সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, দিন ফুরালে – শঙ্খ ঘোষ, রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর
অধ্যায়: দিন ফুরোলে
(দীর্ঘ / রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 4)
নিচের প্রশ্নগুলির প্রাসঙ্গিক ও বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. ‘দিন ফুরোলে’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: সাহিত্যের নামকরণ সাধারণত রচনার মূল ভাব বা বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। কবি শঙ্খ ঘোষ রচিত আলোচ্য কবিতাটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ‘দিন ফুরোলে’ অর্থাৎ দিন শেষ হয়ে সন্ধে নামার সময়কার প্রকৃতি এবং শিশু-মনের এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের কথা বলা হয়েছে।
দিন ফুরোলে পশ্চিম আকাশে একশো বা লক্ষ রঙের এক ঐশ্বরিক ছটা দেখা যায়, মনে হয় স্বয়ং ঈশ্বর রঙের বাক্স খুলে বসেছেন। দিন ফুরোলে পাখিরা যেমন আঁধার ফেলে নিজেদের বাসায় ফেরে, তেমনি শিশুদেরও খোলা মাঠের স্বাধীনতা ছেড়ে চার দেওয়ালের গণ্ডিতে ফিরতে হয়। এই ঘরে ফেরাকে তাদের কাছে ‘মন খারাপের গর্তে’ ফেরার মতো মনে হয়। দিন ফুরোনোর পর মাঠে থাকা নিয়ে বাবার কড়া শাসন এবং ধুলোমাখা পায়ের জন্য মায়ের তিরস্কার—সবকিছুই এই সূর্যাস্ত বা দিন ফুরোনোর সময়কে কেন্দ্র করেই ঘটে। সমগ্র কবিতাটির মূল উপজীব্য যেহেতু দিন শেষ হওয়ার মুহূর্ত এবং তার প্রভাব, তাই ‘দিন ফুরোলে’ নামকরণটি সম্পূর্ণ সার্থক, ব্যঞ্জনাধর্মী এবং যুক্তিযুক্ত হয়েছে।
2. ‘দিন ফুরোলে’ কবিতায় বাবা-মায়ের শাসন এবং শিশুমনস্তত্ত্বের যে দ্বন্দ্ব বা বৈপরীত্য ফুটে উঠেছে, তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: শঙ্খ ঘোষের ‘দিন ফুরোলে’ কবিতায় শিশুদের স্বাধীন সত্তা এবং বড়োদের বাস্তববাদী শাসনের এক স্পষ্ট বৈপরীত্য বা দ্বন্দ্ব দেখা যায়।
শিশুমনস্তত্ত্ব: শিশুদের মন প্রকৃতির মতোই উন্মুক্ত ও বাঁধনহারা। তারা খোলা মাঠে স্বাধীনভাবে খেলতে ভালোবাসে। সূর্যাস্ত বা দিন ফুরিয়ে গেলেও তারা মাঠ ছাড়তে চায় না। ঘরের চার দেওয়ালের গণ্ডি এবং পড়াশোনার আবদ্ধ পরিবেশ তাদের কাছে ‘মন খারাপের গর্ত’ বা বন্দিদশা বলে মনে হয়।
বড়োদের শাসন: অন্যদিকে, বাবা-মা হলেন নিয়মানুবর্তী ও বাস্তববাদী। তারা চান সন্তান নিয়ম মেনে সন্ধের আগে বাড়ি ফিরুক এবং পড়াশোনায় মন দিক। তাই দিন ফুরোনোর পরেও শিশুদের মাঠে পড়ে থাকতে দেখলে বাবা বিরক্ত হয়ে বলেন, “এইটুকু সব বাচ্চা, দিন ফুরোলেও মাঠ ছাড়ে না”। আবার মা সন্তানের ধুলোমাখা নোংরা পা দেখে রেগে গিয়ে তাকে ‘কুচ্ছি’ বলেন, যদিও তিনি পরম যত্নে তা পরিষ্কার করে দেন। বড়োরা শিশুদের এই খেলার প্রতি নির্ভেজাল আবেগকে বুঝতে চান না। নিয়ম-শৃঙ্খলা এবং স্বাধীনতার এই দ্বন্দ্বই কবিতায় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।
3. কবিতায় দিন ফুরোনোর সময় প্রকৃতির যে অপরূপ চিত্র এবং পাখিদের ঘরে ফেরার দৃশ্য ফুটে উঠেছে, তা বর্ণনা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: কবি শঙ্খ ঘোষের ‘দিন ফুরোলে’ কবিতায় সূর্যাস্ত বা দিন ফুরোনোর মুহূর্তের এক জাদুকরী ও মায়াবী প্রকৃতির ছবি ফুটে উঠেছে।
দিন ফুরিয়ে আসার সময় পশ্চিম আকাশে নানা রঙের বর্ণিল খেলা দেখা যায়। সেই অপরূপ সৌন্দর্য দেখে কবির মনে হয়েছে, যেন স্বয়ং ঈশ্বর আকাশজুড়ে তাঁর রঙের বাক্স খুলে বসেছেন। তিনি যেন লক্ষ বা একশো রঙের তুলি দিয়ে এই চমৎকার দৃশ্যটি এঁকে চলেছেন।
এর পরপরই ধীরে ধীরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে এবং চারদিক অন্ধকারে ঢেকে যেতে থাকে। সেই সময় পাখিরা সারাদিনের ক্লান্তি শেষে ধানের গুচ্ছের মতো সারি বেঁধে অন্ধকার আকাশকে পিছনে ফেলে নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে উড়ে যায়। প্রকৃতির এই শান্ত, স্নিগ্ধ রূপান্তর এবং পাখিদের ঘরে ফেরার স্বাভাবিক ও শান্তির দৃশ্যটি কবিতায় এক অনবদ্য চিত্রকল্প তৈরি করেছে।
4. “সূর্যি কি আর নিজের ইচ্ছেয় ডুব দিয়েছে?” – এমন প্রশ্ন ওঠার কারণ কী? দিন ফুরোলে শিশুদের মনে কী প্রভাব পড়ে?
উত্তর দেখো
উত্তর: প্রশ্ন ওঠার কারণ: শিশুরা খোলা মাঠে বন্ধুদের সাথে খেলতে খুব ভালোবাসে। সূর্যাস্ত হলে তাদের খেলা বন্ধ করে ঘরে ফিরতে হয়। তাদের মন কিছুতেই চায় না যে এই আনন্দের মুহূর্ত শেষ হয়ে যাক। তাই সূর্যাস্তকে তাদের কাছে এক অনভিপ্রেত ঘটনা বলে মনে হয়। তাদের শিশুসুলভ কল্পনায় মনে হয়, সূর্য হয়তো নিজে থেকে ডোবেনি, কেউ যেন জোর করে তাকে ডুবিয়ে দিয়েছে যাতে তাদের খেলা বন্ধ হয়ে যায়।
শিশুমনে প্রভাব: দিন ফুরোলে শিশুদের মন চরম হতাশায় ভরে ওঠে। খোলা আকাশ, বাতাস আর মাঠের স্বাধীনতা ছেড়ে তাদের ফিরতে হয় চার দেওয়ালের গণ্ডিতে, যা তাদের কাছে এক বন্দিদশা বা ‘মন খারাপের গর্ত’। সেখানে ফিরে তাদের শুনতে হয় বড়োদের বকুনি আর শাসনের কথা। তাই দিন ফুরোনোর সময়টা শিশুমনে এক অদ্ভুত আক্ষেপ, বিষণ্ণতা এবং মুক্তি হারানোর বেদনা সৃষ্টি করে।