সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, স্মৃতিচিহ্ন – কামিনী রায়, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
অধ্যায়: স্মৃতিচিহ্ন
(দীর্ঘ / রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 4)
নিচের প্রশ্নগুলির প্রাসঙ্গিক ও বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. ‘স্মৃতিচিহ্ন’ কবিতায় কবি কাদের ‘মূঢ়’ বলেছেন? তাদের কেন ‘মূঢ়’ বলা হয়েছে?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘স্মৃতিচিহ্ন’ কবিতায় কবি কামিনী রায় অতীতের সেইসব ক্ষমতাশালী, ধনগর্বী এবং অহংকারী রাজাদের ‘মূঢ়’ বা বোকা বলেছেন।
এই রাজারা ভেবেছিল যে, তারা প্রচুর অর্থ ব্যয় করে ইট-পাথরের বিশাল স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে পৃথিবীর বুকে নিজেদের নাম চিরকালের জন্য অমর করে রেখে যাবে। কিন্তু তাদের এই চিন্তাধারা সম্পূর্ণ অবাস্তব ও ভুল ছিল, তাই কবি তাদের মূঢ় বলেছেন। মহাকালের অমোঘ নিয়মে কোনো ইট বা পাথরের সৌধই চিরস্থায়ী হয় না। সময়ের সাথে সাথে সেইসব বিশাল সৌধ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং সেই অহংকারী রাজাদের নামও পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে গেছে। তাদের এই বৃথা অহংকার এবং অর্থহীন কামনার জন্যই কবি তাদের এমন আখ্যা দিয়েছেন।
2. “কালস্রোতে ধৌত নাম শুভ্র সমুজ্জ্বল” – পংক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: উদ্ধৃত পংক্তিটি কামিনী রায়ের ‘স্মৃতিচিহ্ন’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। এখানে কবি সেইসব মানবদরদি মহান মানুষদের কথা বলেছেন, যাঁরা নিঃস্বার্থভাবে মানুষের কল্যাণ করেন এবং ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষের মনে জায়গা করে নেন।
অহংকারী রাজারা ইট-পাথরের সৌধ নির্মাণ করে নিজেদের নাম অমর করতে চেয়েছিল, কিন্তু কালের স্রোতে তাদের সেই অট্টালিকা ধূলিসাৎ হয়ে যায় এবং তাদের নামও চিরতরে মুছে যায়। অন্যদিকে, যারা সাধারণ মানুষকে ভালোবেসে তাদের হৃদয়ে স্থান করে নেয়, কালস্রোত তাদের নাম মুছতে পারে না। মহাকালের স্রোতে তাদের পুণ্য নাম ধ্বংস না হয়ে বরং মানুষের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তা আরও বেশি পবিত্র, উজ্জ্বল এবং চিরস্থায়ী হয়ে ওঠে।
3. ‘স্মৃতিচিহ্ন’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: সাহিত্যের নামকরণের মাধ্যমে তার বিষয়বস্তু বা মূল ভাবের সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। কামিনী রায়ের এই কবিতার নাম ‘স্মৃতিচিহ্ন’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সমগ্র কবিতাটিতে ক্ষমতালোভী মানুষের তৈরি পাথরের স্মৃতিচিহ্ন এবং মানবদরদি মানুষের ভালোবাসার স্মৃতিচিহ্নের মধ্যে একটি সুন্দর তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। অহংকারী রাজারা ইট-পাথরের স্মৃতিসৌধ বানিয়ে নিজেদের অমর করতে চেয়েছিল, যা কালস্রোতে ধ্বংস হয়ে আজ ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, মহান মানুষেরা নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও সৎকর্মের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে যে স্মৃতিচিহ্ন বা সিংহাসন তৈরি করেন, তা চিরকাল অমলিন থাকে। যেহেতু মানবজীবনের এই দুই ভিন্ন প্রকার স্মৃতিচিহ্নের স্থায়িত্ব এবং পরিণতি নিয়েই কবিতার মূল আলোচনা আবর্তিত হয়েছে, তাই ‘স্মৃতিচিহ্ন’ নামকরণটি সর্বাঙ্গসুন্দর ও সার্থক হয়েছে।
4. ‘স্মৃতিচিহ্ন’ কবিতায় মানবজীবনের কোন্ অমোঘ সত্যটি ফুটে উঠেছে তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো。
উত্তর দেখো
উত্তর: কবি কামিনী রায় তাঁর ‘স্মৃতিচিহ্ন’ কবিতায় মানবজীবনের অত্যন্ত গভীর এবং অমোঘ একটি সত্য তুলে ধরেছেন।
মানুষ নিজের বাহুবল, ক্ষমতা বা ধনের অহংকারে ইট-পাথরের বিশাল সৌধ বানিয়ে নিজেকে পৃথিবীতে চিরকালের জন্য অমর করে রাখতে পারে না। কারণ, সময়ের প্রবল স্রোতে পাথরের ইমারতও একদিন ভেঙে মাটিতে মিশে যায় এবং তার সাথে সাথে অহংকারী মানুষের নাম ও স্মৃতিও চিরতরে বিলুপ্ত হয়। পৃথিবীতে মানুষের একমাত্র শ্রেষ্ঠ এবং স্থায়ী পরিচয় হলো তার নিঃস্বার্থ সৎকর্ম এবং ভালোবাসা। মানুষের সেবার মাধ্যমে যারা সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করতে পারে, একমাত্র তারাই কালের সীমানা পেরিয়ে পৃথিবীতে প্রকৃত অমরত্ব লাভ করে। মানবজীবনের এই চরম বাস্তব সত্যটিই কবিতায় সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
5. পাথরের স্মৃতিসৌধ এবং মানুষের মনের সিংহাসন—এই দুটির মধ্যে কবি কোনটিকে শ্রেষ্ঠ বলেছেন এবং কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: পাথরের স্মৃতিসৌধ এবং মানুষের মনের সিংহাসন—এই দুটির মধ্যে কবি কামিনী রায় মানুষের মনের সিংহাসন বা মানব-হৃদয়-ভূমিকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বলেছেন।
এর প্রধান কারণ হলো, পাথরের স্মৃতিসৌধ যতই বিশাল এবং ব্যয়বহুল হোক না কেন, তা আসলে একটি প্রাণহীন জড় বস্তু। মহাকালের অমোঘ নিয়মে এবং সময়ের স্রোতে তা একদিন ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে এবং তার সাথে জড়িয়ে থাকা নামও চিরতরে মুছে যাবে। অন্যদিকে, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, মানবকল্যাণ ও সৎকর্মের মাধ্যমে মানুষের মনে যে সিংহাসন বা স্থান তৈরি হয়, তা মহাকালের স্রোতেও অবিনশ্বর থাকে। সাধারণ মানুষের এই অকৃত্রিম শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা দিয়ে তৈরি সিংহাসন কখনোই ধ্বংস হয় না, তা কালস্রোত পেরিয়েও চিরকাল অমর থাকে। তাই মানুষের মনের সিংহাসনই হলো প্রকৃত শ্রেষ্ঠ।