মকটেস্ট বেছে নাও

অফলাইন মকটেস্ট

খুব শীঘ্রই আপলোড হবে!

সপ্তম শ্রেণি: ইতিহাস, অধ্যায় -6: নগর বণিক ও বাণিজ্য, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর

অধ্যায় ৬: নগর, বণিক ও বাণিজ্য
(দীর্ঘ উত্তরধর্মী বা রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: ৫)

📝 ৫ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ ৭টি প্রশ্নোত্তর:

১. সুলতানি ও মোগল যুগে ভারতে নতুন নতুন শহর বা নগর কীভাবে গড়ে উঠেছিল?

উত্তর: মধ্যযুগের ভারতে বিভিন্ন কারণে বেশ কিছু নতুন শহর বা নগরের বিকাশ ঘটেছিল। শহরগুলি গড়ে ওঠার প্রধান কারণ ও ধরনগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:

  • রাজধানী বা প্রশাসনিক কেন্দ্র: রাজারা যেখানে রাজধানী স্থাপন করতেন বা দুর্গ নির্মাণ করতেন, তাকে ঘিরেই মূলত বড়ো শহর গড়ে উঠত। রাজদরবারের কর্মচারী, সৈন্য এবং তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জোগাড় করার জন্য কারিগর ও বণিকরা সেখানে এসে ভিড় করত। যেমন— দিল্লি, আগ্রা, ফতেপুর সিক্রি, লাহোর ইত্যাদি।
  • বাণিজ্যিক শহর: সমুদ্র বা বড়ো নদীর ধারে যেখানে বন্দর গড়ে উঠত এবং প্রচুর ব্যবসা-বাণিজ্য হতো, সেই স্থানগুলি ধীরে ধীরে বড়ো শহরে পরিণত হয়। দেশ-বিদেশের বণিকদের আনাগোনায় এই শহরগুলি জমজমাট থাকত। যেমন— গুজরাটের সুরাট, বাংলার হুগলি ও চট্টগ্রাম, এবং দক্ষিণ ভারতের কালিকট।
  • তীর্থস্থান বা ধর্মীয় শহর: বিখ্যাত মন্দির বা সুফি সাধকদের দরগাকে কেন্দ্র করে অনেক শহর গড়ে উঠেছিল। তীর্থযাত্রীদের থাকা-খাওয়া এবং পুজোর সামগ্রী বিক্রির জন্য এই শহরগুলির অর্থনীতি খুব মজবুত ছিল। যেমন— মথুরা, বারাণসী (কাশী), আজমির, পুরী ইত্যাদি।

২. মোগল সম্রাট শাহজাহানের তৈরি শাহজাহানাবাদ শহরের নাগরিক জীবন কেমন ছিল?

উত্তর: ১৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট শাহজাহান যমুনা নদীর তীরে তাঁর নিজের নামে ‘শাহজাহানাবাদ’ নামক এক বিশাল ও পরিকল্পিত শহর নির্মাণ করেন।

  • পরিকল্পিত নগরী: এই শহরের এক প্রান্তে ছিল বিশাল লালকেল্লা, যেখানে সম্রাট এবং রাজপরিবারের সদস্যরা থাকতেন। সাধারণ মানুষের প্রার্থনার জন্য তৈরি করা হয়েছিল ভারতের বৃহত্তম ‘জামা মসজিদ’। শহরটি উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ছিল এবং ঢোকার জন্য মোট ১৪টি বিশাল দরজা বা গেট ছিল।
  • মিশ্র নাগরিক জীবন: এই শহরে ধনী রাজকর্মচারী বা আমির-ওমরাহদের জন্য সুন্দর বাগান ঘেরা বড়ো বড়ো রাজপ্রাসাদ ছিল। অন্যদিকে, সাধারণ কারিগর, ব্যবসায়ী ও গরিব মানুষদের থাকার জন্য ছোটো ছোটো কাঁচা বাড়ি বা ঘিঞ্জি এলাকাও ছিল।
  • চাঁদনি চক বাজার: শাহজাহানাবাদের সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ ছিল ‘চাঁদনি চক’। সম্রাট-কন্যা জাহানারা এর নকশা করেছিলেন। দেশ-বিদেশের মহামূল্যবান জিনিসপত্র এই বাজারে পাওয়া যেত এবং রাতে খালের জলে চাঁদের আলো পড়ে বাজারটি এক অপরূপ সৌন্দর্য পেত।
  • সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন: এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ, কবি, শিল্পী, কারিগর এবং দেশ-বিদেশের বণিকরা একসাথে বসবাস করত, যা এই শহরকে সেযুগের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত করেছিল।

৩. মধ্যযুগের ভারতে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য এবং বণিকদের (বিশেষ করে বঞ্জারাদের) ভূমিকা আলোচনা করো।

উত্তর: মধ্যযুগে ভারতের ভেতরের বাণিজ্য বা অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বেশ উন্নত ছিল। এই বাণিজ্য মূলত গ্রাম এবং শহরের মধ্যে হতো।

  • বাণিজ্যের ধরন: কৃষকরা তাদের বাড়তি ফসল গ্রামের হাট বা গঞ্জে বিক্রি করত। বড়ো বণিকরা সেই হাট থেকে জিনিসপত্র কিনে বড়ো বড়ো শহরের বাজারে চড়া দামে বিক্রি করত।
  • বঞ্জারাদের পরিচয়: অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত ‘বঞ্জারা’ সম্প্রদায়ের বণিকরা। এরা কোনো এক জায়গায় স্থায়ীভাবে থাকত না। পরিবার, গবাদি পশু এবং মালপত্র নিয়ে এরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে ঘুরে ব্যবসা করত।
  • বঞ্জারাদের কাজ: বঞ্জারারা হাজার হাজার বলদ বা গোরুর পিঠে খাদ্যশস্য, নুন এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস চাপিয়ে এক শহর থেকে অন্য শহরে নিয়ে যেত।
  • সেনাবাহিনীকে সাহায্য: মোগল বা সুলতানি সেনাবাহিনী যখন কোনো দূর দেশে যুদ্ধ করতে যেত, তখন এই বঞ্জারারাই তাদের বিশাল গোরুর গাড়ির বহর (যাকে ‘টান্ডা’ বলা হতো) নিয়ে সেনাদের জন্য বিপুল পরিমাণ খাবার ও রসদ সরবরাহ করত।

৪. ‘সরাফ’ এবং ‘হুন্ডি’ ব্যবস্থা মধ্যযুগের অর্থনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

উত্তর: মধ্যযুগের ভারতের অর্থনীতি এবং দূরপাল্লার বাণিজ্যকে সচল ও নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে ‘সরাফ’ এবং ‘হুন্ডি’ ব্যবস্থার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

  • সরাফদের কাজ: সরাফরা আজকের দিনের ব্যাংকের মতো কাজ করত। বিভিন্ন রাজ্যে আলাদা আলাদা মুদ্রা চালু ছিল। এক রাজ্যের বণিক অন্য রাজ্যে গেলে সরাফরা নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে সেই মুদ্রার মান পরীক্ষা করে স্থানীয় মুদ্রা পরিবর্তন করে দিত। এছাড়া তারা ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে ঋণও দিত।
  • হুন্ডি কী: ‘হুন্ডি’ ছিল সরাফদের দ্বারা চালু করা এক বিশেষ ধরনের কাগজের দলিল বা বিনিময়পত্র।
  • হুন্ডির গুরুত্ব ও নিরাপত্তা: দূরপাল্লার বাণিজ্যে বণিকদের পক্ষে থলি ভর্তি নগদ সোনা বা রুপোর মুদ্রা নিয়ে যাতায়াত করা খুব বিপজ্জনক ছিল, কারণ পথে দস্যুদের ভয় থাকত। এই সমস্যা দূর করতে বণিকরা তাদের শহরের কোনো সরাফের কাছে নগদ টাকা জমা দিয়ে একটি ‘হুন্ডি’ বা কাগজের রসিদ কিনে নিত। অন্য শহরে গিয়ে সেই হুন্ডি দেখালেই তারা স্থানীয় সরাফের কাছ থেকে আবার নগদ টাকা পেয়ে যেত। এর ফলে দূরপাল্লার বাণিজ্য অত্যন্ত নিরাপদ ও দ্রুত হয়েছিল।

৫. সুলতানি ও মোগল যুগে ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যের চিত্র তুলে ধরো।

উত্তর: মধ্যযুগে সমুদ্রপথে এবং স্থলপথে ভারতের সাথে বিদেশের প্রচুর ব্যবসা-বাণিজ্য হতো। ভারতের জিনিসপত্রের বিশ্বজোড়া খ্যাতি ছিল।

  • রফতানি দ্রব্য: ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি রফতানি হতো সুতির কাপড়, মসলিন এবং রেশম। এছাড়া গোলমরিচ, লবঙ্গ, দারুচিনি, এলাচের মতো মূল্যবান মশলা, নীল (রং) এবং চিনি প্রচুর পরিমাণে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হতো।
  • আমদানি দ্রব্য: বিদেশ থেকে ভারতে মূলত যুদ্ধ এবং যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত উন্নত মানের ঘোড়া (আরব ও পারস্য থেকে) আমদানি করা হতো। এছাড়া সোনা, রুপো, মূল্যবান রত্ন এবং কাঁচের জিনিসপত্র আমদানি করা হতো।
  • প্রধান বন্দর: বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল সমুদ্রবন্দরগুলি। পশ্চিম উপকূলে গুজরাটের সুরাট, ব্রোচ এবং কেরালার কালিকট বন্দর অত্যন্ত বিখ্যাত ছিল। পূর্ব উপকূলে বাংলার হুগলি, চট্টগ্রাম এবং তাম্রলিপ্ত বন্দর দিয়ে প্রচুর ব্যবসা হতো।
  • বণিকদের আধিপত্য: শুরুতে বৈদেশিক বাণিজ্যে আরব বণিকদের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। কিন্তু পঞ্চদশ শতকের শেষদিক থেকে পর্তুগিজ, ডাচ এবং ইংরেজদের মতো ইউরোপীয় বণিকরা এই বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়।

৬. ইউরোপীয় বণিকরা কেন ভারতে এসেছিল এবং বাণিজ্যে তাদের ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর: প্রাচীনকাল থেকেই স্থলপথে ভারতের সাথে ইউরোপের বাণিজ্য চলত। কিন্তু ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কিরা কনস্টান্টিনোপল শহর দখল করে নিলে, ইউরোপীয় বণিকদের স্থলপথে ভারতে আসার রাস্তা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

  • আসার কারণ: ইউরোপে ভারতের সুতির কাপড় এবং মাংস সংরক্ষণের জন্য গোলমরিচ ও অন্যান্য মশলার ব্যাপক চাহিদা ছিল। স্থলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই লাভজনক ব্যবসার লোভে ইউরোপীয় নাবিকরা সরাসরি ভারতে আসার জন্য নতুন সমুদ্রপথ আবিষ্কারে মরিয়া হয়ে ওঠে।
  • পর্তুগিজদের আগমন: ১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা প্রথম ভারতের কালিকট বন্দরে পৌঁছান। এরপর একে একে ডাচ (ওলন্দাজ), ইংরেজ এবং ফরাসি বণিকরা সমুদ্রপথে ভারতে ব্যবসা করতে আসে।
  • বাণিজ্য বিস্তারে ভূমিকা: এই ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি ভারতের বিভিন্ন উপকূলে (যেমন- সুরাট, হুগলি, চন্দননগর, কলকাতা) তাদের বাণিজ্যকুঠি বা ফ্যাক্টরি স্থাপন করে। তারা ভারতের কারিগরদের অগ্রিম টাকা (দাদন) দিয়ে প্রচুর কাপড় ও মশলা কিনে জাহাজে করে ইউরোপে নিয়ে যেত। এর ফলে ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভারতীয় কারিগররা লাভবান হয়। তবে পরবর্তীকালে এই ইউরোপীয় বণিকরাই বাণিজ্যের পাশাপাশি ভারতের শাসনক্ষমতা দখলের চক্রান্ত শুরু করে।

৭. মধ্যযুগের বিখ্যাত বন্দর-শহর সুরাটের বাণিজ্যিক গুরুত্ব আলোচনা করো।

উত্তর: মোগল যুগে ভারতের পশ্চিম উপকূলে (গুজরাটে) অবস্থিত ‘সুরাট’ ছিল দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে ব্যস্ত সমুদ্রবন্দর। এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম:

  • বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার: আরব সাগরের তীরে অবস্থিত হওয়ায় সুরাটকে পশ্চিম এশিয়ার বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার বলা হতো। আরব, পারস্য, মিশর এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে শত শত বাণিজ্যতরী সুরাট বন্দরে এসে ভিড় করত।
  • বস্ত্রশিল্পের কেন্দ্র: সুরাটের সুতির কাপড়, বিশেষ করে সোনালি সুতোর জরির কাজের (জারি) কাপড়ের বিশ্বজোড়া খ্যাতি ছিল। এখানকার বাজারগুলোতে দেশ-বিদেশের পাইকারি ও খুচরো ব্যবসায়ীদের ভিড় লেগেই থাকত।
  • তীর্থযাত্রীদের কেন্দ্র: বাণিজ্যের পাশাপাশি সুরাটের ধর্মীয় গুরুত্বও ছিল। মক্কাগামী ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের জাহাজ মূলত এই সুরাট বন্দর থেকেই ছাড়ত, তাই একে ‘মক্কার প্রবেশদ্বার’ও বলা হতো।
  • সকলের শহর: সুরাট ছিল একটি সত্যিকারের আন্তর্জাতিক শহর। এখানে হিন্দু, মুসলিম, পর্তুগিজ, ডাচ ও ইংরেজ বণিকদের আলাদা আলাদা বাণিজ্যকুঠি, গুদাম এবং বিশাল বিশাল সরাইখানা ছিল।
  • পতনের কারণ: সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে মারাঠাদের আক্রমণ এবং পরে ইংরেজদের বাণিজ্যকেন্দ্র বোম্বাইতে (মুম্বাই) স্থানান্তরিত হওয়ায় সুরাটের সেই পুরোনো জাঁকজমক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার