মকটেস্ট বেছে নাও

অফলাইন মকটেস্ট

খুব শীঘ্রই আপলোড হবে!

সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, বঙ্গভূমির প্রতি – মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর

বঙ্গভূমির প্রতি: বিস্তারিত বড় প্রশ্নোত্তর (মান: 5)

1. “রেখ মা দাসেরে মনে”—এখানে কবি নিজেকে ‘দাস’ বলেছেন কেন? তাঁর এই আকুল প্রার্থনার মধ্য দিয়ে গভীর স্বদেশপ্রেমের যে পরিচয় পাওয়া যায় তা বুঝিয়ে দাও।

উত্তর দেখো

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতায় নিজেকে জন্মভূমি রূপী জননীর এক **অনুগামী সেবক বা ‘দাস’** হিসেবে কল্পনা করেছেন। কবি যখন প্রবাসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তাঁর মনে এক গভীর অনুশোচনা জেগেছে। তিনি মনে করেন, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মোহে পড়ে তিনি দেশমাতৃকাকে অবহেলা করেছেন, তাই তিনি অত্যন্ত বিনম্রভাবে মায়ের চরণে নিজেকে সঁপে দিয়ে এই দাসত্বের পরিচয় দিয়েছেন।

কবির এই প্রার্থনার মধ্য দিয়ে তাঁর **ঐকান্তিক স্বদেশপ্রেম** মূর্ত হয়ে উঠেছে। তিনি যশের কাঙাল নন, বরং তিনি চান দেশমাতা যেন তাঁর দোষগুলি ক্ষমা করে তাঁকে হৃদয়ে স্থান দেন। কবি জানেন যে তিনি এক নশ্বর শরীরের অধিকারী, কিন্তু মাতৃভূমির স্মৃতিতে বেঁচে থাকাই তাঁর কাছে পরম সার্থকতা। তিনি মায়ের কাছে কোনো ঐশ্বর্য চাননি, চেয়েছেন কেবল **মায়ের মনে একটু জায়গা**। বিদেশের মাটিতে যাওয়ার সময়ও তাঁর মন পড়ে আছে বাংলার মাটিতে—এই গভীর মমত্ববোধ ও আত্মসমর্পণই তাঁর দেশপ্রেমের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ।

2. “জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে?”—পঙ্ক্তিটির প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে কবির জীবনদর্শন ও নশ্বরতা সম্পর্কে ধারণাটি আলোচনা করো।

উত্তর দেখো

উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটির মাধ্যমে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত জীবনের এক **অমোঘ ও অপ্রিয় সত্যকে** তুলে ধরেছেন। প্রবাসে যাওয়ার আগে কবির মনে হয়েছে যে মানুষের জীবন অত্যন্ত অনিশ্চিত। এই প্রেক্ষাপটেই তিনি জীবনের নশ্বরতা নিয়ে আলোকপাত করেছেন।

কবির জীবনদর্শনে মৃত্যু হলো এক অনিবার্য পরিণতি। তিনি মানুষের জীবনকে **পদ্মপাতার অস্থির শিশিরবিন্দুর** সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা সামান্য বাতাসে বা সূর্যের তাপে বিলীন হয়ে যায়। মানুষের এই সুগঠিত শরীর বা ‘তনু’ চিরস্থায়ী নয়, এটি একদিন পঞ্চভূতে বিলীন হবেই। কবির মতে, জগতসংসারে কেউই চিরকাল বেঁচে থাকতে পারে না। তবে এই নশ্বরতার মাঝেও কবি এক **বিকল্প অমরত্বের** সন্ধান করেছেন। তিনি মনে করেন, শারীরিক মৃত্যু ঘটলেও যদি কেউ দেশমাতৃকার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে পারে এবং **মানুষের হৃদয়ে গুণী হিসেবে স্মরণীয়** হতে পারে, তবেই সে প্রকৃত অমরত্ব লাভ করে। এই আধ্যাত্মিক ও যুক্তিবাদী জীবনদর্শনই পঙ্ক্তিটির মূল প্রতিপাদ্য।

3. “মধুহীন করো না গো, তব মনঃ-কোকনদে”—এখানে কবি কেন নিজেকে ‘মধুহীন’ না করার আর্তি জানিয়েছেন? নামের সার্থকতা ও ব্যঞ্জনা বুঝিয়ে লেখো।

উত্তর দেখো

‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতায় কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর নিজের নামের ব্যঞ্জনা ব্যবহার করে এক অপূর্ব কাব্যের সৃষ্টি করেছেন। এখানে ‘মধু’ শব্দটির প্রয়োগ দ্ব্যর্থবোধক। আক্ষরিক অর্থে মধু হলো পদ্মফুলের রস বা নির্যাস, যা ছাড়া ফুলের অস্তিত্ব ম্লান হয়ে যায়। অলঙ্কারিক অর্থে কবি এখানে তাঁর নিজের নাম **‘মধুসূদন’**-কে ইঙ্গিত করেছেন।

কবি ভয় পাচ্ছেন যে প্রবাসে থাকার সময় বা মৃত্যুর পর হয়তো দেশমাতা তাঁকে বিস্মৃতির অতলে পাঠিয়ে দেবেন। তাই তিনি দেশজননী রূপী মায়ের কাছে প্রার্থনা করেছেন যেন মা তাঁর মনরূপ লাল পদ্ম বা **‘মনঃ-কোকনদ’** থেকে তাঁর এই প্রিয় সন্তানকে দূরে ঠেলে না দেন। তিনি চান মা যেন তাঁর দোষত্রুটি মার্জনা করে তাঁকে নিজের হৃদয়ে অমর করে রাখেন। কবি নিজেকে এক অপরাধী সন্তান মনে করলেও মায়ের স্নেহের ওপর তাঁর অগাধ বিশ্বাস রয়েছে। তিনি বাঙালির স্মৃতিতে চিরকাল **মধু হয়ে মিশে থাকতে চান** বলেই এমন আর্তি জানিয়েছেন। নামের সার্থকতা ও ব্যাকুলতা মিলিয়ে এটি কবিতার অন্যতম একটি আবেগময় অংশ।

4. ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতায় কবি কেন যমরাজ বা শমনকেও ভয় পান না? ‘অমৃত-হ্রদ’ ও ‘মক্ষিকা’র উদাহরণের মাধ্যমে কবির এই সাহসিকতা ব্যাখ্যা করো।

উত্তর দেখো

সাধারণত মৃত্যু বা যমরাজের নাম শুনলে মানুষ আতঙ্কিত হয়, কিন্তু কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত এখানে এক অনন্য চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে দেশমাতা যদি তাঁকে মনে রাখেন এবং তাঁর দোষগুলি ক্ষমা করেন, তবে তিনি **মৃত্যু বা শমনকে বিন্দুমাত্র ভয় পান না**।

কবি তাঁর এই সাহসিকতাকে একটি চমৎকার উপমার সাহায্যে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো সামান্য মাছি বা **‘মক্ষিকা’** যদি ভুল করে **‘অমৃত-হ্রদে’** পড়ে যায়, তবে সে আর মরে না, বরং চিরস্থায়ী জীবন বা অমরত্ব লাভ করে। একইভাবে কবি নিজেকে এক নগণ্য মক্ষিকা হিসেবে তুলনা করেছেন এবং বঙ্গভূমির স্মৃতি ও আশীর্বাদকে অমৃত-হ্রদ হিসেবে কল্পনা করেছেন। কবি বিশ্বাস করেন যে, দেশজননী যদি তাঁকে আশীর্বাদ দান করেন এবং হৃদয়ে স্থান দেন, তবে তাঁর শারীরিক মৃত্যু ঘটলেও তিনি **স্মৃতির মন্দিরে অমর হয়ে থাকবেন**। এই চিরন্তন স্মৃতিতে বেঁচে থাকার আশ্বাসে কবি মৃত্যুকে জয় করেছেন।

5. “বর দেহ দাসে, বরদে”—কবি কার কাছে এবং কী আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছেন? তাঁর এই প্রার্থনার যৌক্তিকতা আলোচনা করো।

উত্তর দেখো

কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর মমতাময়ী জন্মভূমি বঙ্গদেশ বা **বঙ্গজননীর কাছে** এই আশীর্বাদ বা বর প্রার্থনা করেছেন। ‘বরদে’ বলতে তিনি আশীর্বাদদাত্রী জন্মভূমিকে সম্বোধন করেছেন। কবির একমাত্র প্রার্থনা হলো তিনি যেন **অমরত্বের আশীর্বাদ** লাভ করেন।

এই প্রার্থনার যৌক্তিকতা কবির প্রবাস জীবন ও অতীত ভুলের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। কবি একসময় পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রলোভনে পড়ে নিজের দেশ ও ভাষাকে অবজ্ঞা করেছিলেন। কিন্তু প্রবাসে গিয়ে তিনি নিজের শিকড়কে নতুনভাবে অনুভব করেন। তিনি বুঝতে পারেন যে বিদেশের মাটিতে তাঁর পরিচয় কেবলই এক আগন্তুক। তাই তিনি চান তাঁর **দোষগুলি যেন বাঙালির স্মৃতি থেকে মুছে যায়** এবং তিনি যেন তাঁর কাব্যকীর্তির মাধ্যমে প্রতিটি বাঙালির মনে স্থান পান। তাঁর এই প্রার্থনা কোনো স্বার্থপরতা নয়, বরং **মাতৃভূমির প্রতি তাঁর চিরকালীন আনুগত্য ও ভালোবাসার** এক বিনম্র প্রকাশ। তিনি অমর হতে চেয়েছেন যাতে তিনি চিরকাল বঙ্গভূমির সেবা করে যেতে পারেন।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার