সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, বইটই – অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
অধ্যায়: বইটই
(দীর্ঘ / রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 4)
নিচের প্রশ্নগুলির প্রাসঙ্গিক ও বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. ‘বইটই’ প্রবন্ধ অবলম্বনে বই পড়ার আনন্দ এবং উপযোগিতা সম্পর্কে লেখকের মতামত নিজের ভাষায় আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর ‘বইটই’ প্রবন্ধে বই পড়ার আনন্দ এবং উপযোগিতাকে অত্যন্ত সাবলীল ও আন্তরিক ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন।
লেখকের মতে, মানুষের জীবনে যখন চারপাশের কোলাহল থেমে যায় এবং সে নিঃসঙ্গ বোধ করে, তখন বই-ই হয়ে ওঠে তার শ্রেষ্ঠ ও অকৃত্রিম বন্ধু। বইয়ের জগৎ এক অদ্ভুত জাদুকরী জগৎ। পড়ার উপযোগিতা বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক বলেছেন, বই আমাদের এক জায়গায় বসেও সারা বিশ্ব ঘুরিয়ে দেখাতে পারে। ভ্রমণকাহিনি আমাদের অজানাকে জানার আনন্দ দেয়। ইতিহাসের বই আমাদের টাইম-মেশিনের মতো অতীত যুগে নিয়ে যায়। বিজ্ঞানের বই মনকে করে তোলে কুসংস্কারমুক্ত ও যুক্তিবাদী, আর কবিতার বই অন্তরের সূক্ষ্ম আবেগ ও কল্পনাকে জাগিয়ে তোলে।
পরীক্ষার পড়ার মতো এখানে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নিজের আনন্দের জন্য পড়া বই মানুষের মনকে সতেজ করে, তাকে বিশ্বসভ্যতার সঞ্চিত জ্ঞানের উত্তরাধিকারী করে তোলে এবং সর্বোপরি জীবনকে এক পরম তৃপ্তিতে ভরিয়ে দেয়।
2. “আমরা বিশ্বসভ্যতার সঞ্চিত জ্ঞানের উত্তরাধিকারী” – উদ্ধৃতিটির আলোকে লেখকের এই মন্তব্যের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: প্রসঙ্গ: আলোচ্য উদ্ধৃতিটি প্রখ্যাত সাহিত্যিক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত রচিত ‘বইটই’ প্রবন্ধ থেকে নেওয়া হয়েছে। মানুষের জীবনে বই পড়ার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়েই লেখক এই মন্তব্যটি করেছেন।
তাৎপর্য বিশ্লেষণ: মানবসভ্যতার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ যা কিছু আবিষ্কার করেছে, যা কিছু ভেবেছে বা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তার সমস্তটাই বইয়ের পাতায় যত্ন করে লিপিবদ্ধ আছে। পূর্বপুরুষেরা তাঁদের অর্জিত জ্ঞান ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্য বইয়ের মাধ্যমেই রেখে গেছেন। একটি লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার হলো সেই মহতী মিলনক্ষেত্র, যেখানে অতীত ও বর্তমানের শ্রেষ্ঠ মানুষেরা তাঁদের অমর কীর্তির মাধ্যমে বেঁচে থাকেন। আমরা যখন কোনো বই পড়ি, তখন আসলে আমরা সেই হাজার বছরের সঞ্চিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারে প্রবেশ করি। পৈতৃক সম্পত্তির মতো এই বিশ্বজ্ঞানও আমাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এক অমূল্য সম্পদ। বই পড়ার মাধ্যমেই আমরা এই জ্ঞানভাণ্ডারের প্রকৃত উত্তরাধিকারী হয়ে উঠতে পারি, লেখকের এই মন্তব্যের মূল সুর এটাই।
3. পরীক্ষার পড়া আর আনন্দের জন্য পড়া—এই দুইয়ের মধ্যে লেখক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত কী ধরনের পার্থক্য নির্দেশ করেছেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘বইটই’ প্রবন্ধে লেখক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত ‘পরীক্ষার পড়া’ এবং ‘আনন্দের জন্য পড়া’-র মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ও মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য তুলে ধরেছেন।
পরীক্ষার পড়া: লেখকের মতে, পরীক্ষার পড়া হলো এক ধরনের বাধ্যবাধকতা বা চাপ। নির্দিষ্ট সিলেবাস শেষ করার এবং পরীক্ষায় পাশ করে ডিগ্রি লাভের একটি যান্ত্রিক উদ্দেশ্য এর পিছনে কাজ করে। এই পড়া অনেকটা জোর করে গেলার মতো, যেখানে স্বাধীন চিন্তার সুযোগ কম থাকে এবং পরীক্ষা শেষ হলেই অনেক সময় পড়ার বিষয়বস্তু মন থেকে মুছে যায়।
আনন্দের জন্য পড়া: অন্যদিকে, আনন্দের জন্য বই পড়ার মধ্যে কোনো বাধ্যবাধকতা বা সিলেবাসের গণ্ডি নেই। এটি সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত এবং স্বাধীন। নিজের আগ্রহে যখন কেউ গল্পের বই, কবিতার বই বা ভ্রমণকাহিনি পড়ে, তখন সে এক অনাবিল মানসিক তৃপ্তি লাভ করে। এই পড়া মনকে পুষ্টি জোগায়, চিন্তাশক্তিকে প্রসারিত করে এবং সেই বইয়ের আবেদন মানুষের মনে চিরস্থায়ী হয়ে থাকে।
4. ‘বইটই’ প্রবন্ধে বিভিন্ন বিষয়ের বই (ভ্রমণ, ইতিহাস, বিজ্ঞান, কবিতা, অভিধান) সম্পর্কে লেখকের যে বিচিত্র অনুভূতির কথা প্রকাশ পেয়েছে, তা সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর ‘বইটই’ প্রবন্ধে অত্যন্ত সাবলীলভাবে বুঝিয়েছেন যে প্রতিটি বিষয়ের বই পাঠকের মনে আলাদা আলাদা জগৎ তৈরি করে:
১. ভ্রমণকাহিনি: এই বইগুলো আমাদের চার দেওয়ালের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে দূর-দূরান্তের অজানা দেশ, নদী ও পাহাড়ে মানসিকভাবে ঘুরিয়ে আনে।
২. ইতিহাসের বই: ইতিহাস আমাদের টাইম-মেশিনের মতো অতীত যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আমরা মৃত সভ্যতা এবং সেকালের মানুষদের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাই।
৩. বিজ্ঞানের বই: বিজ্ঞান আমাদের চারপাশের বিশ্বরহস্যকে ভেদ করতে সাহায্য করে এবং মনকে কুসংস্কারমুক্ত করে যুক্তিবাদী হতে শেখায়।
৪. কবিতার বই: কবিতা সরাসরি পাঠকের হৃদয়ে আবেদন করে। এটি মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা সূক্ষ্ম অনুভূতি, অকৃত্রিম আবেগ এবং কল্পনাকে জাগ্রত করে।
৫. অভিধান বা ডিকশনারি: লেখক জানিয়েছেন, ডিকশনারি শুধু অর্থ খোঁজার নীরস বই নয়। এটি পড়লে শব্দের জন্ম-ইতিহাস, বিবর্তন এবং ভাষার বিচিত্র রূপ জানার এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ লাভ করা যায়।