নবম শ্রেণি: বাংলা, চন্দ্রনাথ – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3
অধ্যায় 20: চন্দ্রনাথ
(সংক্ষিপ্ত / ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 3)
নিচের উক্তিগুলির বিস্তারিত ও প্রাসঙ্গিক উত্তর দাও:
1. চন্দ্রনাথের ললাটে ‘অগ্নিকণা’র তিলক বলতে কথক কী বুঝিয়েছেন? (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: কথক নরেশ চন্দ্রনাথের প্রশস্ত ললাট বা কপালে একটি কাল্পনিক অগ্নিকণার তিলক লক্ষ্য করেছিলেন। এটি কোনো শারীরিক চিহ্ন ছিল না, বরং চন্দ্রনাথের অদম্য তেজ, জেদ এবং তাঁর চরিত্রের প্রখর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রতীক। চন্দ্রনাথ সাধারণের থেকে আলাদা; তাঁর মধ্যে যে দাহিকা শক্তি ও আত্মসম্মানবোধ ছিল, তা কথকের চোখে আগুনের শিখার মতো দীপ্ত মনে হতো। এই ‘অগ্নিকণা’ আসলে চন্দ্রনাথের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং তাঁর জীবনের সম্ভাব্য কঠিন পরিণতির এক ইঙ্গিতবাহী বর্ণনা।
2. “দম্ভ চন্দ্রনাথের কাছে পবিত্র বস্তু” – উক্তিটি ব্যাখ্যা করো। (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: চন্দ্রনাথের চরিত্রে দম্ভ বা অহংকার কোনো নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য ছিল না, বরং তা ছিল তাঁর আত্মমর্যাদার বর্ম। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, নিজের যোগ্যতার ওপর দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে থাকাই শ্রেষ্ঠত্ব। তিনি কারোর দয়া, করুণা বা চাটুকারিতা পছন্দ করতেন না। সাধারণ মানুষের কাছে যা দম্ভ, চন্দ্রনাথের কাছে তা ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের পবিত্রতা রক্ষা করার হাতিয়ার। এই দম্ভের কারণেই তিনি হিরুর দেওয়া নিমন্ত্রণ বা স্কুল পুরস্কার ফিরিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি, কারণ তাঁর কাছে নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়ে কোনো প্রাপ্তিই কাম্য ছিল না।
3. হিরু ও চন্দ্রনাথের চরিত্রের বৈপরীত্য সংক্ষেপে লেখো। (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: হিরু ও চন্দ্রনাথের চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর। হিরু ছিল আভিজাত্যপূর্ণ পরিবারের সন্তান, সে অত্যন্ত বিনয়ী, সামাজিক এবং সকলের কাছে প্রিয়পাত্র হতে চাইত। অন্যদিকে, চন্দ্রনাথ ছিল একাকী, গম্ভীর এবং অনমনীয় ব্যক্তিসত্ত্বার অধিকারী। হিরু ছিল প্রথাগতভাবে সফল ছাত্র, কিন্তু চন্দ্রনাথ ছিলেন প্রতিভাধর ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। হিরু সামাজিক মেলামেশা ও লৌকিকতায় বিশ্বাসী হলেও চন্দ্রনাথ ছিলেন আত্মকেন্দ্রিক ও নিঃসঙ্গ। এই বৈপরীত্যই গল্পের সংঘাত ও রসধারাকে পুষ্ট করেছে।
4. চন্দ্রনাথ কেন হিরুর নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিল? (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: চন্দ্রনাথের কাছে হিরুর নিমন্ত্রণ ছিল কেবল একটি লৌকিকতা বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের মাধ্যম। হিরু পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার পর যখন চন্দ্রনাথকে নিমন্ত্রণ করতে আসে, তখন চন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল হিরু যেন দয়া করে তাকে ডাকছে। চন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে হিরু ছিল একজন ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর’ ছাত্র, যে কেবল ভাগ্যের জোরে প্রথম হয়েছে। নিজের চেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন একজনের কাছে মাথা নত করা বা তাঁর আতিথ্য গ্রহণ করা চন্দ্রনাথের আত্মসম্মানে আঘাত করেছিল। তাই তিনি কোনো অজুহাত না দেখিয়ে সোজাসুজি নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন।
5. চন্দ্রনাথের পদধ্বনি শুনে কথকের কী মনে হতো এবং কেন? (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: কথক নরেশের কানে চন্দ্রনাথের পদধ্বনি ছিল অত্যন্ত গম্ভীর ও শক্তিশালী। তাঁর মনে হতো যেন কোনো হিংস্র কিন্তু রাজকীয় পশু অন্ধকার অরণ্য চিরে সগৌরবে এগিয়ে আসছে। চন্দ্রনাথের হাঁটার মধ্যে এক প্রকার আত্মবিশ্বাস ও কাঠিন্য ছিল যা অন্যদের মনে সম্ভ্রম ও ভয়ের উদ্রেক করত। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সুনির্দিষ্ট ও দৃঢ়। এই পদধ্বনি আসলে চন্দ্রনাথের অনমনীয় ব্যক্তিসত্ত্বা এবং তাঁর অদম্য সংকল্পেরই বহিঃপ্রকাশ ছিল, যা কথককে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল।
6. শম্ভুনাথ বাবু কেন চন্দ্রনাথের জেদের সমালোচনা করেছিলেন? (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: চন্দ্রনাথের বড় ভাই শম্ভুনাথ বাবু ছিলেন ধীর ও সংযত প্রকৃতির মানুষ। তিনি বুঝতেন যে চন্দ্রনাথের অদম্য জেদ এবং অতিরিক্ত আত্মসম্মান তাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। শম্ভুনাথ বাবু জানতেন যে অতিরিক্ত কাঠিন্য অনেক সময় পতনের কারণ হয়। তাই তিনি চন্দ্রনাথের জেদকে ‘অশুভ’ বলে মনে করতেন এবং আশঙ্কা করতেন যে এই অহংকারই একদিন তাঁর ছোট ভাইকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে। ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি চন্দ্রনাথকে নমনীয় হতে বলতেন, কিন্তু চন্দ্রনাথ তা গ্রাহ্য করেননি।
7. “চন্দ্রনাথের দৃষ্টি বড় প্রখর” – উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো। (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: চন্দ্রনাথের শারীরিক চোখ দুটি যেমন বড় ছিল, তেমনই তাঁর অন্তর্নিহিত দৃষ্টি ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও বিচারশীল। তিনি মানুষের মনের ভণ্ডামি বা দুর্বলতা মুহূর্তের মধ্যে ধরতে পারতেন। হিরুর কৃত্রিম বিনয় বা স্কুলের কর্তৃপক্ষের পক্ষপাতমূলক আচরণ তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াতে পারত না। এই প্রখর দৃষ্টির কারণেই তিনি কারোর তুষ্টির ধার ধারতেন না। তাঁর এই চাউনি অনেক সময় অন্যদের অস্বস্তিতে ফেলত, কারণ চন্দ্রনাথের চোখের দিকে তাকিয়ে মিথ্যা বলা বা নিজেকে আড়াল করা ছিল অসম্ভব।
8. পনেরো বছর পর চন্দ্রনাথের শারীরিক পরিবর্তনের বর্ণনা দাও। (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: দীর্ঘ পনেরো বছর পর কথক যখন চন্দ্রনাথকে দেখেন, তখন তাঁর মধ্যে বয়েসের ছাপ ও জীবনের কঠোর সংগ্রামের চিহ্ন স্পষ্ট ছিল। তাঁর মাথার চুল বিরল হয়ে এসেছে, প্রশস্ত কপালে রেখা দেখা দিয়েছে, কিন্তু তাঁর সেই বিশেষ তেজ ও আগুনের আভা স্তিমিত হয়নি। তাঁর শরীর আরও শুষ্ক ও কঠিন হয়ে গিয়েছে। সব মিলিয়ে চন্দ্রনাথকে দেখে মনে হয়েছে তিনি যেন এক প্রাচীন পাহাড়ের মতো, যার ওপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গিয়েছে কিন্তু যার মস্তক আজও উন্নত ও অবিচল।
9. চন্দ্রনাথ কেন হিরুর বাড়িতে পরদিন সকালে গিয়েছিলেন? (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: চন্দ্রনাথ হিরুর নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাননি সত্য, কিন্তু বন্ধুত্বের এক গোপন টান তাঁর মনে অবশিষ্ট ছিল। তিনি চেয়েছিলেন হিরুর সঙ্গে দেখা করতে, কিন্তু তা উৎসবের ভিড়ে বা লৌকিকতার মাঝে নয়। তিনি যখন পরদিন ভোরে হিরুর বাড়িতে যান, তখন উৎসব শেষ হয়ে গিয়েছে। এই যাওয়ার মধ্য দিয়ে চন্দ্রনাথ প্রমাণ করেছেন যে তিনি হিরুকে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করেন না, বরং তাঁর নিমন্ত্রণ করার ধরণ এবং আভিজাত্যের প্রদর্শনীকেই তিনি ঘৃণা করেন। এটি তাঁর চরিত্রের এক জটিল ও অদ্ভুত মানবিক দিক।
10. “চন্দ্রনাথের জীবন এক বিফলতার ইতিহাস” – কেন এমন মনে হয়? (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: চন্দ্রনাথ ছিলেন অসম্ভব মেধাবী ও শক্তিশালী ব্যক্তিসত্ত্বার অধিকারী। কিন্তু তাঁর অতিরিক্ত জেদ, দম্ভ এবং নমনীয়তার অভাব তাঁকে সামাজিক জীবনে বড় কোনো সাফল্যে পৌঁছাতে দেয়নি। তিনি সারাজীবন একাকী ও ভবঘুরের মতো লড়াই করেছেন। পৃথিবীর নিয়ম অনুযায়ী যা ‘সাফল্য’ (অর্থ, পদমর্যাদা, পরিবার), চন্দ্রনাথ তা অর্জন করতে পারেননি। তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেন তাঁর চরিত্রের কাঠিন্যের আড়ালে গুমরে মরেছে। তাই জাগতিক বিচারে তাঁর জীবনকে বিফলতার ইতিহাস বলে মনে হতে পারে, যদিও তিনি নিজের আদর্শে অটল ছিলেন।
11. চন্দ্রনাথের হাসির বিশেষত্ব কী ছিল? (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: চন্দ্রনাথের হাসি ছিল এক প্রকার অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্যে পূর্ণ। তিনি যখন হাসতেন, তখন তাঁর চোখের কোণে এক বিচিত্র জ্যোতি ফুটে উঠত। সেই হাসির মধ্যে কারোর প্রতি সহানুভূতি থাকত না, বরং থাকত অন্যের দুর্বলতাকে প্রকাশ্যে এনে দেওয়ার এক কঠোর আনন্দ। তাঁর হাসি ছিল বুদ্ধির দীপ্তিতে ভরা কিন্তু হৃদয়ের উত্তাপহীন। এই হাসি মানুষকে হাসাতে পারত না, বরং অস্বস্তিতে ফেলে দিত। তাঁর চরিত্রের নিঃসঙ্গতা ও কাঠিন্য এই হাসির মধ্য দিয়েও প্রকট হতো।
12. চন্দ্রনাথের ললাটের বর্ণনাটি লেখকের ভাষায় লেখো। (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: লেখক চন্দ্রনাথের ললাট বা কপালকে বর্ণনা করেছেন এক প্রশস্ত চন্দ্রাকৃতি ললাট হিসেবে। তা যেমন উজ্জ্বল, তেমনই সেখানে সর্বদা এক তেজের ভাব দীপ্ত হয়ে থাকত। কথকের বর্ণনায়, সেই কপালে যেন এক অদৃশ্য রাজতিলক অথবা রুদ্র দেবতার অগ্নিকণা অঙ্কিত ছিল। এই প্রশস্ত ললাট চন্দ্রনাথের উচ্চ মানসিকতা এবং তাঁর চরিত্রের বিশালত্বের পরিচায়ক। জীবনের শেষ পর্বেও দেখা যায়, সেই কপালে চিন্তার রেখা পড়লেও তাঁর আদিম গাম্ভীর্য ও তেজ বিন্দুমাত্র মলিন হয়নি।
13. হিরু ও চন্দ্রনাথের বন্ধুত্বের মধ্যে ব্যবধানের কারণ কী? (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: হিরু ও চন্দ্রনাথের বন্ধুত্বের প্রধান ব্যবধান ছিল তাঁদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। হিরু ছিল ধনী ও আভিজাত্যপূর্ণ পরিবারের সন্তান, সে সমাজের লৌকিকতা মেনে চলত। অন্যদিকে চন্দ্রনাথ ছিল মধ্যবিত্ত বা তারও নিচের স্তরের কিন্তু অদম্য তেজের অধিকারী। হিরু চন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা করলেও পরোক্ষভাবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বা আভিজাত্য জাহির করতে চাইত, যা চন্দ্রনাথ সহ্য করতে পারতেন না। চন্দ্রনাথের অনমনীয় আত্মসম্মান হিরুর বিনয়কে এক প্রকার দুর্বলতা বা ভণ্ডামি বলে মনে করত। এই মানসিক দূরত্বই তাঁদের বন্ধুত্বের মধ্যে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
14. “চন্দ্রনাথের জীবন এক ট্র্যাজেডি” – উক্তিটি ব্যাখ্যা করো। (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: ট্র্যাজেডি ঘটে তখন, যখন কোনো মহান চরিত্রের পতন ঘটে তাঁর নিজেরই কোনো একটি চারিত্রিক ত্রুটির কারণে। চন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে সেই ত্রুটি ছিল তাঁর ‘অতিরিক্ত দম্ভ’ ও ‘অমনীয়তা’। তিনি মেধাবী ও আদর্শবান হওয়া সত্ত্বেও এই কাঠিন্যের কারণে সারাজীবন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রইলেন। নিজের বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তিনি শেষ জীবনে নিঃসঙ্গ এক স্টেশনে ট্রেন থেকে নামেন— যা তাঁর একাকিত্বেরই পরিচয় দেয়। তাঁর সামর্থ্য ও সত্যনিষ্ঠা তাঁকে প্রাপ্য সম্মান ও শান্তি দেয়নি, বরং দিয়েছিল এক দুঃসহ নিঃসঙ্গতা। এই বিড়ম্বিত পরিণতিই তাঁর জীবনকে একটি গভীর ট্র্যাজেডিতে পরিণত করেছে।
15. কথক নরেশ কেন চন্দ্রনাথকে ভুলতে পারেননি? (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: কথক নরেশ তাঁর জীবনে অনেক মানুষের সংস্পর্শে এলেও চন্দ্রনাথের মতো প্রভাব কারোর থেকে পাননি। চন্দ্রনাথের সেই প্রশস্ত ললাটের অগ্নিকণা, তাঁর জ্যোতির্ময় চোখ এবং তাঁর অদম্য ব্যক্তিসত্ত্বা কথকের মনে এক স্থায়ী দাগ কেটে দিয়েছিল। চন্দ্রনাথ সাধারণের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার মতো মানুষ ছিলেন না। তাঁর চরিত্রের কাঠিন্য ও সততা নরেশের কাছে এক আদর্শ বা বিস্ময় হয়ে ছিল। দীর্ঘ পনেরো বছর পরও তাই চন্দ্রনাথের কথা নরেশের মনে সজীব ছিল এবং পনেরো বছর পর দেখা হওয়া মাত্রই তিনি তাঁকে চিনতে পেরেছিলেন।