মকটেস্ট বেছে নাও

অফলাইন মকটেস্ট

খুব শীঘ্রই আপলোড হবে!

সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, আত্মকথা – রামকিঙ্কর বেইজ, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

আত্মকথা: বিস্তারিত বড় প্রশ্নোত্তর (মান: 5)

1. রামকিঙ্কর বেইজের শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে বাঁকুড়ার গ্রাম্য পরিবেশ এবং কুমোরদের ভূমিকা কতটা ছিল তা আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
রামকিঙ্কর বেইজ কোনো প্রথাগত আর্ট স্কুলে গিয়ে ছবি আঁকা শেখেননি, তাঁর শিল্পীসত্তার প্রথম বিকাশ ঘটেছিল বাঁকুড়ার এক অখ্যাত গ্রামের অকৃত্রিম প্রাকৃতিক পরিবেশে। ছোটবেলায় ছবি আঁকার জন্য তাঁর কাছে বাজার থেকে কেনা কোনো রং বা তুলি ছিল না। কিন্তু তাঁর প্রবল ইচ্ছাশক্তির কাছে এই অভাব বাধা হতে পারেনি। তিনি গ্রামের প্রকৃতি থেকেই রং সংগ্রহ করতেন। শিম ও অন্যান্য গাছের পাতার রস দিয়ে সবুজ, প্রদীপের ভুসোকালি দিয়ে কালো এবং মোরাম ঘষা লাল মাটি দিয়ে লাল রং তৈরি করে তিনি বাড়ির দেওয়ালে ছবি আঁকতেন।

এছাড়া, তাঁর শিল্পী মনের বিকাশে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল গ্রামের কুমোরেরা। বাড়ির আশেপাশে থাকা কুমোরদের দেবদেবীর প্রতিমা গড়া তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখতেন। কাদা মাটি দিয়ে কীভাবে নিপুণভাবে একটি মূর্তি বা ত্রিমাত্রিক রূপ তৈরি করা যায়, তার প্রথম পাঠ তিনি এই কুমোরদের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। এই মাটি গড়ার দৃশ্যই তাঁর অবচেতন মনে ভাস্কর্য শিল্পের প্রতি গভীর অনুরাগ সৃষ্টি করেছিল, যা পরবর্তীতে তাঁকে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাস্কর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

2. নন্দলাল বসুর কাজের ধরন ও শিক্ষাদানের পদ্ধতি সম্পর্কে রামকিঙ্কর বেইজ তাঁর ‘আত্মকথা’ প্রবন্ধে কী জানিয়েছেন?

উত্তর দেখো
‘আত্মকথা’ প্রবন্ধে লেখক রামকিঙ্কর বেইজ তাঁর পরম শ্রদ্ধেয় গুরু নন্দলাল বসুর কাজের ধরন এবং উদার শিক্ষাদানের পদ্ধতির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। লেখকের মতে, নন্দলাল বসু ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ এবং সহজ-সরল একজন মানুষ। তাঁর ছবির বিষয়বস্তুর মধ্যেও কোনো অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ছিল না। অত্যন্ত চেনা এবং সাধারণ দৃশ্যকেই তিনি তাঁর নিপুণ তুলির আঁচড়ে অসাধারণ রূপ দান করতেন। মূলত জলরঙের মাধ্যমেই তিনি তাঁর বেশিরভাগ কাজ করতেন।

শিক্ষক হিসেবে নন্দলাল বসুর পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত উদার এবং স্বাধীনতাপূর্ণ। তিনি কখনো ছাত্রদের ওপর নিজের মত বা পদ্ধতি চাপিয়ে দিতেন না। লেখক যখন শান্তিনিকেতনে এসে জলরং ছেড়ে তৈলচিত্রে ছবি আঁকতে শুরু করেন, তখন নন্দলাল বসু তাঁকে বিন্দুমাত্র বাধা দেননি বা বকাঝকা করেননি। বরং একজন প্রকৃত গুরুর মতো তিনি লেখককে তাঁর নিজস্ব ধারা এবং পছন্দের মাধ্যমে কাজ করার জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও উৎসাহ প্রদান করেছিলেন। এই স্বাধীনতাই লেখকের শিল্পীসত্তাকে পূর্ণতা দিয়েছিল।

3. শান্তিনিকেতনের কলাভবনে লেখকের শিক্ষার পরিবেশ কেমন ছিল? সেখানে তিনি কীভাবে নিজের শিল্পসত্তার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন?

উত্তর দেখো
‘প্রবাসী’ পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে রামকিঙ্কর বেইজ শান্তিনিকেতনের কলাভবনে এসে ভরতি হন। বাঁকুড়ার এক গণ্ডিবদ্ধ পরিবেশ থেকে এসে শান্তিনিকেতনের মুক্ত ও প্রসারিত আকাশ তাঁর মনে এক অদ্ভুত আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কলাভবনের পরিবেশ ছিল শিল্পের সাধনার জন্য অত্যন্ত অনুকূল এবং স্বাধীনতাপূর্ণ। সেখানে নন্দলাল বসুর মতো একজন মহান শিক্ষকের সাহচর্য তাঁর শিল্পচেতনাকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।

শান্তিনিকেতনে এসেই তিনি বুঝতে পারেন যে প্রকৃত শিল্প চার দেওয়ালের মধ্যে বসে তৈরি হতে পারে না। তাই তিনি ছবি আঁকার সরঞ্জাম নিয়ে সরাসরি মাঠে-ঘাটে, খোলা আকাশের নিচে গিয়ে বসতেন। প্রকৃতির নানা রূপ, রং এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে তিনি ছবি আঁকতে শুরু করেন। এখানেই তিনি জলরঙের বদলে তৈলচিত্রে কাজ করা শুরু করেন এবং গুরুর উৎসাহে নিজের একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব শিল্পরীতি গড়ে তোলেন। এভাবেই শান্তিনিকেতনের অবারিত পরিবেশে তাঁর শিল্পসত্তার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল।

4. অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমিতে লেখকের ছবি আঁকার অভিজ্ঞতার কথা ‘আত্মকথা’ প্রবন্ধ অবলম্বনে লেখো।

উত্তর দেখো
রামকিঙ্কর বেইজের কৈশোরকালটি ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অত্যন্ত উত্তাল সময়। তখন দেশজুড়ে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে প্রবল অসহযোগ আন্দোলন চলছে। বাংলার গ্রামে-গঞ্জেও সেই আন্দোলনের ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছিল। এই সময় লেখক রাজনীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও, দেশের এই রাজনৈতিক আবহাওয়া তাঁর কিশোর মনকে এবং তাঁর শিল্পকর্মকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

তিনি নিজের তুলি এবং রং দিয়ে এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হয়েছিলেন। তিনি নিপুণ হাতে মহাত্মা গান্ধী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং অন্যান্য বিশিষ্ট জাতীয় নেতাদের ছবি আঁকতে শুরু করেন। তাঁর আঁকা এই ছবিগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে বিপুল সাড়া ফেলেছিল এবং সকলেই তাঁর শিল্পের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন তাঁর আঁকার হাত আরও পোক্ত হয়েছিল, তেমনি নিজের সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি দেশপ্রেমের এক অনন্য পরিচয়ও রেখেছিলেন।

5. ‘আত্মকথা’ প্রবন্ধে রামকিঙ্কর বেইজের যে প্রকৃতিপ্রেম ও শিল্পের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার পরিচয় পাওয়া যায়, তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
‘আত্মকথা’ প্রবন্ধটি পড়লে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রামকিঙ্কর বেইজের অকৃত্রিম প্রকৃতিপ্রেম এবং শিল্পের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার পরিচয় পাওয়া যায়। ছোটবেলায় চরম দারিদ্র্য এবং রং-তুলির অভাব তাঁকে ছবি আঁকা থেকে বিরত করতে পারেনি। প্রকৃতির গাছপালা, পাতা, মাটি আর প্রদীপের কালি থেকেই তিনি শিল্পের রং খুঁজে নিয়েছিলেন। এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে শিল্পের প্রতি তাঁর টান কতটা তীব্র ও স্বতঃস্ফূর্ত ছিল।

পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনে এসেও তিনি স্টুডিওর চার দেওয়ালের মধ্যে নিজেকে বন্দি রাখেননি। তাঁর প্রধান ক্যানভাস ছিল খোলা মাঠ, আকাশ আর নদী। তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্রকৃতিই হলো সবচেয়ে বড় শিক্ষক। প্রকৃতির আলো-ছায়া, রং এবং রূপকে সরাসরি উপলব্ধি করে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় আনন্দ। শিল্পের জন্য কোনো কৃত্রিম আড়ম্বর নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি এই গভীর ভালোবাসা এবং একাগ্র সাধনাই তাঁকে একজন কিংবদন্তি শিল্পীতে পরিণত করেছিল।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার