সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, ‘আঁকা, লেখা’ – মৃদুল দাশগুপ্ত, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
আঁকা, লেখা: বিস্তারিত বড় প্রশ্নোত্তর (মান: 5)
1. ‘আঁকা, লেখা’ কবিতায় কবির ছবি আঁকার সময় প্রকৃতির যে রূপ ও বিভিন্ন প্রাণী বা পাখিদের যে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করো।
উত্তর দেখো
কবির হাতের জাদুকরী ছোঁয়ায় প্রকৃতির রূপ ক্যানভাসে ফুটে উঠতে দেখে তিনটি শালিক পাখি তাদের স্বভাবসুলভ ঝগড়া থামিয়ে শান্ত হয়ে যায়। একটি ছোট্ট চড়ুই পাখি অবাক চোখে কবির দিকে তাকিয়ে থাকে। মাছরাঙা পাখি কবির আঁকা দেখে এতটাই মুগ্ধ হয় যে, সে নদীতে মাছ ধরার কথা ভুলে গিয়ে তার গায়ের উজ্জ্বল নীল রং কবিকে ধার দিতে চায়। প্রজাপতির ঝাঁক উড়ে এসে কবির আঁকার খাতায় বন্দি হতে চায়। এমনকি গর্তের ভেতর লুকিয়ে থাকা ভীতু ইঁদুরটিও কৌতূহল সামলাতে না পেরে পিটপিট করে তাকায়। সব মিলিয়ে, কবির ছবি আঁকার মুহূর্তে সমগ্র প্রকৃতি যেন এক আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে এবং রং-তুলিরাও সার্থক সৃষ্টির আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে।
2. “মাঠে যখন দুধের সরের মতো / চাঁদের আলো জমে”—এই অংশে রাতের প্রকৃতির যে অনবদ্য রূপ কবি ফুটিয়ে তুলেছেন, তা লেখো এবং ছড়া লেখার সময় প্রকৃতির অংশগ্রহণ কীভাবে ঘটেছে তা বুঝিয়ে দাও।
উত্তর দেখো
কবির এই কবিতা লেখার সময় রাতের প্রকৃতি নীরব দর্শক হয়ে থাকে না, বরং সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। কবির কল্পনায় মনে হয়, আকাশের উজ্জ্বল তারারা যেন আলোর মালা হয়ে পৃথিবীতে নেমে এসেছে কবির এই সৃষ্টিকে স্বাগত জানাতে। অন্যদিকে, অন্ধকার বকুল গাছে জোনাকিরা নিজেদের শরীরের আলোর বিন্দু দিয়ে ভাষার প্রথম অক্ষর ‘অ-আ’ লিখতে শুরু করে। এভাবেই চাঁদের আলো, তারা এবং জোনাকিদের মিলনে রাতের প্রকৃতি কবির ছড়া লেখার এক অপূর্ব ও জাদুকরী পটভূমি তৈরি করে দেয়।
3. “সেই তো আমার পরম পুলক, / সেই তো পদক পাওয়া”—’পরম পুলক’ ও ‘পদক পাওয়া’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? কবির এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তাঁর কোন মানসিকতার প্রকাশ ঘটেছে?
উত্তর দেখো
কবির এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তাঁর অত্যন্ত উদার, নির্লোভ এবং খাঁটি শিল্পমনা মানসিকতার প্রকাশ ঘটেছে। একজন প্রকৃত শিল্পী কখনোই অর্থ, খ্যাতি বা জাগতিক পুরস্কারের লোভে শিল্প সৃষ্টি করেন না। শিল্পের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করার মধ্যে। পাঠকের সান্নিধ্য এবং অকৃত্রিম ভালোবাসাই যে একজন শিল্পীর জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া, কবির এই নিরহংকার ও তৃপ্ত মানসিকতাই এখানে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
4. ‘আঁকা, লেখা’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর দেখো
সমগ্র কবিতাটি প্রধানত দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে রয়েছে ‘আঁকা’ অর্থাৎ ছবি আঁকার বর্ণনা। দুপুরবেলা কবি যখন রং-তুলি নিয়ে ক্যানভাসে গাছ আঁকেন, তখন পাখিরা, প্রজাপতিরা এবং রং-তুলিরা কীভাবে সেই আনন্দযজ্ঞে মেতে ওঠে, তার বর্ণনা রয়েছে। আর দ্বিতীয় অংশে রয়েছে ‘লেখা’ অর্থাৎ ছড়া বা কবিতা লেখার বর্ণনা। রাতের মায়াবী পরিবেশে চাঁদের আলো, তারা এবং জোনাকিদের উপস্থিতিতে কবির কবিতা লেখার জাদুকরী মুহূর্ত সেখানে ফুটে উঠেছে। যেহেতু সমগ্র কবিতাটি এই ‘ছবি আঁকা’ এবং ‘কবিতা লেখা’—এই দুটি সৃজনশীল কাজকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে, তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে ‘আঁকা, লেখা’ নামকরণটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং সম্পূর্ণ সার্থক হয়েছে।
5. ‘আঁকা, লেখা’ কবিতাটি অবলম্বনে শিল্পসৃষ্টির সঙ্গে প্রকৃতির যে এক নিবিড় আত্মীয়তা বা যোগসূত্র ফুটে উঠেছে, তা আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
দুপুরবেলা কবির ছবি আঁকার সময় শালিক, চড়ুই, মাছরাঙা এবং প্রজাপতিরা কেবল তাঁর শিল্পকে দেখেই না, তারা যেন সেই ছবির অংশ হয়ে উঠতে চায়। মাছরাঙা তার নীল রং ধার দিতে আসে, যা প্রমাণ করে প্রকৃতি নিজেই শিল্পীকে তার উপাদান দিয়ে সাহায্য করে। আবার রাতে কবিতা লেখার সময় চাঁদ, তারা এবং জোনাকিরা পরিবেশকে জাদুময় করে তোলে। জোনাকিদের আলোর বিন্দু দিয়ে ‘অ-আ’ লেখা আসলে প্রকৃতি ও সাহিত্যের এক অপূর্ব মিলনকে নির্দেশ করে। এইভাবেই সমগ্র কবিতা জুড়ে শিল্পসৃষ্টির সঙ্গে প্রকৃতির এক গভীর ও অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র অত্যন্ত সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে।