বা নায়ক নন। তিনি ফিল্মে অত্যন্ত নগণ্য একটি চরিত্রে (একজন পথচারী) অভিনয় করার সুযোগ পান, যার সংলাপ ছিল মাত্র একটি শব্দ—’ওহ্!’। কিন্তু এই সামান্য চরিত্রটিকেও তিনি তাঁর গুরু গগন পাকড়াশীর উপদেশ মেনে চরম নিষ্ঠা, একাগ্রতা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে একটি অনবদ্য শিল্পে পরিণত করেন। তাঁর অভিনয় এতই নিখুঁত হয়েছিল যে তা সত্যিই সিনেমার আসল ‘স্টার’ বা নায়কদেরও হার মানিয়ে দেয়। অভিনয় শেষে পারিশ্রমিকের তোয়াক্কা না করে তাঁর সেই আত্মতৃপ্তি নিয়ে চলে যাওয়া প্রমাণ করে যে, তিনি হয়তো বাণিজ্যিক ফিল্মস্টার নন, কিন্তু অন্তরের দিক থেকে তিনি একজন সত্যিকারের তারকাশিল্পী। তাই গল্পের এই ব্যঞ্জনাধর্মী নামকরণটি সম্পূর্ণ সার্থক ও যথাযথ হয়েছে।

5. গল্প অবলম্বনে পটলবাবুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।

উত্তর দেখো

উত্তর: সত্যজিৎ রায়ের ‘পটলবাবু, ফিল্মস্টার’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র পটলবাবুর মধ্যে বেশ কয়েকটি অসাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়:
১. অভিনয়ের প্রতি গভীর অনুরাগ: পটলবাবুর জীবনের অন্যতম প্রধান প্যাশন ছিল অভিনয়। চাকরি ও সংসারের চাপে তা ঢাকা পড়লেও, ৫২ বছর বয়সে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে তাঁর সেই পুরোনো উদ্দীপনা আবার জেগে ওঠে।
২. আদর্শ শিষ্য: তিনি ছিলেন একজন আদর্শ ছাত্র। চরম হতাশার মুহূর্তেও তিনি তাঁর গুরু গগন পাকড়াশীর উপদেশ স্মরণ করেন এবং তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন।
৩. নিখুঁত শিল্পী (Perfectionist): মাত্র একটি শব্দ ‘ওহ্!’-কে তিনি যেভাবে বিভিন্ন অনুভূতিতে চর্চা করেছেন এবং দৃশ্যটিকে বাস্তব করার জন্য খবরের কাগজ ব্যবহারের বুদ্ধি বের করেছেন, তা তাঁর কাজের প্রতি চরম নিষ্ঠারই প্রমাণ।
৪. অর্থের প্রতি নির্মোহ: তিনি একজন খাঁটি শিল্পী ছিলেন। অভাবের সংসার হওয়া সত্ত্বেও, নিখুঁত অভিনয় করার পর যে আত্মতৃপ্তি তিনি পেয়েছিলেন, তার কাছে তাঁর পারিশ্রমিকের টাকা নিতান্তই তুচ্ছ মনে হয়েছিল। এই নির্লোভ মানসিকতাই তাঁকে একজন মহান শিল্পীতে পরিণত করেছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার