নবম শ্রেণি: বাংলা, ‘ধীবর-বৃত্তান্ত’ – কালিদাস, বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর মান 5
অধ্যায় 2: ধীবর-বৃত্তান্ত
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. ‘ধীবর-বৃত্তান্ত’ নাট্যাংশ অবলম্বনে ধীবর চরিত্রটির বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো। (5)
উত্তর দেখো
মহাকবি কালিদাস রচিত ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম’ নাটকের অন্তর্গত ‘ধীবর-বৃত্তান্ত’ নাট্যাংশের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো আংটি পাওয়া জেলে বা ধীবর। তার চরিত্রের যে উজ্জ্বল দিকগুলি আমাদের মুগ্ধ করে, তা হলো:
- সততা ও নির্ভীকতা: ধীবর অত্যন্ত সৎ এবং নির্ভীক প্রকৃতির মানুষ। রাজরক্ষীরা তাকে চোর অপবাদ দিয়ে মারধর করতে উদ্যত হলেও, সে ভয় পায়নি। সে অত্যন্ত সাহসের সাথে আংটি পাওয়ার সত্য ঘটনাটি বর্ণনা করেছে এবং মাথা উঁচু করে বলেছে— “মারতে হয় মারুন, ছেড়ে দিতে হয় ছেড়ে দিন।”
- পেশার প্রতি সম্মানবোধ: রক্ষীরা তার পেশা নিয়ে তীব্র ব্যঙ্গ করলেও ধীবর লজ্জিত হয়নি। বরং সে দৃঢ়ভাবে জানিয়েছে যে, যে পেশায় মানুষ জন্মায় তা নিন্দনীয় হলেও কখনো ত্যাগ করা উচিত নয়।
- উদারতা ও ক্ষমাশীলতা: ধীবরের চরিত্রের সবচেয়ে বড়ো দিক হলো তার বিশাল হৃদয়। যে রাজশ্যালক ও রক্ষীরা তাকে একটু আগেও চরম অপমান করেছিল, রাজার কাছ থেকে পাওয়া বিপুল পুরস্কারের অর্ধেক অর্থ সে তাদেরই মদের দাম হিসেবে উপহার দেয়। তার এই উদারতা প্রমান করে যে সে কেবল একজন জেলেই নয়, বরং এক বিশাল হৃদয়ের অধিকারী।
2. “যে বৃত্তিতে যে মানুষ জন্মায়, সেই বৃত্তি নিন্দনীয় হলেও তা পরিত্যাগ করা উচিত নয়।” – উক্তিটির আলোকে ধীবরের পেশার প্রতি তার মনোভাব এবং চরিত্রের আত্মসম্মানবোধ বিচার করো। (5)
উত্তর দেখো
রাজরক্ষীরা ধীবরকে ধরে আনার পর নগররক্ষায় নিযুক্ত রাজশ্যালক তার পেশা নিয়ে তীব্র ব্যঙ্গ ও উপহাস করেছিলেন। মাছ মেরে জীবিকা নির্বাহ করাকে তিনি অত্যন্ত হীন ও অপবিত্র কাজ বলে কটাক্ষ করেন। এর উত্তরেই আত্মসম্মানবোধে পরিপূর্ণ ধীবর আলোচ্য উক্তিটি করেছিল।
ধীবর বোঝাতে চেয়েছিল যে, পৃথিবীতে কোনো কাজই ছোটো নয়। জন্মগত পেশা বা বৃত্তি একজন মানুষের পরিচয় বহন করে। নিজের কথার সমর্থনে সে এক বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের উদাহরণ দেয়। একজন ব্রাহ্মণ স্বভাবত দয়ালু হলেও, যজ্ঞের সময় তাকে পশুবলির মতো নিষ্ঠুর কাজ করতে হয়। তাই বলে সে অসাধু হয়ে যায় না। ঠিক তেমনই, মাছ ধরা তার জন্মগত পেশা হলেও, তার চরিত্র কখনো অসৎ বা চোরের নয়।
সমাজের নিচুতলার একজন খেটেখাওয়া মানুষ হয়েও ক্ষমতার দম্ভে মত্ত রাজপুরুষদের মুখের ওপর এমন যুক্তিপূর্ণ কথা বলা ধীবরের গভীর আত্মসম্মানবোধ এবং নিজের কাজের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধারই প্রমাণ দেয়।
3. ‘ধীবর-বৃত্তান্ত’ নাট্যাংশে রাজশ্যালক এবং দুই নগররক্ষী (সূচক ও জানুক)-র চরিত্রের তুলনামূলক আলোচনা করো। (5)
উত্তর দেখো
কালিদাসের ‘ধীবর-বৃত্তান্ত’ নাট্যাংশে রাজশ্যালক এবং দুই নগররক্ষী সূচক ও জানুকের চরিত্রের মধ্যে অহংকার, নিষ্ঠুরতা এবং সুবিধাবাদী মানসিকতার এক নিখুঁত ছবি ফুটে উঠেছে।
নগররক্ষীদের চরিত্র: রক্ষী সূচক এবং জানুক হলো রাজক্ষমতার অহংকারে মত্ত দুই সাধারণ কর্মচারী। তারা কোনো বিচার বিবেচনা ছাড়াই ধীবরকে চোর সাব্যস্ত করে এবং তাকে গালিগালাজ ও মারধর করতে উদ্যত হয়। এমনকি রাজার আদেশের অপেক্ষায় থাকার সময় তারা ধীবরকে শূলে চড়ানোর নিষ্ঠুর কল্পনা করে আনন্দ পাচ্ছিল। এদের মধ্যে সূচক অত্যন্ত অধৈর্য এবং জানুক কিছুটা হিসেবি প্রকৃতির।
