মকটেস্ট বেছে নাও

অফলাইন মকটেস্ট

খুব শীঘ্রই আপলোড হবে!

সপ্তম শ্রেণি: ইতিহাস, অধ্যায় – ৭, জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি, রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর

অধ্যায় ৭: জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি
(দীর্ঘ উত্তরধর্মী বা রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: ৫)

📝 ৫ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ ৭টি প্রশ্নোত্তর:

১. সুলতানি ও মোগল স্থাপত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: ভারতে তুর্কি ও মোগলদের আগমনের ফলে ভারতীয় এবং ইসলামীয় শিল্পরীতির মিলনে এক নতুন স্থাপত্যরীতির জন্ম হয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:

  • খিলান ও গম্বুজ: এই যুগের স্থাপত্যের প্রধান আকর্ষণ ছিল খিলান ও গম্বুজের ব্যবহার। এর ফলে বড়ো বড়ো ঘরের ওপর ছাদ নির্মাণ করা সহজ হয় এবং স্থাপত্যগুলি দেখতে অনেক বেশি রাজকীয় হয়।
  • মিনার: মসজিদের কোণে বা আলাদাভাবে সুউচ্চ মিনার তৈরি করা হতো। যেমন— কুতুব মিনার।
  • উপাদান: লাল বেলেপাথর এবং পরবর্তীকালে সম্রাট শাহজাহানের আমলে শ্বেতপাথরের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। চুন ও সুরকির ব্যবহার ইমারতগুলিকে মজবুত করেছিল।
  • অলংকরণ: ইসলামে মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ থাকায় স্থাপত্যের গায়ে মানুষ বা প্রাণীর বদলে লতাপাতা, জ্যামিতিক নকশা এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থের বাণী খোদাই করা হতো।

২. মধ্যযুগে ভারতে ভক্তি আন্দোলনের মূল আদর্শ বা বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী ছিল?

উত্তর: মধ্যযুগের সমাজ ও ধর্মে ভক্তি আন্দোলন এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:

  • ঈশ্বরের একত্ববাদ: ভক্তিবাদী সাধকরা বিশ্বাস করতেন যে ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। রাম, রহিম বা কৃষ্ণ—সবই একই পরমেশ্বরের ভিন্ন ভিন্ন নাম।
  • ভক্তি ও প্রেম: কঠোর তপস্যা বা মূর্তিপূজার চেয়ে ঈশ্বরের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও ভক্তিকেই তাঁরা মুক্তির প্রধান পথ বলে মনে করতেন।
  • জাতপাতহীন সমাজ: তাঁরা সমাজের জাতপাতের ভেদাভেদ এবং উঁচু-নিচু ভেদাভাব মানতেন না। তাঁদের কাছে সব মানুষই ছিল সমান।
  • আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার: সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য তাঁরা সংস্কৃতের বদলে হিন্দি, বাংলা বা মারাঠির মতো স্থানীয় ভাষায় ধর্ম প্রচার করতেন।

৩. বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে শ্রীচৈতন্যদেবের প্রভাব আলোচনা করো।

উত্তর: শ্রীচৈতন্যদেব ছিলেন মধ্যযুগের বাংলার শ্রেষ্ঠ সমাজসংস্কারক ও ভক্তিবাদী সাধক। তাঁর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী:

  • নামসংকীর্তন: তিনি খোল-করতাল সহযোগে পথে পথে নামসংকীর্তনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনার প্রসার ঘটান।
  • সামাজিক সাম্য: তিনি ব্রাহ্মণ থেকে চণ্ডাল পর্যন্ত সকল মানুষকে পরম আদরে জড়িয়ে ধরতেন। তাঁর প্রভাবে হিন্দু সমাজের কঠোর জাতপাত ব্যবস্থা কিছুটা শিথিল হয়েছিল।
  • বাংলা সাহিত্যের উন্নতি: তাঁকে কেন্দ্র করেই বাংলায় প্রচুর জীবনীকাব্য এবং পদাবলি সাহিত্য রচিত হয়, যা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
  • উদার মানসিকতা: তাঁর উদার প্রেমধর্মের প্রভাবে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়।

৪. সুফি আন্দোলনের মূল আদর্শ ও চিস্তি সম্প্রদায়ের অবদান আলোচনা করো।

উত্তর: সুফিবাদ হলো ইসলাম ধর্মের একটি উদার ও মরমীয় শাখা। সুফি সাধকরা মনে করতেন যে ঈশ্বর বা আল্লাহর প্রতি অকৃত্রিম প্রেম এবং মানুষের সেবাই হলো শ্রেষ্ঠ ধর্ম।

