মকটেস্ট বেছে নাও

অফলাইন মকটেস্ট

খুব শীঘ্রই আপলোড হবে!

নবম শ্রেণি: বাংলা, দাম – নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5

অধ্যায় 4: দাম
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)

নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:

1. “স্কুলে অঙ্কের মাস্টারমশাইকে আমরা যমের মতো ভয় করতুম।” – মাস্টারমশাইয়ের চেহারার ও স্বভাবের বর্ণনা দাও। তাঁকে যমের মতো ভয় করার কারণ কী? (2+3=5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

চেহারা ও স্বভাবের বর্ণনা: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দাম’ গল্পে উল্লিখিত অঙ্কের মাস্টারমশাইয়ের চেহারা ছিল অত্যন্ত গম্ভীর এবং কড়া। তিনি ছিলেন দীর্ঘকায় পুরুষ। তাঁর মাথার চুল ছিল ছোটো ছোটো করে ছাঁটা, আর চোখে ছিল তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, যা ছাত্রদের মনের গভীরে ভয় ধরিয়ে দিত। স্বভাবের দিক থেকে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর, নিয়মানুবর্তী এবং আপসহীন একজন মানুষ। অঙ্ক না পারাটাকে তিনি কোনোভাবেই বরদাস্ত করতেন না।

ভয় করার কারণ: মাস্টারমশাইকে ছাত্রদের যমের মতো ভয় করার প্রধান কারণ ছিল তাঁর অমানবিক কঠোরতা এবং প্রবল শারীরিক প্রহার। তিনি মনে করতেন পুরুষমানুষের অঙ্ক না পারাটা চরম লজ্জার। কেউ অঙ্ক না পারলে তিনি প্রচণ্ড বকাঝকা করতেন এবং প্রবল চড় মারতেন। তাঁর চড়ের জোর এতই বেশি ছিল যে তা ছাত্রদের মাথায় রীতিমতো ঘুরপাক খাইয়ে দিত এবং তারা চোখে সর্ষেফুল দেখত। তাঁর এই কড়া শাসন, প্লেটোর উদাহরণ দিয়ে ভয় দেখানো এবং নির্দয় প্রহারের কারণেই সুকুমার ও তাঁর বন্ধুরা তাঁকে যমের মতো ভয় করত।

2. ‘দাম’ গল্প অবলম্বনে অঙ্কের মাস্টারমশাইয়ের চরিত্রটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দাম’ গল্পে অঙ্কের মাস্টারমশাই চরিত্রটি কঠোরতার আবরণে মোড়া এক অসীম স্নেহময় শিক্ষকের নিখুঁত প্রতিমূর্তি। তাঁর চরিত্রের প্রধান দিকগুলি হলো:

কঠোর শাসক: গল্পের শুরুতে আমরা তাঁকে এক বিভীষিকাময় শিক্ষক হিসেবে দেখি। অঙ্ক না পারলে তিনি ছাত্রদের নির্দয়ভাবে প্রহার করতেন। তাঁর শাসন এতটাই কড়া ছিল যে ছাত্ররা তাঁকে যমের মতো ভয় পেত।

আদর্শ শিক্ষক ও যুক্তিবাদী: তিনি মনে করতেন অঙ্ক হলো সমস্ত বিদ্যার মূল ভিত্তি। প্লেটোর দর্শনে তাঁর অগাধ বিশ্বাস ছিল। তিনি চাইতেন তাঁর ছাত্ররা যেন অঙ্কের মতো যুক্তিবাদী এবং বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে। পুরুষমানুষের অঙ্ক না পারাটাকে তিনি চরম লজ্জার বিষয় বলে মনে করতেন।

ক্ষমাশীল ও স্নেহময়: গল্পের শেষে মাস্টারমশাইয়ের চরিত্রের এক অভাবনীয় ও সংবেদনশীল দিক ফুটে ওঠে। সুকুমার পত্রিকায় তাঁর নামে কড়া সমালোচনা করলেও, তিনি বিন্দুমাত্র রাগ করেননি। বরং ছাত্রের সাফল্যে তিনি এতটাই গর্বিত হন যে পত্রিকাটি সবাইকে দেখিয়ে বেড়ান। তাঁর এই অকৃত্রিম ক্ষমা, ছাত্রের প্রতি আশীর্বাদ এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই প্রমাণ করে যে, বাইরের কঠোরতার আড়ালে তিনি ছিলেন স্নেহ, মমতা ও ক্ষমার এক মহাসমুদ্র।

3. “মনে হলো, স্নেহ মমতা ক্ষমার এক মহাসমুদ্রের ধারে এসে দাঁড়িয়েছি।” – কার, কখন এই অনুভূতি হয়েছিল? তাঁর এমন মনে হওয়ার কারণ কী? (1+1+3=5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

কার ও কখন অনুভূতি: ‘দাম’ গল্পের কথক, অর্থাৎ অধ্যাপক সুকুমারের মনে এই অনুভূতি হয়েছিল। বাংলাদেশের একটি কলেজে বক্তৃতা দেওয়ার পর বৃদ্ধ মাস্টারমশাই যখন তাঁর পকেট থেকে সুকুমারের লেখা সেই সমালোচনামূলক পত্রিকাটি বের করে সুকুমারকে পরম স্নেহে আশীর্বাদ করেন, ঠিক তখনই সুকুমারের মনে এই উপলব্ধির সৃষ্টি হয়।

কারণ: সুকুমার মাত্র 10 টাকার পারিশ্রমিকের লোভে একটি পত্রিকায় মাস্টারমশাইয়ের কঠোরতাকে তীব্র ব্যঙ্গ করে একটি গল্প লিখেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, এই লেখা পড়লে মাস্টারমশাই ভীষণ রেগে যাবেন। কিন্তু বাস্তবে ঘটে সম্পূর্ণ উলটো ঘটনা। মাস্টারমশাই সেই লেখাটি সযত্নে নিজের পকেটে রেখে দেন এবং সবাইকে গর্ব করে বলেন যে তাঁর ছাত্র তাঁকে অমর করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, নিজের ছাত্রের এতবড়ো প্রতিষ্ঠা দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে তিনি সুকুমারকে ‘দীর্ঘজীবী হও, যশস্বী হও’ বলে মন থেকে আশীর্বাদ করেন। মাস্টারমশাইয়ের এই বিন্দু পরিমাণ অহংকারহীনতা, রাগ না করা এবং ছাত্রের অপরাধকে সম্পূর্ণ ক্ষমা করে দিয়ে অসীম স্নেহ বর্ষণ করা দেখেই সুকুমারের মনে হয়েছিল তিনি যেন স্নেহ, মমতা ও ক্ষমার এক মহাসমুদ্রের ধারে এসে দাঁড়িয়েছেন।

4. “লজ্জায় দুঃখে আমার মাথা কাটা গেল।” – কথকের মাথা কাটা যাওয়ার কারণ ‘দাম’ গল্প অবলম্বনে বিস্তারিত আলোচনা করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

কথক সুকুমার তাঁর ছেলেবেলার অঙ্কের মাস্টারমশাইকে অত্যন্ত ভয় পেতেন। বড়ো হয়ে তিনি বাংলার অধ্যাপক হন এবং একটি পত্রিকার অনুরোধে ছেলেবেলার সেই বিভীষিকাময় মাস্টারমশাইয়ের কঠোরতার তীব্র সমালোচনা করে একটি গল্প লেখেন। এর জন্য তিনি 10 টাকা দক্ষিণা বা পারিশ্রমিক পান।

কিন্তু বহু বছর পর বাংলাদেশের এক অনুষ্ঠানে মাস্টারমশাইয়ের সাথে তাঁর দেখা হয়। সুকুমার দেখেন যে, মাস্টারমশাই ওই সমালোচনামূলক লেখাটি পড়ে বিন্দুমাত্র রাগ করেননি, বরং অত্যন্ত গর্ববোধ করেছেন। তিনি ওই পত্রিকাটিকে নিজের পরম সম্পদ মনে করে সবাইকে দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন এবং বলছেন যে তাঁর ছাত্র তাঁকে অমর করে দিয়েছে। এরপর তিনি সুকুমারের মাথায় হাত রেখে তাঁকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করেন।

সুকুমার বুঝতে পারেন, মাস্টারমশাইয়ের সেই কঠোর শাসনের পেছনে আসলে লুকিয়ে ছিল ছাত্রদের উপযুক্ত মানুষ করে তোলার এক গভীর আকুতি এবং অসীম স্নেহ। অথচ সুকুমার না বুঝে, কেবল 10 টাকার লোভে সেই শিক্ষাগুরুকেই জনসমক্ষে অপমান করেছেন। মাস্টারমশাইয়ের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ক্ষমা এবং উদারতার কাছে নিজের এই নীচ ও হীন কাজের কথা ভেবেই সুকুমারের মন গভীর অনুতাপে ভরে ওঠে এবং লজ্জায় ও দুঃখে তাঁর মাথা কাটা যায়।

5. “আজকের দিনটি আমার বড়ো আনন্দের।” – বক্তা কে? তাঁর এই আনন্দের কারণটি ‘দাম’ গল্প অনুসরণে লেখো। (1+4=5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

বক্তা: উক্তিটির বক্তা হলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দাম’ গল্পের সুকুমারের সেই ছেলেবেলার অঙ্কের মাস্টারমশাই।

আনন্দের কারণ: একজন আদর্শ শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড়ো আনন্দ এবং সার্থকতা লুকিয়ে থাকে তাঁর ছাত্রদের সাফল্যের মধ্যে। মাস্টারমশাইও সারাজীবন তাঁর ছাত্রদের কঠোর শাসনে মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। বহু বছর পর বাংলাদেশের একটি কলেজের অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর একসময়ের ছাত্র সুকুমারকে দেখতে পান। যে সুকুমার ছেলেবেলায় অঙ্কে অত্যন্ত কাঁচা ছিল এবং তাঁকে ভীষণ ভয় পেত, সেই সুকুমার আজ বাংলার একজন প্রতিষ্ঠিত অধ্যাপক এবং অনর্গল কথা বলতে পারা একজন সুবক্তা। মঞ্চে দাঁড়িয়ে সুকুমারের চমৎকার বক্তৃতা শুনে এবং সুকুমারের লেখা গল্পটি পড়ে মাস্টারমশাই বুঝতে পারেন যে তাঁর শাসন বৃথা যায়নি। তাঁর ছাত্র আজ সমাজে একটি সম্মানজনক জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তাঁকে নিয়ে কাগজে লেখালেখি করছে। নিজের ছাত্রের এই চূড়ান্ত সাফল্য এবং প্রতিষ্ঠা চোখের সামনে দেখতে পেয়েই মাস্টারমশাই অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন এবং দিনটিকে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড়ো আনন্দের দিন বলে উল্লেখ করেছিলেন।

6. ‘দাম’ গল্প অবলম্বনে কথক সুকুমারের আত্মোপলব্ধি বা মানসিক পরিবর্তনের পরিচয় দাও। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দাম’ গল্পটি মূলত কথক সুকুমারের মানসিক পরিবর্তন এবং আত্মোপলব্ধির এক অপূর্ব মনস্তাত্ত্বিক দলিল।

গল্পের শুরুতে সুকুমারকে আমরা একজন সাধারণ মানুষের মতোই দেখতে পাই, যে তার ছেলেবেলার কঠোর মাস্টারমশাইকে ভয় পেত এবং বড়ো হয়ে অধ্যাপক হওয়ার অহংকারে সেই মাস্টারমশাইয়েরই সমালোচনা করে পত্রিকায় 10 টাকার বিনিময়ে গল্প লিখেছিল। তার মনে মাস্টারমশাই সম্পর্কে এক ধরনের রাগ ও তাচ্ছিল্য ছিল।

কিন্তু গল্পের শেষে যখন সে প্রত্যক্ষ করে যে মাস্টারমশাই তার ওই কটূক্তিপূর্ণ লেখাটি পড়ে বিন্দুমাত্র রাগ না করে, বরং গর্ববোধ করছেন এবং তাকে মন থেকে আশীর্বাদ করছেন, তখন সুকুমারের মনের সমস্ত অহংকার চূর্ণ হয়ে যায়। সে বুঝতে পারে, মাস্টারমশাইয়ের বাইরের কঠোরতার আড়ালে ছাত্রদের প্রতি অগাধ স্নেহ লুকিয়ে ছিল। নিজের নীচ মানসিকতার জন্য সে গভীর লজ্জায় ও অনুতাপে দগ্ধ হয়। সুকুমার গভীরভাবে উপলব্ধি করে যে, 10 টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা সমালোচনার চেয়ে মাস্টারমশাইয়ের এই অকৃত্রিম ক্ষমা ও আশীর্বাদের ‘দাম’ অনেক বেশি। এই উপলব্ধির মাধ্যমেই সুকুমারের চরিত্রের এক অভাবনীয় মানসিক উত্তরণ ঘটে।

7. “এসব হলো স্নেহের দান, এর কি দাম দেওয়া যায়?” – উক্তিটির আলোকে ‘দাম’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

সাহিত্যে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ সার্থক নামকরণের মাধ্যমেই রচনার অন্তর্নিহিত সত্য ও মূল বিষয়বস্তু পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দাম’ গল্পটির ক্ষেত্রেও এই নাম অত্যন্ত ব্যঞ্জনাধর্মী এবং সার্থক।

গল্পে দু-ধরনের ‘দাম’ বা মূল্যের কথা বলা হয়েছে। প্রথমটি হলো জাগতিক বা পার্থিব দাম। কথক সুকুমার একটি পত্রিকায় তাঁর ছেলেবেলার শিক্ষাগুরু অঙ্কের মাস্টারমশাইয়ের নামে কড়া সমালোচনা লিখে মাত্র 10 টাকা ‘দাম’ বা পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন। এই দামের মধ্যে লুকিয়ে ছিল অহংকার এবং শিক্ষকের প্রতি অসম্মান।

দ্বিতীয় দামটি হলো অপার্থিব এবং আত্মিক। মাস্টারমশাই যখন সুকুমারের লেখা সেই কটূক্তিপূর্ণ গল্পটি পড়েন, তখন তিনি রাগ করার বদলে ছাত্রের জন্য গর্ববোধ করেন এবং সুকুমারকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করেন। সুকুমারের মনে চরম আত্মোপলব্ধি জাগে। সে বুঝতে পারে, 10 টাকা পারিশ্রমিকের কাছে সে নিজেকে অত্যন্ত সস্তায় বিক্রি করেছে। কিন্তু মাস্টারমশাইয়ের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ক্ষমা এবং তাঁর অকৃত্রিম আশীর্বাদ আসলে মহামূল্যবান। এই স্নেহের দানকে কোনো পার্থিব ‘দাম’ বা টাকা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। অর্থাৎ, গল্পের শেষে পার্থিব মূল্যের চেয়ে স্নেহের অমূল্য দামই বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে, যা গল্পটির নামকরণকে সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক ও ব্যঞ্জনাপূর্ণ করে তুলেছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার