সপ্তম শ্রেণি : বাংলা, একুশের কবিতা – আশরাফ সিদ্দিকী, রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
একুশের কবিতা: বিস্তারিত বড় প্রশ্নোত্তর (মান: 5)
1. “একুশের কবিতা” নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: সাহিত্যে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ এর মাধ্যমেই রচনার মূল ভাববস্তু সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কবি আশরাফ সিদ্দিকী তাঁর এই কবিতাটির নাম রেখেছেন ‘একুশের কবিতা’। 1952 সালের 21 শে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন এবং ভাষা শহিদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনই এই কবিতার মূল উপজীব্য।
কবিতার শুরুতেই কবি মাতৃভাষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শৈশবের মধুর স্মৃতি, রূপকথার গল্প এবং প্রথম পাঠশালার বর্ণমালার কথা স্মরণ করেছেন। এরপরই তিনি বর্ণনা করেছেন কীভাবে একদল ঘাতক বা রাক্ষস আমাদের সেই মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু 21 শে ফেব্রুয়ারির দিন বাংলার দামাল ছেলেরা রফিক, সালাম ও বরকতের নেতৃত্বে রাজপথে নেমে আসে এবং বুকের তাজা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার সম্মান রক্ষা করে। একুশ মানেই অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার দীপ্ত শপথ। ভাষা আন্দোলনের এই রক্তস্নাত ইতিহাস ও একুশের চেতনাকে কেন্দ্র করেই সমগ্র কবিতাটি আবর্তিত হয়েছে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, ‘একুশের কবিতা’ নামকরণটি সম্পূর্ণ সার্থক ও অত্যন্ত ভাবগম্ভীর হয়েছে।
2. কবিতায় উল্লেখিত রূপকথা এবং পাঠশালার স্মৃতি কীভাবে মাতৃভাষার প্রতি কবির ভালোবাসাকে গভীর করেছে তা আলোচনা করো。
উত্তর দেখো
উত্তর: কবি আশরাফ সিদ্দিকী ‘একুশের কবিতা’য় মাতৃভাষাকে কেবল একটি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে দেখাননি, বরং এটিকে বাংলার মানুষের শেকড় ও শৈশবের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত করেছেন। মানুষের প্রথম আবেগ ও অনুভূতিগুলো মাতৃভাষাতেই রূপ লাভ করে।
কবিতায় কবি তাঁর দাদিমার কাছ থেকে শোনা রূপকথার রাজপুত্র ডালিমকুমারের কথা, তেপান্তরের মাঠ এবং বিন্নি ধানের খই-এর স্বাদ স্মরণ করেছেন। এর পাশাপাশি তাঁর মনে পড়ে পাঠশালায় মদনমোহন তর্কালঙ্কারের লেখা “পাখি সব করে রব, রাতি পোহাইল” কবিতাটি পড়ার স্মৃতি। এই সমস্ত স্মৃতিই বাংলা ভাষায় গাঁথা। মাতৃভাষা ছাড়া শৈশবের এই মধুর স্মৃতিগুলো সম্পূর্ণ অর্থহীন। বিদেশি শাসকেরা যখন এই ভাষা কেড়ে নিতে চাইল, তখন কবির মনে হলো তারা যেন তাঁর শৈশব, সংস্কৃতি এবং মায়ের কোল কেড়ে নিতে চাইছে। শৈশবের এই পবিত্র স্মৃতিগুলোই মাতৃভাষার প্রতি কবির ভালোবাসাকে আরও গভীর, আবেগপ্রবণ এবং অনড় করে তুলেছে।
3. “ইতিহাস থমকে দাঁড়িয়েছে”—কোন প্রেক্ষাপটে এবং কেন ইতিহাস থমকে দাঁড়িয়েছে? ভাষা আন্দোলনে দামাল ছেলেদের ভূমিকা বর্ণনা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: 1952 সালের 21 শে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার্থে বাংলার দামাল ছেলেদের চরম আত্মত্যাগের প্রেক্ষাপটেই কবি উদ্ধৃত উক্তিটি করেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে ধন-সম্পদ বা রাজ্য জয়ের জন্য অনেক যুদ্ধ হয়েছে, কিন্তু কেবল নিজের মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে প্রাণ দেওয়ার ঘটনা পৃথিবীতে বিরল।
স্বৈরাচারী ঘাতকেরা যখন বাংলা ভাষার কণ্ঠ রোধ করতে উদ্যত হলো, তখন বাংলার তরুণ সমাজ, ছাত্র এবং সাধারণ মানুষ তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। তারা জানত শাসকের হাতে রয়েছে প্রাণঘাতী অস্ত্র, তবুও তারা পিছু হটেনি। মাতৃভাষার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার টানে রফিক, সালাম, বরকতরা ঘাতকের বুলেটের সামনে বুক পেতে দেয়। তাদের তপ্ত রক্তে ভিজে যায় ঢাকার রাজপথ। অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তরুণদের এই নির্ভীক আত্মত্যাগ ও বুকভরা সাহস দেখেই স্বয়ং ইতিহাস বিস্ময়ে ও শ্রদ্ধায় থমকে দাঁড়িয়েছে। দামাল ছেলেদের এই ভূমিকাই বাঙালি জাতিকে চিরকালের জন্য ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় এক অমর প্রেরণা জুগিয়েছে।
4. “আমার মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চায়”—কারা ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল? তাদের বিরুদ্ধে বাংলার তরুণ সমাজের প্রতিবাদের স্বরূপটি কেমন ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের অত্যাচারী দোসররা বাংলার মানুষের মুখের ভাষা অর্থাৎ মাতৃভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল। কবিতায় কবি এই ঘাতকদের রূপকথার অশুভ ‘রাক্ষস’ শক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন। শাসকেরা চেয়েছিল বাংলার মানুষের ওপর নিজেদের ভাষা চাপিয়ে দিয়ে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং আত্মপরিচয়কে চিরতরে মুছে ফেলতে, যাতে তারা বাঙালিকে মানসিক দাসে পরিণত করতে পারে।
কিন্তু বাংলার তরুণ সমাজ এই অন্যায়কে নীরবে মেনে নেয়নি। তারা উপলব্ধি করেছিল যে ভাষার মৃত্যু মানে একটি জাতির মৃত্যু। তাই তারা শাসকগোষ্ঠীর সকল রক্তচক্ষু ও ভীতি প্রদর্শনকে উপেক্ষা করে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে নেমে আসে। তাদের প্রতিবাদ ছিল অত্যন্ত জোরালো, আপসহীন এবং নির্ভীক। বুলেটের ভয় তাদের দমাতে পারেনি। তারা বুঝিয়ে দিয়েছিল যে বাঙালি নিজের অধিকারের প্রশ্নে কখনো মাথা নত করে না। এই প্রতিবাদের স্বরূপ ছিল এক অদম্য গণজাগরণ, যা শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মাতৃভাষার অধিকারকে ছিনিয়ে এনেছিল।
5. ‘একুশের কবিতা’ অবলম্বনে কবির গভীর স্বদেশপ্রেম ও মাতৃভাষার প্রতি অকৃত্রিম মমত্ববোধের পরিচয় দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর: কবি আশরাফ সিদ্দিকী তাঁর ‘একুশের কবিতা’য় স্বদেশপ্রেমকে মাতৃভাষার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার সমার্থক হিসেবে তুলে ধরেছেন। কবির মতে, দেশ মানে কেবল মাটি বা মানচিত্র নয়; দেশের লোকজ সংস্কৃতি, রূপকথার গল্প, বিন্নি ধানের খই এবং পাঠশালার প্রথম পাঠ—এই সবকিছু নিয়েই দেশ। আর এই সবকিছুর অস্তিত্ব টিকে আছে মাতৃভাষা বাংলার ওপর।
কবির মমত্ববোধ এতটা প্রবল যে, ভাষার ওপর আঘাতকে তিনি নিজের অস্তিত্বের ওপর আঘাত বলে মনে করেছেন। যাঁরা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন, সেই রফিক, সালাম, বরকতদের প্রতি কবির শ্রদ্ধা সীমাহীন। তিনি তাঁদের আত্মত্যাগকে ইতিহাসের এক বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ঘাতকদের প্রতি কবির তীব্র ঘৃণা এবং শহিদদের প্রতি গভীর ভক্তি প্রমাণ করে যে তিনি তাঁর জন্মভূমি এবং মাতৃভাষাকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। একুশের চেতনাকে চিরকাল মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত রাখার এই ঐকান্তিক প্রয়াসই কবির শ্রেষ্ঠ স্বদেশপ্রেমের পরিচয় বহন করে।