  • চিস্তি সম্প্রদায়: ভারতে সুফিবাদের চিস্তি সম্প্রদায় ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। খাজা মইনুদ্দিন চিস্তি এই মতাদর্শের ভিত্তি স্থাপন করেন।
  • সরল জীবনযাপন: চিস্তি সাধকরা অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তাঁরা রাজদরবারের জাঁকজমক এড়িয়ে চলতেন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতেন।
  • ধর্মীয় সমন্বয়: তাঁরা হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতেন না। তাঁদের আশ্রমে বা খানকাহ্-তে সব ধর্মের মানুষের সমান প্রবেশাধিকার ছিল।
  • সংগীতের মাধ্যমে সাধনা: তাঁরা মনে করতেন সংগীতের মাধ্যমে পরমেশ্বরের কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব। এই ধারা থেকেই ভারতে ‘কাওয়ালি’ গানের জনপ্রিয়তা বাড়ে।

৫. সুলতানি ও মোগল আমলে বাংলা সাহিত্যের বিকাশ সম্পর্কে বিস্তারিত লেখো।

উত্তর: মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগ বলা যেতে পারে। রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং ভক্তি আন্দোলনের প্রভাবে এর প্রভূত উন্নতি ঘটে।

  • অনুবাদ সাহিত্য: এই যুগে মহাকাব্যগুলি সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনূদিত হয়। কৃত্তিবাস ওঝা ‘রামায়ণ’ এবং কাশীরাম দাস ‘মহাভারত’ অনুবাদ করে বাংলার ঘরে ঘরে জনপ্রিয় করে তোলেন।
  • বৈষ্ণব পদাবলি: শ্রীচৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে রাধাকৃষ্ণের প্রেমের কাহিনি নিয়ে অসংখ্য পদ রচিত হয়। বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ এর মধ্যে অন্যতম।
  • মঙ্গলকাব্য: লৌকিক দেবদেবীদের মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল ও ধর্মমঙ্গল কাব্য রচিত হয়।
  • সুফী সাহিত্য: আরাকান রাজসভার মগন ঠাকুরের পৃষ্ঠপোষকতায় দৌলত কাজী এবং সৈয়দ আলাওল ‘পদ্মাবতী’র মতো চমৎকার কাব্য রচনা করেন।

৬. মোগল চিত্রকলা বা ছবি আঁকার রীতির বিবর্তন ও বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।

উত্তর: মোগল সম্রাটরা ছিলেন শিল্পানুরাগী। তাঁদের আমলে ছবি আঁকার রীতিতে অভাবনীয় বৈচিত্র্য দেখা দেয়:

  • অনুচিত্র বা ছোটো ছবি: মোগল আমলে বইয়ের পাণ্ডুলিপির ভেতরে ছোটো ছোটো ছবি আঁকার রেওয়াজ ছিল। একেই অনুচিত্র বলা হতো।
  • আকবরের আমল: সম্রাট আকবরের সময় থেকে ভারতীয় ও পারসিক শিল্পরীতির মিলন ঘটে। এই সময় রাজদরবারের দৃশ্য, যুদ্ধ এবং পৌরাণিক কাহিনি ছবির মূল বিষয় হয়ে ওঠে।
  • জাহাঙ্গীরের আমল: সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় মোগল চিত্রকলা শিখরে পৌঁছায়। এই সময় ফুল, লতাপাতা এবং পশু-পাখির অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ছবি আঁকা শুরু হয়। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ছবির চারিধারে সুন্দর পাড় বা অলংকরণ করার রীতি চালু হয়।
  • বাস্তবতা: মোগল ছবির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল রঙের নিপুণ ব্যবহার এবং সূক্ষ্ম কারুকাজ।

৭. সম্রাট আকবরের ‘দ্বীন-ই-ইলাহি’ এবং ‘সুলহ্-ই-কুল’ আদর্শের বর্ণনা দাও।

উত্তর: সম্রাট আকবর ছিলেন এক উদার ধর্মীয় মানসিকতার মানুষ। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী করতে হলে সব ধর্মের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা প্রয়োজন।

  • সুলহ্-ই-কুল: এর অর্থ হলো ‘সর্বজনীন শান্তি’ বা সবার জন্য সহিষ্ণুতা। আকবর মনে করতেন সব ধর্মের সারকথা একই। তাই তিনি ধর্মের নামে বিবাদ ভুলে সম্প্রীতির আদর্শ প্রচার করেন।
  • ইবাদতখানা: ফতেপুর সিক্রিতে তিনি বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের নিয়ে আলোচনা করার জন্য ইবাদতখানা বা প্রার্থনা গৃহ নির্মাণ করেছিলেন।
  • দ্বীন-ই-ইলাহি: ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে আকবর হিন্দু, মুসলিম, জৈন ও খ্রিস্টান ধর্মের ভালো দিকগুলো নিয়ে এক নতুন আদর্শ বা জীবনচর্যা প্রচার করেন, যাকে দ্বীন-ই-ইলাহি বলা হয়।
  • মূল উদ্দেশ্য: এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ঈশ্বরের একত্ববাদ এবং মানুষের মধ্যে নৈতিক চরিত্র গঠন ও ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়ানো। এটি কোনো জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ধর্ম ছিল না, বরং একটি উদার আদর্শ ছিল।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার