নবম শ্রেণি: বাংলা, আমরা – সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর মান 5
অধ্যায় 11: আমরা
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. “আমরা বাঙালি বাস করি সেই তীর্থে-বরদ বঙ্গে।” – ‘তীর্থ-বরদ বঙ্গ’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? এই বঙ্গের প্রাকৃতিক রূপ ও বাঙালির সাহসিকতার যে পরিচয় কবিতায় আছে, তা লেখো। (1+4=5)
উত্তর দেখো
তীর্থ-বরদ বঙ্গ: ‘তীর্থ’ অর্থাৎ পুণ্যভূমি এবং ‘বরদ’ অর্থাৎ যা বর বা আশীর্বাদ দান করে। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত মনে করেন, গঙ্গা বিধৌত সুজলা-সুফলা বাংলা মায়ের কোল যেকোনো পবিত্র তীর্থস্থানের চেয়ে কম নয়। এই পুণ্যভূমি বঙ্গদেশ যুগ যুগ ধরে তার সন্তানদের অকৃপণভাবে আশীর্বাদ এবং আশ্রয় দিয়ে আসছে বলেই কবি একে ‘তীর্থ-বরদ বঙ্গ’ বলেছেন।
প্রাকৃতিক রূপ ও সাহসিকতা: কবিতায় বাংলার এক অপূর্ব এবং বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক রূপ ফুটে উঠেছে। গঙ্গা নদী তার পবিত্র স্রোতধারায় এখানে মুক্তির আনন্দ বিতরণ করে। বাংলার একপাশে রয়েছে লক্ষ্মীর পদ্মফুলের মতো শস্যশ্যামলা উর্বর প্রান্তর, আবার অন্যপাশে রয়েছে মহুয়ার মালায় সাজা রুক্ষ, বন্য এবং প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরা আদিবাসী অঞ্চল।
এই দুর্গম প্রকৃতির বুকেই বাঙালির অসীম সাহসিকতার পরিচয় মেলে। বাঙালি জাতি কোনোদিন ভীরু বা দুর্বল ছিল না। তারা গভীর জঙ্গলে ভয়ংকর বাঘের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকে এবং অসীম সাহসে অবলীলায় বিষধর সাপকে (নাগ) পোষ মানিয়ে খেলা দেখায়। মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে, সমস্ত প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাকে জয় করে বীরের মতো টিকে থাকার এই অনবদ্য ইতিহাসই কবিতায় বর্ণিত হয়েছে।
2. “এক হাতে মোরা মোগল দমিয়া, আর হাতে দমি মগ” – বাঙালির এই শৌর্য-বীর্য ও সামরিক গৌরবের যে পরিচয় ‘আমরা’ কবিতায় ফুটে উঠেছে, তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো। (5)
উত্তর দেখো
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘আমরা’ কবিতাটি কেবল প্রাকৃতিক বর্ণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরাধীন বাঙালি জাতিকে তাদের হারিয়ে যাওয়া সামরিক বীরত্ব এবং অতীত গৌরবের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার এক অনবদ্য দলিল।
কবিতায় আমরা দেখতে পাই, বাঙালির সামরিক ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। প্রাচীনকালে বাংলার চতুরঙ্গ সেনা (হাতি, ঘোড়া, রথ ও পদাতিক) রামচন্দ্রের প্রপিতামহ রঘুরাজের পরাক্রমশালী সেনাবাহিনীর সঙ্গেও প্রবল বিক্রমে যুদ্ধ করেছিল। বাঙালি বীর বিজয়সিংহ সমুদ্র পেরিয়ে লঙ্কা জয় করেছিলেন এবং নিজের সাহসের জোরে সেই দেশের নাম রেখেছিলেন ‘সিংহল’।
মধ্যযুগেও বাঙালির এই বীরত্ব ম্লান হয়নি। সপ্তদশ শতাব্দীতে একদিকে যখন দিল্লির পরাক্রমশালী মোগল সম্রাট আকবর এবং জাহাঙ্গীরের বিশাল বাহিনী বাংলা দখল করতে আসে, তখন বাংলার প্রতাপাদিত্য এবং চাঁদ রায়ের মতো বীরেরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তাঁদের প্রবল শৌর্য-বীর্যের কাছে দিল্লির সম্রাটকেও পিছু হটতে হয়েছিল। আবার ঠিক সেই সময়েই সমুদ্রপথে আসা আরাকানের দুর্ধর্ষ ‘মগ’ বা জলদস্যুদেরও বাঙালি বীরেরা কঠোর হাতে দমন করেছিলেন। একইসঙ্গে দুই শক্তিশালী শত্রুকে অবলীলায় পরাস্ত করার এই সামরিক গৌরবই পঙ্ক্তিটিতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।
3. “বাঙালির হিয়া অমিয় মথিয়া নিমাই ধরেছে কায়া।” – পঙ্ক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো। কবিতায় বাঙালির আর কোন্ কোন্ সাহিত্য ও সংস্কৃতির গৌরবময় ইতিহাস ফুটে উঠেছে? (2+3=5)
উত্তর দেখো
পঙ্ক্তিটির তাৎপর্য: নিমাই অর্থাৎ শ্রীচৈতন্যদেব ছিলেন বাংলার ভক্তি ও প্রেমধর্মের এক মহান প্রবর্তক। বাঙালির হৃদয়ে (‘হিয়া’) প্রেম, ভক্তি, করুণা এবং মানবতার যে অমৃত (‘অমিয়’) লুকিয়ে ছিল, শ্রীচৈতন্যদেব যেন তারই এক মূর্ত প্রতীক। তিনি জাতি-ভেদ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সমস্ত মানুষকে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। বাঙালির অন্তরের সেই গভীর প্রেম আর ভক্তিই যেন মন্থিত হয়ে নিমাই বা শ্রীচৈতন্যের শরীর (‘কায়া’) ধারণ করে বাংলার মাটিতে অবতীর্ণ হয়েছিল, কবি এখানে সেই কথাই বুঝিয়েছেন।
সাহিত্য ও সংস্কৃতির গৌরবময় ইতিহাস: কেবল ধর্ম নয়, বাঙালির জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসও অত্যন্ত গৌরবের। ‘আদি-বিদ্বান’ কপিল মুনি বাংলার মাটিতে বসেই বিশ্ববিখ্যাত ‘সাংখ্য দর্শন’ রচনা করেছিলেন। বাঙালি পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর দুর্গম হিমালয়ের তুষারাবৃত পথ পেরিয়ে তিব্বতে গিয়ে জ্ঞানের আলো জ্বেলেছিলেন এবং শীলভদ্র নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হিসেবে জ্ঞান বিতরণ করেছিলেন। সাহিত্যের ক্ষেত্রে কবি জয়দেব তাঁর ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যে নব-নবরস-ধারা বর্ষণ করেছিলেন। শিল্পকলায় ধীমান এবং বিটপালের মতো ভাস্করেরা অপরূপ ভাস্কর্য তৈরি করেছিলেন, যার খ্যাতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। আধুনিক যুগে বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু জড় বা গাছের মধ্যেও প্রাণের সাড়া আবিষ্কার করে বিশ্ববিজ্ঞানের দরবারে বাঙালির নাম উজ্জ্বল করেছিলেন।
4. ‘আমরা’ কবিতায় কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলমানের যে মহামিলন এবং সম্প্রীতির আদর্শ তুলে ধরেছেন, তা বিশ্লেষণ করো। (5)
উত্তর দেখো
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘আমরা’ কবিতাটি বাঙালির অতীত শৌর্য-বীর্য এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাসের পাশাপাশি বাংলার বুকে রচিত হওয়া এক অপূর্ব সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং মহামিলনেরও এক অসামান্য দলিল।
কবি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে, বাংলার মাটি কখনোই ধর্মীয় বিভেদ বা সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতাকে প্রশ্রয় দেয়নি। এই পবিত্র ভূমিতে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং মুসলমান— এই তিন প্রধান ধর্মের মানুষ যুগ যুগ ধরে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে মিলেমিশে বসবাস করে আসছে। বাংলার মাটিতে রচিত হয়েছে এক মহামিলনের অপূর্ব আদর্শ, যেখানে ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে মানুষ মানুষকে আপন করে নিয়েছে।
কবির মতে, বাঙালির অন্তরে রয়েছে সেই অসীম আধ্যাত্মিক এবং বৌদ্ধিক ক্ষমতা, যা দিয়ে সে সমাজের চরম বিপরীতমুখী বা শত্রুভাবাপন্ন দুই মেরুর মানুষ, এমনকি ‘ব্যাঘ্রে বৃষভে’ অর্থাৎ বাঘ এবং ষাঁড়ের মধ্যেও সমন্বয় ঘটাতে পারে। শ্রীচৈতন্যদেবের প্রেমের বন্যায় যেমন সমস্ত জাতিভেদ প্রথা ভেসে গিয়েছিল, তেমনি বাংলার সমাজেও হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম সংস্কৃতির এক আশ্চর্য আদান-প্রদান ঘটেছে। তাই কবি প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছেন যে, এই বাঙালি জাতিই আগামী দিনে সমগ্র বিশ্বকে ধর্মীয় সম্প্রীতি, প্রেম এবং মহামিলনের প্রকৃত পথ দেখাবে।
5. ‘আমরা’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। (5)
উত্তর দেখো
সাহিত্যে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক, কারণ এর মাধ্যমেই রচনার মূল ভাববস্তু বা অন্তর্নিহিত দর্শন পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘ছন্দের জাদুকর’ সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের আলোচ্য কবিতাটির ‘আমরা’ নামকরণটি বিষয়বস্তু এবং ব্যঞ্জনা— উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত সার্থক।
‘আমরা’ বলতে এখানে সমগ্র বাঙালি জাতিকে বোঝানো হয়েছে। পরাধীনতার গ্লানিতে যখন বাঙালি জাতি হীনমন্যতায় ভুগছিল, তখন কবি এই ‘আমরা’-র বহুবচনের মাধ্যমে সমগ্র জাতিকে এক সূত্রে বাঁধতে চেয়েছেন। কবিতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কবি ‘আমরা’ (অর্থাৎ বাঙালিরা) কী ছিলাম, কী করেছি এবং আমাদের অতীত কতখানি গৌরবের, তারই এক সুদীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরেছেন।
‘আমরা’ বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি, ‘আমরা’ লঙ্কা জয় করেছি, ‘আমরা’ মোগল ও মগদের দমন করেছি— এইভাবেই প্রতিটি ছত্রে ‘আমরা’ শব্দটি বাঙালির শৌর্য, বীর্য, জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং ধর্মীয় উদারতার এক অসামান্য অহংকারে পরিণত হয়েছে। কবি বিশ্বাস করেন, অতীতকে চিনতে পারলেই বাঙালি আবার তার হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারবে এবং বিশ্বসভায় শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসবে। যেহেতু সমগ্র কবিতাটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, অতীত গৌরব এবং ভবিষ্যতের মহামিলনের এক সামগ্রিক রূপরেখা, তাই ‘আমরা’ নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক এবং অর্থবহ হয়েছে।