সপ্তম শ্রেণি: ইতিহাস, অধ্যায় – 8 : মুঘল সাম্রাজ্যের সংকট ও আঞ্চলিক শক্তির উত্থান, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর
অধ্যায় ৮: অষ্টাদশ শতকের ভারত
(দীর্ঘ উত্তরধর্মী বা রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: ৫)
📝 ৫ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ ৭টি প্রশ্নোত্তর:
১. মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের প্রধান কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: ১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য দ্রুত পতনের দিকে এগিয়ে যায়। এর প্রধান কারণগুলি হলো:
- দুর্বল উত্তরাধিকারী: ঔরঙ্গজেবের পরবর্তী মুঘল সম্রাটরা ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল, বিলাসপ্রিয় এবং অযোগ্য। তাঁরা বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করার ক্ষমতা রাখতেন না।
- অর্থনৈতিক সংকট: ঔরঙ্গজেবের দীর্ঘস্থায়ী দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধ এবং সম্রাটদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রার ফলে রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়েছিল।
- জায়গিরদারি ও মনসবদারি সংকট: ভালো চাষযোগ্য জমির অভাব এবং মনসবদারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, যা মোগল সেনাবাহিনীর শক্তি কমিয়ে দেয়।
- আমিরদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব: রাজদরবারের প্রভাবশালী ইরানি, তুরানি এবং হিন্দুস্তানি আমিরদের নিজেদের মধ্যে রেষারেষি ও চক্রান্ত সাম্রাজ্যকে ভেতর থেকে নড়বড়ে করে দিয়েছিল।
- বিদেশি আক্রমণ: নাদির শাহ এবং আহমদ শাহ আবদালির আক্রমণে মুঘলদের সম্মান ও সামরিক শক্তি দুই-ই ধুলিসাৎ হয়ে যায়।
২. জায়গিরদারি ও মনসবদারি সংকট মুঘল শাসনের ওপর কী প্রভাব ফেলেছিল?
উত্তর: মুঘল শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল মনসবদারি ও জায়গিরদারি ব্যবস্থা। অষ্টাদশ শতকে এই ব্যবস্থায় যে সংকট দেখা দেয় তা মুঘল পতনের অন্যতম কারণ।
- জমির অভাব: মনসবদারের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও সেই তুলনায় ভালো ও উর্বর জায়গির বা জমির সংখ্যা বাড়েনি। ফলে অনেক মনসবদার জায়গির পাচ্ছিলেন না।
- কৃষকদের ওপর শোষণ: জায়গিরদাররা যেহেতু জানতেন যে তাঁদের যেকোনো সময় বদলি করা হতে পারে, তাই তাঁরা কম সময়ে কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের জন্য অকথ্য অত্যাচার শুরু করেন।
- সামরিক দুর্বলতা: সঠিক বেতন বা রাজস্ব না পাওয়ায় মনসবদাররা নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য ও ঘোড়া রাখা বন্ধ করে দেন। এর ফলে মোগল সেনাবাহিনীর মূল শক্তি নষ্ট হয়ে যায়।
- বিদ্রোহ: জায়গিরদারদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে অনেক জায়গায় কৃষকরা সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে (যেমন— জাঠ ও সৎনামী বিদ্রোহ), যা মুঘল প্রশাসনকে পর্যুদস্ত করে দেয়।
৩. আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বাংলার নবাবী শাসনের উত্থান ও মুর্শিদকুলি খানের অবদান আলোচনা করো।
উত্তর: মুঘল কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হওয়ার সুযোগে বাংলার দিওয়ান মুর্শিদকুলি খান বাংলায় এক প্রায় স্বাধীন নবাবী শাসন গড়ে তোলেন।
- রাজস্ব সংস্কার: মুর্শিদকুলি খান বাংলার ভূমি ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার আনেন। তিনি উর্বর জমিগুলি সরাসরি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং ‘মালজামিনী’ ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করেন।
- রাজধানী স্থানান্তর: প্রশাসনিক সুবিধার জন্য তিনি বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে ভাগীরথী নদীর তীরে মাকসুদাবাদে নিয়ে আসেন, যা পরে তাঁর নামানুসারে ‘মুর্শিদাবাদ’ নামে পরিচিত হয়।
- অনুগত জমিদার শ্রেণি: তিনি বিদ্রোহী জমিদারদের দমন করে নতুন এক অনুগত হিন্দু জমিদার শ্রেণি গড়ে তোলেন, যাঁরা নবাবের শাসনকে মজবুত করতে সাহায্য করেছিলেন।
- অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: তাঁর সুদক্ষ শাসনে বাংলায় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে এবং বাংলার অর্থনীতি ভারতবর্ষের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এর ফলে মুঘল সম্রাটকে বছরে নির্দিষ্ট রাজস্ব পাঠিয়েও তিনি স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করতে পারতেন।
৪. মারাঠা শক্তির প্রসারে পেশোয়াদের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: শিবাজির পরবর্তীকালে মারাঠা রাজারা দুর্বল হয়ে পড়লে শাসনের প্রকৃত ক্ষমতা তাঁদের প্রধানমন্ত্রীদের হাতে চলে যায়, যাঁদের ‘পেশোয়া’ বলা হতো। মারাঠা সাম্রাজ্যকে ভারতের শ্রেষ্ঠ শক্তিতে পরিণত করার মূলে ছিল পেশোয়াদের অবদান:
- প্রথম বাজিরাও: তিনি ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী ও বীর যোদ্ধা। তিনি মুঘলদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে উত্তর ভারতে মারাঠা আধিপত্য বিস্তার করেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল ‘হিন্দু-পদ-পাদশাহি’ বা ভারতে হিন্দু সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা।
- রাজস্ব আদায়: পেশোয়াদের নেতৃত্বে মারাঠারা প্রতিবেশী রাজ্যগুলি থেকে ‘চৌথ’ ও ‘সরদেশমুখী’ নামক কর আদায় করে নিজেদের অর্থনৈতিক শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে নেয়।
- মারাঠা মৈত্রীবন্ধন: পেশোয়ারা সিন্ধিয়া, হোলকার, ভোঁসলে ও গায়কোয়াড়দের মতো মারাঠা সর্দারদের একত্রিত করে একটি শক্তিশালী সামরিক জোট গড়ে তোলেন।
- ফলাফল: একটা সময় এমন হয়েছিল যে দিল্লির মুঘল সম্রাট পর্যন্ত মারাঠাদের হাতের পুতুলে পরিণত হন। তবে ১৭৬১ খ্রিষ্টাব্দে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠাদের পরাজয় এই অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেয়।
৫. রঞ্জিত সিংহের নেতৃত্বে পাঞ্জাবে শিখ শক্তির উত্থান আলোচনা করো।
উত্তর: আঠারো শতকের শেষে শিখদের ছোটো ছোটো সামরিক দল বা মিস্ল্-গুলি যখন নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত ছিল, তখন শুকারচাকিয়া মিস্ল্-এর নেতা রঞ্জিত সিংহ শিখদের একতাবদ্ধ করেন।
- শিখদের ঐক্যবদ্ধ করা: তিনি একে একে ১২টি শিখ মিস্ল্-কে জয় করে বা বন্ধুত্বের মাধ্যমে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসেন এবং পাঞ্জাবে একটি স্বাধীন শিখ রাজ্য গড়ে তোলেন।
- সামরিক সংস্কার: তিনি ইউরোপীয় কায়দায় শিখ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেন। তাঁর গোলন্দাজ বাহিনী বা কামান বাহিনী ভারতবর্ষের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছিল।
- সাম্রাজ্য বিস্তার: তিনি লাহোর ও অমৃতসর দখল করেন এবং কাবুল ও কান্দাহারের আফগানদের পরাজিত করে মুলতান, কাশ্মীর ও পেশোয়ার পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তার করেন।
- উদার শাসন: রঞ্জিত সিংহ ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করতেন না। তাঁর প্রশাসনে ও সেনাবাহিনীতে প্রচুর হিন্দু ও মুসলিম উচ্চ পদে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ইংরেজরা পাঞ্জাব দখল করার সাহস পায়নি।
৬. পলাশির যুদ্ধের (১৭৫৭ খ্রিঃ) কারণ ও ফলাফল আলোচনা করো।
উত্তর: ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুন বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লা এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে পলাশির যুদ্ধ হয়।
যুদ্ধের কারণ:
- ইংরেজরা দস্তকের অপব্যবহার করে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করছিল, যার ফলে নবাবের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছিল।
- নবাবের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তারা কলকাতায় দুর্গ নির্মাণ শুরু করে এবং নবাবের পাঠানো রাজকর্মচারীদের অপমান করে।
- মীর জাফর ও জগৎ শেঠদের সাথে মিলে ইংরেজরা নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করার গোপন চক্রান্ত করেছিল।
যুদ্ধের ফলাফল:
- মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় সিরাজ-উদ-দৌল্লা পরাজিত ও নিহত হন।
- বাংলায় ইংরেজদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তারা মীর জাফরকে এক অনুগত নবাব হিসেবে বসিয়ে প্রচুর ধনসম্পদ লুঠ করে।
- এই যুদ্ধের ফলেই ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ প্রশস্ত হয় এবং বাংলার স্বাধীনতা চিরতরে সূর্য অস্তমিত হয়।
৭. হায়দরাবাদ ও অযোধ্যায় কীভাবে স্বাধীন আঞ্চলিক শক্তির উত্থান হয়েছিল?
উত্তর: অষ্টাদশ শতকে মুঘল সাম্রাজ্যের ভেতর থেকেই হায়দরাবাদ ও অযোধ্যার মতো দুটি শক্তিশালী রাজ্যের জন্ম হয়।
- হায়দরাবাদ: মুঘল দরবারের প্রভাবশালী আমির নিজাম-উল-মুলক (আসাফ জাহ) ১৭২৪ খ্রিষ্টাব্দে দাক্ষিণাত্যে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মুঘলদের নামমাত্র আনুগত্য স্বীকার করে আসফ জাহ উপাধি নিয়ে স্বাধীনভাবে হায়দরাবাদ শাসন করতে শুরু করেন। তিনি রাজ্যে সুশাসন ও আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।
- অযোধ্যা: ১৭১২ খ্রিষ্টাব্দে পারস্য থেকে আসা বুরহান-উল-মুলক সাদাত খান অযোধ্যার সুবাদার নিযুক্ত হন। তিনি সেখানকার বিদ্রোহী জমিদারদের কঠোর হাতে দমন করেন এবং একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। তিনি রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার করে প্রজাদের ওপর নবাবের নিয়ন্ত্রণ বাড়ান। তাঁর পরবর্তী উত্তরসূরিরাও মুঘল সাম্রাজ্যের একনিষ্ঠ প্রতিনিধি সেজে কার্যত স্বাধীনভাবে অযোধ্যা শাসন করতেন।
এই দুটি রাজ্যই পরবর্তীকালে আধুনিক ভারতের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।