নবম শ্রেণি: বাংলা, আবহমান – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর মান 5
অধ্যায় 13: আবহমান
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. “গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া / লাউমাচাটার পাশে।” – কাকে, কেন এই কথা বলা হয়েছে? লাউমাচাটার পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন? (1+2+2=5)
উত্তর দেখো
উদ্দিষ্ট ব্যক্তি: জীবিকার তাগিদে বা আধুনিক সভ্যতার মোহে গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দেওয়া শেকড়সন্ধানী মানুষটিকে উদ্দেশ্য করে কবি এই কথা বলেছেন।
বলার কারণ: মানুষ জন্মভূমি ছেড়ে শহরে গিয়ে যান্ত্রিক ও কৃত্রিম জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু এই জীবনে তার মনের আসল শান্তি থাকে না। সে প্রতিনিয়ত তার গ্রামের মাটির টান, ঘাসের গন্ধ এবং শান্ত পরিবেশের অভাব বোধ করে। শহরের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া সেই ক্লান্ত মানুষটিকে তার হারানো মানসিক শান্তি এবং শেকড়ের আশ্রয় ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই কবি তাকে গ্রামের পুরোনো উঠোনে ফিরে যেতে বলেছেন।
তাৎপর্য: ‘লাউমাচা’ হলো পল্লিবাংলার অত্যন্ত সাধারণ, অকৃত্রিম এবং চিরায়ত গার্হস্থ্য জীবনের প্রতীক। লাউমাচার পাশে দাঁড়ানোর অর্থ হলো নাগরিক জীবনের সমস্ত অহংকার এবং কৃত্রিমতা ভুলে গিয়ে গ্রামের সহজ-সরল এবং মাটির কাছাকাছি থাকা জীবনের সঙ্গে নিজেকে পুনরায় যুক্ত করা। এর মধ্য দিয়ে কবি মাতৃভূমি এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক সংযোগের কথাটিই বোঝাতে চেয়েছেন।
2. “নোটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়োয় না।” – এই পঙ্ক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে কবিতার অন্তর্নিহিত মূল সুরটি বুঝিয়ে দাও। (5)
উত্তর দেখো
তাৎপর্য: বাংলা সাহিত্যে এবং লোকমুখে প্রচলিত রূপকথার গল্পগুলিতে গল্পের সমাপ্তি বোঝাতে বলা হয়— “আমার কথাটি ফুরোলো, নটেগাছটি মুড়োলো।” অর্থাৎ, নটেগাছ মুড়িয়ে যাওয়ার অর্থ হলো সবকিছুর শেষ বা সমাপ্তি। কিন্তু কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী আলোচ্য কবিতায় বলেছেন যে, পল্লিগ্রামের এই নটেগাছটি সময়ের নিয়মে বুড়িয়ে যায় বা প্রাচীন হয় ঠিকই, কিন্তু তা কখনও মুড়িয়ে যায় না। এর অর্থ হলো, গ্রামবাংলার শাশ্বত প্রকৃতির রূপ এবং গ্রামের প্রতি মানুষের নাড়ির টান অত্যন্ত প্রাচীন হলেও তা কোনোদিন শেষ বা বিলুপ্ত হয়ে যায় না।
মূল সুর: এই পঙ্ক্তিটির মধ্যেই ‘আবহমান’ কবিতার মূল সুর লুকিয়ে আছে। সভ্যতার বিকাশ হয়েছে, মানুষ জীবিকার তাগিদে গ্রাম থেকে শহরমুখী হয়েছে, কিন্তু মাতৃভূমির মাটির প্রতি মানুষের জন্মজন্মান্তরের ভালোবাসা কখনোই শেষ হয়নি। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি কাটাতে মানুষ আজও শান্তি খোঁজে সেই পল্লিগ্রামের উঠোনে, লাউমাচার পাশে, ঘাসের গন্ধে এবং তারায় ভরা আকাশের নিচে। প্রকৃতির নিয়ম এবং মানুষের এই শেকড়ের টান অনন্তকাল ধরে বয়ে চলেছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে। নটেগাছ মুড়িয়ে না যাওয়ার উপমা দিয়ে কবি এই চিরন্তন সত্যটিকেই তুলে ধরেছেন।
3. “ফুরোয় না তার যাওয়া এবং ফুরোয় না তার আসা।” – উদ্ধৃতাংশটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এর তাৎপর্য আলোচনা করো। (1+4=5)
উত্তর দেখো
প্রসঙ্গ: গ্রাম ছেড়ে শহরে যাওয়া শেকড়সন্ধানী মানুষের মাতৃভূমির প্রতি চিরন্তন টান এবং বারবার গ্রামে ফিরে আসার অদম্য ইচ্ছার কথা বোঝাতে গিয়ে কবি আলোচ্য উক্তিটি করেছেন।
তাৎপর্য: মানুষ নিজের অস্তিত্ব রক্ষা, জীবিকা বা উন্নত জীবনের আশায় নিজের জন্মস্থান বা গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দেয়। এটাই হলো তার ‘যাওয়া’। কিন্তু শহুরে জীবন মানুষকে কেবল অর্থ বা স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারে, প্রকৃত মানসিক শান্তি দিতে পারে না। শহরের যান্ত্রিকতায় মানুষ যখন হাঁপিয়ে ওঠে, তখন সে অনুভব করে যে তার প্রকৃত আশ্রয় লুকিয়ে আছে তার ফেলে আসা গ্রামের মাটির মধ্যে। তখন সেই একগুঁয়ে মানুষটির মনে দুরন্ত পিপাসা জাগে গ্রামের ঘাসের গন্ধ মাখার এবং তারায় তারায় স্বপ্ন দেখার। এই নাড়ির অমোঘ টানেই সে বারবার গ্রামে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। এটাই হলো তার ‘আসা’। মানুষের জীবনের প্রয়োজনে গ্রাম ছেড়ে শহরে যাওয়া এবং আত্মার শান্তিতে শহর থেকে আবার গ্রামে ফিরে আসা— এই চক্রাকার ধারাটি অনন্তকাল ধরে চলছে। এটি কোনোদিনই ফুরিয়ে যাওয়ার নয়।
4. “নেভে না তার যন্ত্রণা যে, দুঃখ হয় না বাসি,” – কার যন্ত্রণার কথা বলা হয়েছে? তার দুঃখ কেন বাসি হয় না, তা ‘আবহমান’ কবিতা অবলম্বনে আলোচনা করো। (1+4=5)
উত্তর দেখো
উদ্দিষ্ট ব্যক্তি: যে মানুষটি গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়ে শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং শহুরে জীবনের যান্ত্রিকতায় হাঁপিয়ে উঠেছে, এখানে তার মানসিক যন্ত্রণার কথা বলা হয়েছে।
দুঃখ বাসি না হওয়ার কারণ: মানুষ যখন গ্রাম ছেড়ে শহরে যায়, তখন সে বাধ্য হয়েই নিজের ফেলে আসা জীবনের সঙ্গে আপস করে। কিন্তু তার মনের মণিকোঠায় সযত্নে লালিত থাকে জন্মভূমির স্মৃতি— সেই পুরোনো উঠোন, লাউমাচা, নদীর হাওয়া এবং কুন্দফুলের হাসি। শহরের কংক্রিটের জঙ্গলে সে যখন শান্তি পায় না, তখন এই স্মৃতিগুলি তাকে আরও বেশি করে যন্ত্রণা দেয়। সে জানে যে তার প্রকৃত শান্তি রয়েছে গ্রামের সেই পুরোনো পরিবেশে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির কারণে সে স্থায়ীভাবে আর গ্রামে ফিরে যেতে পারে না। জন্মভূমি থেকে এই দূরত্বের যে দুঃখ বা বিরহ-বেদনা, তা তার হৃদয়ে প্রতিদিন নতুন করে বাজে। সময়ের প্রলেপ এই মাতৃভূমির প্রতি টান বা বেদনাকে কখনও ম্লান, তুচ্ছ বা ‘বাসি’ করে দিতে পারে না। এই অমোঘ এবং শাশ্বত বেদনার কথাই কবি এখানে অত্যন্ত দরদের সঙ্গে বুঝিয়েছেন।
5. ‘আবহমান’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। (5)
উত্তর দেখো
সাহিত্যে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক, কারণ এর মাধ্যমেই রচনার মূল ভাববস্তু পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘আবহমান’ শব্দটির অর্থ হলো যা অনন্তকাল ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে বয়ে চলেছে বা ঘটে চলেছে। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর আলোচ্য কবিতাটির ক্ষেত্রে এই নামকরণটি বিষয়বস্তু এবং ব্যঞ্জনা— উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত সার্থক।
কবিতায় আমরা মূলত দুটি ‘আবহমান’ বা চিরন্তন সত্যের দেখা পাই। প্রথমত, পল্লিবাংলার প্রকৃতির শাশ্বত রূপ। মানুষের জীবনে যতই পরিবর্তন আসুক না কেন, প্রকৃতির নিয়মে কোনো ছেদ পড়ে না। অনন্তকাল ধরে নিয়ম করে যেমন সূর্য ওঠে এবং ছায়া নামে, ঠিক তেমনই নদীর হাওয়া বয়, উঠোনের লাউমাচায় ফুল ফোটে এবং বাগান থেকে কুন্দফুলের হাসি ঝরে পড়ে। প্রকৃতির এই রূপটি চিরপ্রবহমান।
দ্বিতীয়ত, মাতৃভূমি বা শেকড়ের প্রতি মানুষের টান। মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দিলেও, তার মন সবসময় মাটির টানে গ্রামে ফিরে আসতে চায়। শহরের যান্ত্রিক জীবনে ক্লান্ত মানুষের এই ফিরে আসার ‘দুরন্ত পিপাসা’ এবং জন্মভূমির প্রতি তার নিখাদ ভালোবাসা কোনোদিন ফুরোয় না। এই যাওয়া এবং আসার ধারাও আবহমান কাল ধরে চলছে। যেহেতু সমগ্র কবিতাটিতে প্রকৃতির চিরন্তন রূপ এবং মানুষের অকৃত্রিম শেকড়ের টানের অনন্ত প্রবহমানতাকেই তুলে ধরা হয়েছে, তাই ‘আবহমান’ নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক এবং সুপ্রযুক্ত হয়েছে।