নবম শ্রেণি: বাংলা, আকাশে সাতটি তারা – জীবনানন্দ দাশ, ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3
অধ্যায় 12: আকাশে সাতটি তারা
(সংক্ষিপ্ত / ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 3)
নিচের উক্তিগুলির প্রাসঙ্গিক ও বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. “আকাশে সাতটি তারা যখন ফুটে ওঠে আমি এই ঘাসে / বসে থাকি;” – কবি কখন, কোথায় বসে থাকেন? তাঁর মনে তখন কীরূপ অনুভূতির সৃষ্টি হয়? (1+2=3)
উত্তর দেখো
উত্তর: দিনান্তের শেষে সূর্যাস্তের পর যখন সন্ধ্যার আকাশে সাতটি তারা (সপ্তর্ষিমণ্ডল) ফুটে ওঠে, তখন রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ পল্লিপ্রকৃতির বুকে ঘাসের ওপর বসে থাকেন।
এই সময় কবির মনে এক গভীর প্রশান্তি এবং মুগ্ধতার সৃষ্টি হয়। দিনের আলো নিভে গিয়ে যখন ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসে, তখন বাংলার সেই শান্ত, স্নিগ্ধ এবং মায়াময় প্রাকৃতিক রূপ কবিকে গভীরভাবে আচ্ছন্ন করে। তিনি এই অন্ধকারের মধ্যে বাংলার এক নিজস্ব এবং অকৃত্রিম সৌন্দর্য অনুভব করেন।
2. “কামরাঙা লাল মেঘ যেন মৃত মনিয়া পাখির মতো” – এখানে কোন্ মেঘের কথা বলা হয়েছে? তাকে মৃত মনিয়া পাখির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে কেন? (1+2=3)
উত্তর দেখো
উত্তর: এখানে সূর্যাস্তের সময় পশ্চিম আকাশে ভাসমান কামরাঙা ফলের মতো লাল রঙের মেঘের কথা বলা হয়েছে।
মনিয়া পাখি দেখতে খুব সুন্দর এবং প্রাণোচ্ছল হয়। কিন্তু একটি মনিয়া পাখি মারা গেলে তার সেই সৌন্দর্য এবং প্রাণচাঞ্চল্য যেমন ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়, ঠিক তেমনি সূর্যাস্তের সময় আকাশের লাল মেঘও দিনের শেষে তার উজ্জ্বল রং হারিয়ে ক্রমশ ম্লান হয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে যায় বা গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে যায়। রঙের এই বিষণ্ণ পরিণতি বোঝাতেই কবি এমন অভূতপূর্ব তুলনা করেছেন।
3. “আসিয়াছে শান্ত অনুগত / বাংলার নীল সন্ধ্যা” – সন্ধ্যাকে ‘শান্ত অনুগত’ বলা হয়েছে কেন? (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: কালবৈশাখীর ঝড় বা প্রবল বৃষ্টির মতো বাংলার সন্ধ্যা কোনো উগ্র বা ভয়ংকর রূপ নিয়ে আসে না। সূর্যাস্তের পর পল্লিবাংলার বুকে সন্ধ্যা নেমে আসে অত্যন্ত নিঃশব্দে, ধীরে এবং শান্তভাবে। তা যেন এক বাধ্য এবং অনুগত মেয়ের মতো পা টিপে টিপে প্রকৃতির বুকে নিজের বিস্তার ঘটায়। গ্রামবাংলার এই স্নিগ্ধ, নীরব এবং মায়াময় পরিবেশটিকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতেই কবি বাংলার নীল সন্ধ্যাকে ‘শান্ত অনুগত’ বলে বর্ণনা করেছেন।
4. “কেশবতী কন্যা যেন এসেছে আকাশে:” – ‘কেশবতী কন্যা’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? এমন বর্ণনার কারণ কী? (1+2=3)
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘কেশবতী কন্যা’ বলতে কবি জীবনানন্দ দাশ পল্লিবাংলার আকাশে ধীরে ধীরে নেমে আসা শান্ত, স্নিগ্ধ এবং মায়াময় অন্ধকার বা সন্ধ্যাকে বুঝিয়েছেন।
দিন শেষের পর যখন চারদিকে অন্ধকার নেমে আসে, তখন প্রকৃতির সেই কালো রূপকে কবির মনে হয়েছে যেন এক রূপসী নারীর এলোমেলো খোলা চুল। একজন নারী যেমন তার কালো দীর্ঘ কেশ বা চুল ছড়িয়ে দিলে চারদিক ঢেকে যায়, তেমনি বাংলার আকাশেও যেন অন্ধকার এক কেশবতী কন্যার চুলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত প্রকৃতিকে ঢেকে দেয়।
5. “আমার চোখের ‘পরে আমার মুখের ‘পরে চুল তার ভাসে;” – কার চুল? এর মধ্য দিয়ে কবি কী অনুভব করেছেন? (1+2=3)
উত্তর দেখো
উত্তর: এখানে ‘চুল’ বলতে রূপসী বাংলার আকাশে নেমে আসা সন্ধ্যারূপী কেশবতী কন্যার মেঘবরণ কালো চুলের কথা বলা হয়েছে, যা আসলে সন্ধ্যার অন্ধকার।
কবি যখন পল্লিপ্রকৃতির বুকে ঘাসের ওপর বসে থাকেন, তখন ধীরে ধীরে নেমে আসা অন্ধকার চারপাশ ঢেকে ফেলে। এই অন্ধকারকে কবি কেবল চোখের দৃষ্টি দিয়ে নয়, বরং নিজের সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে স্পর্শ করেন। কবির মনে হয় যেন ওই কেশবতী কন্যার কালো চুল এসে তাঁর চোখ-মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে। এটি প্রকৃতির সঙ্গে কবির এক নিবিড় অতীন্দ্রিয় অনুভূতির পরিচয়।
6. “পৃথিবীর কোনো পথ এ কন্যারে দেখে নি কো” – ‘এ কন্যা’ কে? পৃথিবীর কোনো পথ তাকে দেখেনি কেন? (1+2=3)
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘এ কন্যা’ হলো বাংলার আকাশে নেমে আসা শান্ত, স্নিগ্ধ এবং মায়াময় সন্ধ্যারূপী কেশবতী কন্যা।
কবি জীবনানন্দ দাশ পৃথিবী ঘুরে অনেক রূপ দেখেছেন, কিন্তু তাঁর মনে হয়েছে বাংলার পল্লিপ্রকৃতির মতো এমন অপরূপ স্নিগ্ধতা এবং মাধুর্য পৃথিবীর আর কোথাও নেই। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এমন শান্ত এবং মায়াময় রূপ নিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে না। বাংলার সন্ধ্যার এই অনন্য এবং অকৃত্রিম রূপ কেবল বাংলার আকাশেই দেখা যায় বলেই পৃথিবীর অন্য কোনো পথ এই কন্যাকে দেখেনি বলে কবি মনে করেন।
7. “দেখি নাই অত / অজস্র চুলের চুমা হিজলে কাঁঠালে জামে ঝরে অবিরত,” – ‘চুলের চুমা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? তা কোথায়, কীভাবে ঝরে পড়ে? (1+2=3)
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘চুলের চুমা’ বলতে কবি পল্লিবাংলার বুকে ধীরে ধীরে নেমে আসা সন্ধ্যার অন্ধকারের স্নিগ্ধ এবং মায়াময় স্পর্শকে বুঝিয়েছেন।
সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে যখন চারদিক অন্ধকার হতে শুরু করে, তখন সেই অন্ধকার যেন মেঘবরণ কেশবতী কন্যার ছড়িয়ে দেওয়া চুলের মতো বাংলার পরিচিত হিজল, কাঁঠাল এবং জাম গাছের পাতায় পাতায় অবিরত ঝরে পড়ে। অন্ধকার যেন গভীর ভালোবাসায় প্রকৃতিকে চুম্বন করে ঢেকে দেয়।
8. “জানি নাই এত স্নিগ্ধ গন্ধ ঝরে রূপসীর চুলের বিন্যাসে” – ‘রূপসী’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? তার চুলের বিন্যাসে কীরূপ স্নিগ্ধ গন্ধ ঝরে? (1+2=3)
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘রূপসী’ বলতে এখানে রূপসী বাংলা অর্থাৎ গ্রামবাংলার মায়াময় প্রকৃতি এবং তার আকাশে নেমে আসা সন্ধ্যারূপী কেশবতী কন্যাকে বোঝানো হয়েছে।
সন্ধ্যা নেমে এলেই পল্লিবাংলার প্রকৃতির বুক থেকে এক অদ্ভুত সোঁদা এবং স্নিগ্ধ গন্ধ ভেসে আসে। নরম ধান, জলের কলমি দাম, হাঁসের পালক, শর ঘাস এবং পুকুরের জলের মাছের আঁশটে গন্ধ— এই সবকিছুর এক অপূর্ব মিশ্রণ হলো সেই স্নিগ্ধ গন্ধ, যা অন্ধকার বা রূপসীর চুলের বিন্যাসের আড়াল থেকেই বাংলার বুকে ছড়িয়ে পড়ে।
9. “নরম ধানের গন্ধ—কলমির ঘ্রাণ, হাঁসের পালক, শর,” – এই পঙ্ক্তিটির মধ্য দিয়ে কবি পল্লিবাংলার কোন্ রূপটি ফুটিয়ে তুলেছেন? (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: এই পঙ্ক্তিটির মধ্য দিয়ে কবি জীবনানন্দ দাশ পল্লিবাংলার অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু অকৃত্রিম এবং প্রাণবন্ত রূপটিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। বাংলার প্রকৃতি কেবল তার দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপ দিয়েই নয়, তার নিজস্ব ঘ্রাণ বা গন্ধ দিয়েও মানুষকে আকর্ষণ করে। মাঠের নরম ধান, পুকুরের জলের কলমি লতা, হাঁসের ভেজা পালক এবং শর ঘাসের গন্ধ— এই অত্যন্ত চেনা এবং সাধারণ উপাদানগুলির ঘ্রাণেই বাংলার নিজস্ব সত্তা এবং অকৃত্রিম রূপটি লুকিয়ে আছে, যা পৃথিবীর আর কোথাও মেলে না।
10. “পুকুরের জল, চাঁদা, সরপুঁটিদের / মৃদু আঁশটে ঘ্রাণ” – কবিতায় পল্লিবাংলার যে রূপ, রস ও গন্ধের পরিচয় পাওয়া যায় তা এই পঙ্ক্তির আলোকে লেখো। (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: কবি জীবনানন্দ দাশ কেবল প্রকৃতির বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে তৃপ্ত হননি, তিনি পল্লিবাংলার অত্যন্ত তুচ্ছ এবং সাধারণ উপাদানগুলির মধ্যেও সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছেন। গ্রামবাংলার পুকুরের জলে মিশে থাকা চাঁদা এবং সরপুঁটি মাছের মৃদু আঁশটে গন্ধ সাধারণ মানুষের কাছে তুচ্ছ বা অবহেলার বিষয় হতে পারে, কিন্তু কবির কাছে এই গন্ধই হলো রূপসী বাংলার অকৃত্রিম এবং জীবন্ত সত্তার পরিচয়। এর মাধ্যমেই বাংলার চিরায়ত রূপ, রস এবং মাটির কাছাকাছি থাকা জীবনের পরিচয় ফুটে উঠেছে।
11. “কিশোরীর চাল-ধোয়া ভিজে হাত— শীত হাতখান,” – এই পঙ্ক্তির মাধ্যমে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন? (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: এই পঙ্ক্তির মাধ্যমে কবি পল্লিবাংলার দৈনন্দিন গার্হস্থ্য জীবন এবং প্রকৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। সন্ধ্যাবেলায় গ্রামবাংলার কোনো এক কিশোরী যখন রান্নার জন্য চাল ধোয়, তখন তার হাত জলে ভিজে শীতল বা ঠান্ডা হয়ে যায়। কবির সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয় সেই ভিজে হাতের ঠান্ডা স্পর্শ এবং তার গন্ধকেও বাংলার প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনুভব করেছে। এর মধ্য দিয়ে পল্লিগ্রামের সাধারণ মেয়েদের জীবনযাত্রা এবং বাংলার অকৃত্রিম রূপ অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
12. “কিশোরের পায়ে-দলা মুথাঘাস,” – এর মধ্যে দিয়ে বাংলার প্রকৃতির কোন্ রূপ ধরা পড়েছে? (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: এর মধ্যে দিয়ে পল্লিবাংলার এক চঞ্চল, প্রাণবন্ত অথচ সাধারণ রূপ ধরা পড়েছে। গ্রামের মাঠে-ঘাটে কিশোরেরা যখন খেলাধুলা করে বা দৌড়ে বেড়ায়, তখন তাদের পায়ের চাপে মাঠের মুথা ঘাস পিষ্ট বা দলা পাকিয়ে যায়। সেই পায়ে-দলা ঘাস থেকে যে এক ধরনের বুনো এবং সোঁদা গন্ধ বাতাসে ভেসে আসে, তা গ্রামবাংলার এক অত্যন্ত পরিচিত ঘ্রাণ। কবি বাংলার এই সহজ-সরল শৈশব এবং প্রকৃতির গন্ধকেই নিবিড়ভাবে অনুভব করেছেন।
13. “লাল লাল বটফলের / ব্যথিত গন্ধের ক্লান্ত নীরবতা—” – বটফলের গন্ধকে ‘ব্যথিত’ ও ‘ক্লান্ত নীরবতা’ বলা হয়েছে কেন? (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: বটগাছের লাল লাল ফল পেকে গিয়ে যখন মাটিতে ঝরে পড়ে, তখন সেগুলি ধীরে ধীরে পচে যায় এবং তা থেকে এক ধরনের মৃদু গন্ধ বের হয়। অবহেলিত এবং পদপিষ্ট হয়ে পড়ে থাকা সেই বটফলের এই গন্ধকে কবির কাছে অত্যন্ত ‘ব্যথিত’ বা করুণ বলে মনে হয়েছে। দিনের শেষে পল্লিপ্রকৃতির বুকে নেমে আসা সন্ধ্যার অন্ধকারের যে এক শান্ত, বিষণ্ণ এবং ক্লান্ত নীরবতা রয়েছে, ঝরে পড়া বটফলের এই গন্ধ যেন সেই নীরবতাকেই আরও গভীর করে তোলে।
14. “এরই মাঝে বাংলার প্রাণ:” – ‘এরই মাঝে’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? বাংলার প্রাণ কীভাবে এর মধ্যে লুকিয়ে আছে? (1+2=3)
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘এরই মাঝে’ বলতে পল্লিবাংলার আকাশে নেমে আসা শান্ত সন্ধ্যা এবং ঘাস, পাতা, কলমি, হাঁসের পালক, চাল ধোয়া ভিজে হাত, মুথা ঘাস এবং বটফলের মতো অত্যন্ত সাধারণ এবং চেনা উপাদানগুলির কথা বোঝানো হয়েছে।
কবি মনে করেন, বাংলার প্রকৃত রূপ এবং প্রাণ কোনো বড়ো শহর বা কৃত্রিম আড়ম্বরের মধ্যে নেই। বাংলার আসল প্রাণ স্পন্দিত হয় তার পল্লিপ্রকৃতির এই অত্যন্ত সাধারণ এবং তুচ্ছ উপাদানগুলির গন্ধ এবং স্পর্শের মধ্যে। এই সহজ-সরল এবং অকৃত্রিম জীবনের মাঝেই রূপসী বাংলার আসল সত্তা লুকিয়ে আছে।
15. ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবির প্রকৃতিপ্রেম কীভাবে ফুটে উঠেছে তা সংক্ষেপে লেখো। (3)
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশের গভীর এবং অকৃত্রিম প্রকৃতিপ্রেম ফুটে উঠেছে। তিনি কেবল চোখ দিয়ে নয়, বরং স্পর্শ এবং ঘ্রাণ দিয়ে বাংলার প্রকৃতিকে অনুভব করেছেন। সন্ধ্যাবেলার অন্ধকারকে তিনি এক মায়াময় কেশবতী কন্যা হিসেবে কল্পনা করেছেন এবং নরম ধান, কলমি, পুকুরের জল, কিশোরীর ভিজে হাত ও মুথা ঘাসের গন্ধের মতো অতি সাধারণ উপাদানগুলির মধ্যেই তিনি রূপসী বাংলার আসল প্রাণ ও সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর এই অনুভূতি প্রমাণ করে যে তিনি বাংলার মাটির কতটা কাছাকাছি ছিলেন।