রাজশ্যালকের চরিত্র: রাজশ্যালক নগররক্ষার প্রধান হওয়ায় তাঁর মধ্যে ক্ষমতার দম্ভ আরও বেশি ছিল। তিনি ধীবরের পেশাকে তাচ্ছিল্য করে তাকে চরম অপমান করেন। তবে রক্ষীদের থেকে তিনি কিছুটা পরিণত। তিনি অন্তত ধীবরকে নিজের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু সবশেষে, যখন ধীবর তার পুরস্কারের অর্থ তাদের হাতে তুলে দেয়, তখন এই তিনজনেরই সুবিধাবাদী ও ঘুষখোর রূপটি সামনে আসে। তারা নির্লজ্জের মতো সেই অর্থ গ্রহণ করে এবং ধীবরকে পরম বন্ধু হিসেবে বরণ করে নেয়।
4. “আজ থেকে তুমি আমার একজন বিশিষ্ট বন্ধু হলে।” – কীভাবে একজন সাধারণ জেলে রাজশ্যালকের ‘বিশিষ্ট বন্ধু’ হয়ে উঠল, তা নাট্যাংশ অবলম্বনে লেখো। (5)
উত্তর দেখো
রাজকীয় আংটি বিক্রির সময় ধীবরকে চোর সন্দেহে ধরে রাজশ্যালক এবং রক্ষীরা প্রথমে চরম অপমান করেছিল। কিন্তু রাজার আদেশে ধীবর নির্দোষ প্রমাণিত হয় এবং রাজা তাকে বিপুল অর্থ পুরস্কার দেন।
মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসে ধীবর তার এই আনন্দের মুহূর্তে রক্ষীদের ভুলে যায়নি। সে তার পাওয়া মহামূল্যবান পুরস্কারের অর্ধেক ভাগ ফুলের দাম বা মদের দাম হিসেবে রাজশ্যালক ও রক্ষীদের হাতে হাসিমুখে তুলে দেয়। সমাজের উঁচু তলার মানুষদের থেকে পাওয়া চরম অপমানের পরও, একজন সামান্য জেলের এমন উদারতা সত্যিই অভাবনীয় ছিল।
এই অপ্রত্যাশিত বিপুল অর্থ হাতে পেয়ে রাজশ্যালক ও রক্ষীদের মনোভাব সম্পূর্ণ বদলে যায়। তাদের ভেতরের লোভ এবং সুবিধাবাদী মানসিকতা প্রবল হয়ে ওঠে। ধীবরের সততা ও উদারতায় মুগ্ধ হয়ে (এবং মূলত টাকার লোভে) রাজশ্যালক তার সমস্ত অহংকার ভুলে যায় এবং সমাজের নিচুতলার একজন সামান্য জেলেকে নিজের ‘বিশিষ্ট বন্ধু’ হিসেবে সাদরে গ্রহণ করে।
5. ‘ধীবর-বৃত্তান্ত’ নাট্যাংশে সমাজের উঁচু তলার মানুষদের সঙ্গে নিচু তলার সাধারণ মানুষের আচরণের যে বৈপরীত্য বা পার্থক্য ফুটে উঠেছে, তা আলোচনা করো। (5)
উত্তর দেখো
মহাকবি কালিদাসের ‘ধীবর-বৃত্তান্ত’ নাট্যাংশটি নিছক আংটি উদ্ধারের গল্প নয়, এটি তৎকালীন সমাজের শ্রেণিবৈষম্য এবং মানুষের মানসিকতার এক অপূর্ব দলিল।
নাট্যাংশে উঁচু তলার প্রতিনিধি হিসেবে দেখা যায় রাজশ্যালক ও নগররক্ষীদের। তাদের মধ্যে রাজক্ষমতার প্রবল দম্ভ রয়েছে। তারা বিনা বিচারে নিচুতলার একজন ধীবরকে চোর অপবাদ দেয়, গালাগালি করে এবং তার পেশা নিয়ে অমানবিক উপহাস করে। তাদের কাছে মানবিকতার চেয়ে ক্ষমতার আস্ফালনই বড়ো। আবার তারাই যখন ধীবরের কাছ থেকে টাকা পায়, তখন নির্লজ্জের মতো সেই টাকা গ্রহণ করে তাকে বন্ধু বানিয়ে নেয়। এদের চরিত্র হলো লোভী এবং সুবিধাবাদী।
অন্যদিকে, নিচুতলার খেটেখাওয়া মানুষের প্রতিনিধি হলো ধীবর। সে গরিব হলেও তার মধ্যে কোনো লোভ বা অসততা নেই। প্রবল অপমানের মুখে দাঁড়িয়েও সে অত্যন্ত শান্ত, নির্ভীক এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। রাজার দেওয়া বিপুল পুরস্কার সে একা ভোগ না করে, যারা তাকে অপমান করেছিল তাদেরকেই সেই টাকার ভাগ দিয়ে সে নিজের উদারতা ও বিশাল হৃদয়ের পরিচয় দিয়েছে। অর্থাৎ, আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও মানসিকতার দিক থেকে নিচুতলার মানুষ ধীবর উঁচু তলার মানুষদের অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে।