সপ্তম শ্রেণি: ইতিহাস, অধ্যায় – 8 : মুঘল সাম্রাজ্যের সংকট ও আঞ্চলিক শক্তির উত্থান, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
অধ্যায় ৮: অষ্টাদশ শতকের ভারত
(সংক্ষিপ্ত ও বিশ্লেষণমূলক প্রশ্নোত্তর – মান: ২/৩)
✍️ ২/৩ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ ১৬টি প্রশ্নোত্তর:
১. অষ্টাদশ শতকে মুঘল সাম্রাজ্যের সংকটের প্রধান কারণগুলি কী ছিল?
উত্তর: মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের প্রধান কারণগুলি ছিল— সম্রাটের দুর্বল উত্তরসূরিদের শাসন, রাজদরবারে আমিরদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, জায়গিরদারি ও মনসবদারি ব্যবস্থার চরম সংকট এবং নাদির শাহ ও আহমদ শাহ আবদালির মতো বিদেশি শক্তির আক্রমণ। এছাড়া ঔরঙ্গজেবের দীর্ঘস্থায়ী দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধ মুঘল রাজকোষকে শূন্য করে দিয়েছিল।
২. ‘জায়গিরদারি সংকট’ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: মুঘল আমলে মনসবদারদের বেতনের বদলে নির্দিষ্ট এলাকার রাজস্ব বা জমি (জায়গির) দেওয়া হতো। অষ্টাদশ শতকে আবাদযোগ্য ভালো জমির অভাব দেখা দেয় এবং মনসবদারের সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে অনেক মনসবদার জায়গির পাচ্ছিলেন না, আবার অনেকে কম রাজস্বের জমি পাচ্ছিলেন। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকেই ‘জায়গিরদারি সংকট’ বলা হয়।
৩. ১৭১৭ খ্রিষ্টাব্দের ফারুকশিয়রের ফরমানের গুরুত্ব কী ছিল?
উত্তর: মুঘল সম্রাট ফারুকশিয়রের ফরমানের ফলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় বিশেষ বাণিজ্যিক অধিকার পায়। কোম্পানি বছরে মাত্র ৩০০০ টাকার বিনিময়ে বাংলায় বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অধিকার পায় এবং নিজেদের দস্তক বা বাণিজ্যিক ছাড়পত্র ব্যবহারের অনুমতি পায়। এই অধিকার ভবিষ্যতে বাংলার নবাবদের সাথে ইংরেজদের সংঘাতের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৪. মুর্শিদকুলি খানের রাজস্ব সংস্কার বা ‘মালজামিনী’ ব্যবস্থা কী ছিল?
উত্তর: মুর্শিদকুলি খান বাংলায় রাজস্ব আদায়ের জন্য একটি নতুন চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করেন যা ‘মালজামিনী’ নামে পরিচিত। তিনি পুরোনো ও বিদ্রোহী জমিদারদের সরিয়ে হিন্দু ও অনুগত ইজারাদারদের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেন। এতে সরকারের রাজস্ব আয় নিশ্চিত হয় এবং জমিদারদের ওপর নবাবের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়।
৫. নাদির শাহের ভারত আক্রমণের ফলাফল কী হয়েছিল?
উত্তর: ১৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের শাসক নাদির শাহের আক্রমণে মুঘল শক্তি চরমভাবে বিধ্বস্ত হয়। তিনি দিল্লি শহর লুঠ করেন এবং প্রচুর ধনসম্পদসহ শাহজাহানের ‘ময়ূর সিংহাসন’ ও ‘কোহিনূর’ হিরে নিয়ে যান। এর ফলে মুঘলদের সম্মান ও মর্যাদা ধুলিসাৎ হয় এবং কেন্দ্রীয় শাসনের দুর্বলতা সকলের কাছে প্রকাশ পায়।
৬. হায়দরাবাদে আসফ জাহ কীভাবে স্বাধীন রাজ্য গড়ে তোলেন?
উত্তর: মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহের আমলে দরবারের শক্তিশালী আমির নিজাম-উল-মুলক (চিন কলিচ খান) দাক্ষিণাত্যের সুবাদার হয়ে যান। সেখানে তিনি স্থানীয় মুঘল প্রতিনিধিদের সরিয়ে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭২৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে তিনি ‘আসফ জাহ’ উপাধি নিয়ে নামমাত্র মুঘল আনুগত্য স্বীকার করে বাস্তবে স্বাধীনভাবে হায়দরাবাদ শাসন করতে শুরু করেন।
৭. ‘বর্গি’ আক্রমণ বলতে কী বোঝো? বাংলায় এর প্রভাব কী ছিল?
উত্তর: নবাব আলিবর্দী খানের আমলে মারাঠা অশ্বারোহী সৈন্যরা (বর্গি) বারবার বাংলা আক্রমণ ও লুঠতরাজ করত। ১৭৪২ থেকে ১৭৫১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বর্গিরা বাংলার কৃষকদের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালাত এবং গ্রাম পুড়িয়ে দিত। এর ফলে বাংলার অর্থনীতি বিধ্বস্ত হয় এবং শেষে আলিবর্দী খান ওড়িশা ছেড়ে দিয়ে ও বার্ষিক ১২ লক্ষ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বর্গি আক্রমণ বন্ধ করেন।
৮. ‘চৌথ’ ও ‘সরদেশমুখী’ কর বলতে কী বোঝো?
উত্তর: মারাঠারা প্রতিবেশী রাজ্যগুলি থেকে দুটি বিশেষ কর আদায় করত।
১. চৌথ: রাজ্যের মোট আয়ের এক-চতুর্থাংশ বা চারভাগের একভাগ। এর বিনিময়ে মারাঠারা ওই রাজ্যকে অন্য শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করত।
২. সরদেশমুখী: আয়ের অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর। মারাঠা রাজা নিজেকে দক্ষিণ ভারতের প্রধান বা সরদেশমুখ দাবি করে এই কর নিতেন।
৯. শিখ ‘মিস্ল্’ কী? শিখদের শক্তিশালী হওয়ার মূলে কার ভূমিকা ছিল?
উত্তর: মুঘলদের সাথে সংঘাতের সময় শিখরা ১২টি ছোটো ছোটো সামরিক দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল, যাদের ‘মিস্ল্’ বলা হতো। এই মিস্ল্-গুলির মধ্যে ‘শুকারচাকিয়া মিস্ল্’ ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। এই মিস্ল্-এর নেতা রঞ্জিত সিংহ সকল ছোটো ছোটো শিখ দলকে ঐক্যবদ্ধ করে পাঞ্জাবে একটি বিশাল ও শক্তিশালী শিখ সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।
১০. ‘জগৎ শেঠ’ কাদের বলা হতো? বাংলার রাজনীতিতে তাঁদের প্রভাব কী ছিল?
উত্তর: মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত ধনী ও প্রভাবশালী মহাজন পরিবারকে ‘জগৎ শেঠ’ বলা হতো (ফতেহ চাঁদ প্রথম এই উপাধি পান)। তাঁরা নবাবকে বড়ো বড়ো ঋণ দিতেন এবং কর আদায়ের টাকা নিরাপদ স্থানে পাঠাতেন। নবাবের রাজদরবারে তাঁদের বিরাট আধিপত্য ছিল এবং পলাশির ষড়যন্ত্রে সিরাজ-উদ-দৌল্লার বিরুদ্ধে তাঁরা ইংরেজদের গুরুত্বপূর্ণ সাহায্য করেছিলেন।
১১. অযোধ্যায় বুরহান-উল-মুলক সাদাত খানের সংস্কারগুলি লেখো।
উত্তর: সাদাত খান অযোধ্যায় শক্তিশালী প্রশাসন গড়ার জন্য— ১. বিদ্রোহী জমিদারদের দমন করেন, ২. জায়গির ব্যবস্থা সংস্কার করে অনেক সরকারি জমি ইজারাদারদের দেন এবং ৩. হিন্দু ও মুসলিম উভয়েরই যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রশাসনে নিয়োগ করেন। তাঁর সুদক্ষ শাসনে অযোধ্যা মুঘল সাম্রাজ্যের ভেতর একটি প্রায় স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হয়।
১২. পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের (১৭৬১ খ্রিঃ) ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী?
উত্তর: এই যুদ্ধে মারাঠারা আহমদ শাহ আবদালির কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এর ফলে— ১. সারা ভারত জুড়ে মারাঠাদের একচ্ছত্র আধিপত্য স্থাপনের স্বপ্ন চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় এবং ২. ভারতে মুঘল শক্তির পতনের পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণের সুযোগ পায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।
১৩. পলাশির যুদ্ধের (১৭৫৭ খ্রিঃ) প্রধান কারণগুলি কী ছিল?
উত্তর: প্রধান কারণগুলি ছিল— ১. ইংরেজদের দ্বারা বাণিজ্যিক দস্তকের অপব্যবহার, ২. নবাবের নিষেধ সত্ত্বেও কলকাতায় ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ এবং ৩. নবাবের পাঠানো দূত বা রাজকর্মচারীদের অপমান করা। এছাড়া সিরাজ-উদ-দৌল্লাকে সরিয়ে এক অনুগত নবাব বসানোর জন্য মীর জাফর ও জগৎ শেঠদের সাথে ইংরেজদের গোপন চক্রান্ত অন্যতম কারণ ছিল।
১৪. ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ইলাহাবাদ চুক্তির গুরুত্ব কী?
উত্তর: এই চুক্তির মাধ্যমে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ব্রিটিশ কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার ‘দিওয়ানি’ বা রাজস্ব আদায়ের বৈধ অধিকার প্রদান করেন। এর ফলে ইংরেজরা বাংলার প্রকৃত শাসকে পরিণত হয় এবং কোম্পানির বিপুল আর্থিক লাভ নিশ্চিত হয়। এটি বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের শক্ত ভিত্তি স্থাপন করে।
১৫. সাহু বা শাহু কোন্ মারাঠা নেতার নাতি ছিলেন? মারাঠা রাজনীতিতে তাঁর গুরুত্ব কী?
উত্তর: শাহু ছিলেন মারাঠা বীর শিবাজির নাতি। মুঘল বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি মারাঠা সিংহাসন উদ্ধার করেন। তাঁর আমলেই মারাঠা রাজাদের ক্ষমতা কমে যায় এবং ‘পেশোয়া’ বা প্রধানমন্ত্রীদের ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। শাহুর সময় থেকেই মারাঠারা উত্তর ভারতে মুঘল রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে।
১৬. দাক্ষিণাত্য ক্ষত (Deccan Ulcer) বলতে কী বোঝো?
উত্তর: মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব জীবনের শেষ ২৫ বছর দক্ষিণ ভারত জয়ের চেষ্টায় কাটিয়েছিলেন। কিন্তু এই দীর্ঘ যুদ্ধে তিনি মারাঠাদের সম্পূর্ণভাবে দমন করতে তো পারেনইনি, উলটে মুঘল সৈন্যবাহিনীর অগণিত প্রাণহানি ঘটে এবং রাজকোষ শূন্য হয়ে যায়। এই অন্তহীন যুদ্ধ মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে তরান্বিত করে বলে একে ঐতিহাসিকরা ‘দাক্ষিণাত্য ক্ষত’ বলে অভিহিত করেন।