সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, ছন্দে শুধু কান রাখো – অজিত দত্ত, রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর
ছন্দে শুধু কান রাখো: বড় প্রশ্নোত্তর (মান: 5)
1. “সব কিছুতেই ছন্দ আছে”—কবি এই কবিতায় ছন্দের যে বৈচিত্র্য দেখিয়েছেন তা আলোচনা করো। (5)
উত্তর দেখো
• প্রকৃতির ছন্দ: কবি দেখিয়েছেন যে **ঝড়-বৃষ্টির মাতম**, দিন-দুপুরে **পাখির কলকাকলি**, ঝরনার কলধ্বনি এবং রাতের বেলা **ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের** মধ্যে এক অপূর্ব ছন্দ লুকিয়ে আছে। এমনকি জোছনা ও রোদের আলো-ছায়ার খেলার মধ্যেও তিনি সুক্ষ্ম ছন্দের উপস্থিতি টের পান।
• যান্ত্রিক ও গতিশীল ছন্দ: কেবল প্রকৃতি নয়, মানুষের তৈরি যন্ত্রের মধ্যেও ছন্দ আছে। **রেলগাড়ির চাকা**, মোটরের ঘূর্ণন এবং **ঘড়ির কাঁটার বিরামহীন ‘খটখট’** শব্দের মাধ্যমে কবি সময়ের গতিশীল ছন্দকে তুলে ধরেছেন।
• জলের ছন্দ: নদীর স্রোতে **নৌকা চলার সময়** জলের যে ‘ছলাৎ ছলাৎ’ শব্দ হয়, তার মধ্যেও কবি এক নিশ্চিত ছন্দ খুঁজে পেয়েছেন।
পরিশেষে বলা যায়, কবি এই কবিতায় প্রমাণ করেছেন যে আমরা যদি **মন ও কান সজাগ রাখি**, তবে মহাবিশ্বের এই **অখণ্ড ও বিচিত্র ছন্দকে** অনুভব করতে পারব।
2. “জীবন হবে পদ্যময়”—জীবনকে পদ্যময় করতে হলে কবি কোন কোন্ শর্ত পালন করতে বলেছেন? (5)
উত্তর দেখো
• দ্বন্দ্ব ও কলহ ত্যাগ: কবি প্রথমেই বলেছেন **মন্দ কথায় কান না দিতে** এবং সব রকম **দ্বন্দ্ব বা ঝগড়া থেকে মনকে সরিয়ে নিতে**। কারণ মানুষের মন যদি বিদ্বেষ বা বিবাদে আচ্ছন্ন থাকে, তবে সে জীবনের আনন্দময় সুরটি শুনতে পাবে না।
• মনঃসংযোগ ও একাগ্রতা: প্রকৃতির প্রতিটি ক্ষুদ্র জিনিসের মধ্যেও ছন্দ আছে। সেই ছন্দকে অনুভব করতে হলে **কান পেতে সজাগ থাকতে হবে** এবং মনের গভীর থেকে তা উপলব্ধি করতে হবে।
• প্রকৃতির সাথে একাত্মতা: ঝড়, বৃষ্টি, জোছনা বা পাখির ডাক—এসবের মধ্যে যে জীবন রয়েছে, তার সাথে **হৃদয়ের যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে**। জগতের ছন্দকে চিনতে পারলে মনের সকল জট বা জটিলতা কেটে যায়।
কবির বিশ্বাস, যখন মানুষ এই **জাগতিক ছন্দের সাথে নিজের মনকে মিলিয়ে দিতে পারবে**, তখনই তার জীবন সার্থক হবে এবং জীবন একটি **সুন্দর ও ছন্দবদ্ধ পদ্যের মতো** আনন্দময় হয়ে উঠবে।
3. “পদ্য লেখা সহজ নয়”—পদ্য লেখা কেন সহজ নয়? সার্থক পদ্য রচনার উপায় কবি কীভাবে বাতলেছেন? (5)
উত্তর দেখো
• কেন সহজ নয়: যারা কেবল কলহ, বিবাদ আর মন্দ কথার মধ্যে নিজেদের ডুবিয়ে রাখে, তারা প্রকৃতির সুক্ষ্ম তাল ও লয় বুঝতে পারে না। **মন যদি দ্বন্দ্বে মগ্ন থাকে**, তবে বিশ্বের স্পন্দন অনুভূত হয় না। আর এই **ছন্দহীন মনে** পদ্য বা কবিতা সৃষ্টি করা প্রায় অসম্ভব।
• সার্থক পদ্য রচনার উপায়: কবি জানিয়েছেন যে সার্থক পদ্য লিখতে হলে—
১. **কান ও মনকে সজাগ রেখে** প্রকৃতির ছন্দে ডুব দিতে হবে।
২. ঝরনার গান, বৃষ্টির শব্দ বা ঘড়ির কাঁটার ধ্বনি—এসবের মধ্যে যে **গভীর জীবনের সুর** আছে, তাকে অনুভব করতে হবে।
৩. যখন মানুষ জগতকে ছন্দের মাধ্যমে চিনবে, তখন তার মনের মধ্যে **সহজ ও আনন্দের সঞ্চার হবে**।
কবির মতে, যখন অন্তরের কান দিয়ে **বিশ্ব-ছন্দকে স্পর্শ করা যায়**, তখনই পদ্য লেখা সহজ হয় এবং সেই সৃষ্টি সার্থক ও কালজয়ী হয়ে ওঠে।
4. “চিনবে তারা ভুবনটাকে/ছন্দ সুরের সংকেতে”—ভুবনটাকে ‘ছন্দ সুরের সংকেতে’ চেনার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো। (5)
উত্তর দেখো
• সংকেতের অর্থ: প্রকৃতিতে যা কিছু ঘটে, তা কোনো বিশৃঙ্খল ঘটনা নয়। সূর্যোদয়, জোছনা, বৃষ্টির পতন বা ঘড়ির চলন—সবই এক **নির্দিষ্ট সংকেত বা ছন্দ অনুসরণ করে**। এই সংকেত হলো সৃষ্টির মূল ভিত্তি।
• চেনার উপায়: আমরা সাধারণত জগতকে দেখি বাইরের রূপ বা প্রয়োজনে। কিন্তু যারা **ছন্দ ও সুরের প্রতি মনোযোগী**, তারা জগতের ভেতরের প্রাণস্পন্দন বুঝতে পারে। পাখির ডাক বা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ তাদের কাছে স্রেফ আওয়াজ নয়, বরং **মহাবিশ্বের কথোপকথন**।
• ফলাফল: যারা এই সংকেতগুলো ধরতে পারে, তাদের কাছে জগতের সকল রহস্য উন্মোচিত হয়। তারা বুঝতে পারে যে **ভুবনটা নিছক জড় পদার্থ নয়**, বরং এটি একটি ছন্দময় জীবন্ত সত্তা।
এর ফলে মানুষের মন **সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়** এবং সে জগতের প্রতিটি ধূলিকণার মধ্যে এক **অপার আনন্দ ও ছন্দের অস্তিত্ব** খুঁজে পায়। এটাই হলো জগতকে ছন্দের সংকেতে চেনার সার্থকতা।
5. “ছন্দে শুধু কান রাখো” কবিতার নামকরণ কতটা সার্থক হয়েছে বলে তুমি মনে করো? (5)
উত্তর দেখো
• বিষয়বস্তু অনুযায়ী: পুরো কবিতা জুড়ে কবি বারবার পাঠকদের অনুরোধ করেছেন **ছন্দের প্রতি মনোযোগী হতে**। তিনি দেখিয়েছেন যে আমাদের চারপাশের তুচ্ছাতিতুচ্ছ জিনিসেও ছন্দ আছে। এই ছন্দই বিশ্বপ্রকৃতিকে পরিচালিত করছে।
• ব্যঞ্জনধর্মিতা: ‘কান রাখা’ শব্দটির মাধ্যমে কবি কেবল শোনার কথা বলেননি, বরং **গভীর মনোযোগ ও অনুভবের** কথা বলেছেন। মন্দ কথা ও বিবাদ ত্যাগ করে সুন্দরের প্রতি বা ছন্দের প্রতি কান রাখাই হলো কবির মূল বার্তা।
• নামকরণের সার্থকতা: কবিতার প্রথম চরণ থেকে শেষ চরণ পর্যন্ত এই ‘ছন্দ’ ও ‘কান রাখা’র বিষয়টিই ফিরে ফিরে এসেছে। কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে আমাদের জীবনের **শান্তি ও আনন্দ** নির্ভর করে আমরা কতটা প্রকৃতির ছন্দের সাথে তাল মেলাতে পারছি তার ওপর।
কবিতাটির মূল উপদেশ ও বিষয়বস্তু যেহেতু এই ছন্দের অনুভবের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, তাই **”ছন্দে শুধু কান রাখো” নামকরণটি অত্যন্ত সার্থক ও সার্থকতর হয়েছে**।