সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, নজরুলের গান – রামকুমার চট্টোপাধ্যায়, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
অধ্যায়: কাজী নজরুলের গান
(দীর্ঘ / রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 4)
নিচের প্রশ্নগুলির প্রাসঙ্গিক ও বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. ‘কাজী নজরুলের গান’ গদ্যাংশটিতে কাজী নজরুল ইসলাম এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর যে অনবদ্য বর্ণনা রয়েছে, তা নিজের ভাষায় লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘কাজী নজরুলের গান’ গদ্যাংশে পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দুই মহানায়কের অত্যন্ত জীবন্ত বর্ণনা ফুটে উঠেছে। লেখক ছোটবেলায় কলকাতার হেদুয়ার এক স্বদেশি মিটিংয়ে গিয়ে তাঁদের খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন।
মঞ্চে ওঠার পর কাজী নজরুল ইসলামের চেহারা এবং গাওয়ার ভঙ্গি ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তাঁর মুখভর্তি পান ছিল এবং গলার সঙ্গে একটি হারমোনিয়াম বাঁধা ছিল। এই অবস্থাতেই তিনি চরম আবেগ ও প্রবল উন্মাদনার সঙ্গে গান গাইছিলেন, যা উপস্থিত সকলকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল। নজরুলের গান শেষ হওয়ার পরেই মঞ্চে আসতেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। নেতাজির কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য ও দৃঢ়তা। তিনি তাঁর দরাজ কণ্ঠে অত্যন্ত জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতেন। তাঁর সেই অনুপ্রেরণামূলক কথাগুলো দেশের মানুষের মনে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার অদম্য সাহস এবং গভীর দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দিত।
2. “রক্ত তখন টগবগ করে ফুটছে” – কার রক্ত, কেন টগবগ করে ফুটছিল? এই উত্তেজনার পরিণতি কী হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: আলোচ্য উক্তিটিতে স্বয়ং লেখক রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের রক্ত টগবগ করে ফোটার কথা বলা হয়েছে।
ছোটবেলায় লেখক যখন হেদুয়ার একটি স্বদেশি মিটিংয়ে গিয়েছিলেন, তখন তিনি প্রথমে কাজী নজরুল ইসলামের গাওয়া উদ্দীপনাময় দেশাত্মবোধক গান শোনেন এবং তার ঠিক পরেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দরাজ কণ্ঠের জ্বালাময়ী বক্তৃতা শোনেন। দেশের এই দুই মহান দেশনায়কের গান ও কথার মধ্যে যে অসীম আবেগ এবং দেশপ্রেম লুকিয়ে ছিল, তা ছোট্ট লেখকের মনকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। এই তীব্র উত্তেজনা এবং দেশপ্রেমের জাগরণের ফলেই তাঁর রক্ত টগবগ করে ফুটছিল।
এই উত্তেজনার পরিণতি হিসেবে মিটিং শেষ হওয়ার পর লেখক প্রায় উর্ধ্বশ্বাসে একছুটে নিজের বাড়ি ফিরে আসেন। মনের সেই প্রবল আবেগ এবং উত্তেজনাকে প্রশমিত করার জন্য তিনি তাঁর প্রিয় বাদ্যযন্ত্র তবলাটি টেনে নেন এবং তবলার বোলে ‘দ্রিমি দ্রিমি’ শব্দ তুলে নিজের ভেতরের অনুভূতিকে প্রকাশ করতে শুরু করেন।
3. গদ্যাংশটির নামকরণ ‘কাজী নজরুলের গান’ কতটা সার্থক ও যুক্তিযুক্ত হয়েছে বলে তুমি মনে করো?
উত্তর দেখো
উত্তর: সাহিত্যের নামকরণ সাধারণত তার বিষয়বস্তু বা মূল ভাবের ওপর নির্ভর করে রাখা হয়। রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের এই স্মৃতিচারণমূলক গদ্যাংশটিতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বক্তৃতার কথা থাকলেও, সমগ্র রচনাটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কাজী নজরুল ইসলামের গান এবং তার প্রভাব।
লেখক ছোটবেলায় স্বদেশি মিটিংয়ে গিয়ে নজরুলের গলায় হারমোনিয়াম বেঁধে পান খাওয়া অবস্থায় অসীম উন্মাদনার সঙ্গে গান গাওয়ার দৃশ্যটি দেখে গভীরভাবে আলোড়িত হয়েছিলেন। এই গানের সুর এবং নেতাজির বক্তৃতা মিলে তাঁর মনে যে প্রবল দেশপ্রেম ও উত্তেজনার সঞ্চার করেছিল, তা প্রশমিত করার জন্যই তিনি বাড়ি ফিরে তবলা বাজাতে শুরু করেন। অর্থাৎ, নজরুলের গানই ছিল সেই মূল চালিকাশক্তি, যা লেখকের ভেতরের সুপ্ত সংগীত প্রতিভাকে জাগিয়ে তুলেছিল এবং ভবিষ্যৎ জীবনে তাঁকে একজন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী হওয়ার পথ দেখিয়েছিল। তাই বিষয়বস্তু এবং অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের দিক থেকে বিচার করলে ‘কাজী নজরুলের গান’ নামকরণটি সর্বাঙ্গসুন্দর ও সার্থক হয়েছে।
4. পরাধীন ভারতের স্বদেশি মিটিং-এর পরিবেশ এবং রীতির কেমন পরিচয় গদ্যাংশটিতে পাওয়া যায়?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘কাজী নজরুলের গান’ গদ্যাংশটিতে পরাধীন ভারতের স্বদেশি আন্দোলনের এক অত্যন্ত উদ্দীপনাময় এবং রোমাঞ্চকর পরিবেশের পরিচয় পাওয়া যায়। চারদিকে তখন ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রবল উন্মাদনা। এই মিটিংগুলোতে সাধারণ মানুষের ঢল নামত।
সেকালের এই স্বদেশি মিটিংগুলোর একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং অলিখিত নিয়ম বা রীতি ছিল। তা হলো, মিটিংয়ের প্রধান বক্তা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বক্তৃতা দেওয়ার আগে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে অবশ্যই গান গাইতে হতো। মানুষের মনে এই দুজনের প্রতি এতটাই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ছিল যে, নজরুলের দেশাত্মবোধক গান এবং তার ঠিক পরেই নেতাজির দরাজ কণ্ঠের জ্বালাময়ী বক্তৃতা শোনার জন্য তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত। এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে স্বদেশি সভার পরিবেশ এক অসীম দেশপ্রেম এবং আবেগে পরিপূর্ণ হয়ে উঠত।
5. লেখক রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সংগীত জীবনের অনুপ্রেরণায় এই স্বদেশি সভার ভূমিকা কতখানি বলে তুমি মনে করো?
উত্তর দেখো
উত্তর: লেখক রামকুমার চট্টোপাধ্যায় পরবর্তী জীবনে একজন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী এবং গায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। আমার মতে, তাঁর এই সংগীত জীবনের ভিত গড়ে ওঠার পেছনে ছোটবেলায় শোনা সেই স্বদেশি সভার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীর ভূমিকা রয়েছে।
সেই সভায় কাজী নজরুল ইসলামের গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে পরম উন্মাদনায় গান গাওয়ার দৃশ্যটি লেখকের শিশু মনে এক অমলিন ছাপ ফেলেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, একটি গান কীভাবে হাজার হাজার মানুষের রক্ত গরম করে দিতে পারে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। সেই সভার তীব্র উত্তেজনা প্রশমিত করতেই তিনি বাড়ি ফিরে তাঁর প্রিয় বাদ্যযন্ত্র তবলা বাজাতে শুরু করেছিলেন। অর্থাৎ, সংগীতের অসীম শক্তি এবং তার প্রতি গভীর অনুরাগের প্রথম বীজটি লেখকের মনে এই স্বদেশি সভাতেই রোপিত হয়েছিল, যা পরবর্তীকালে তাঁর শিল্পীসত্তাকে বিকশিত করতে সবচেয়ে বড়ো অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।