সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, চিন্তাশীল – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
অধ্যায়: চিন্তাশীল
(দীর্ঘ / রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 4)
নিচের প্রশ্নগুলির প্রাসঙ্গিক ও বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিন্তাশীল’ নাটিকার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: সাহিত্যের নামকরণ সাধারণত রচনার মূল চরিত্র, বিষয়বস্তু বা অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনাকে নির্দেশ করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোচ্য নাটিকাটির নামকরণ করা হয়েছে ‘চিন্তাশীল’, যা মূলত একটি ব্যঙ্গাত্মক বা আইরনিক (Ironic) নামকরণ।
গল্পের প্রধান চরিত্র নরহরি নিজেকে একজন মস্ত বড়ো চিন্তাশীল এবং দার্শনিক বলে মনে করে। কিন্তু তার এই তথাকথিত ‘চিন্তা’ মানুষের কোনো উপকারে আসে না। সে মানুষের খিদে পাওয়াকে ‘জঠরাগ্নি’, হাঁপানোকে ‘বায়ু নির্গমন’ এবং সময় পার হওয়াকে ‘মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া’ বলে অহেতুক তত্ত্বে মেতে থাকে। এমনকি তার বন্ধু হরিদাসের মায়ের কঠিন অসুখের খবর শুনে ডাক্তার ডাকার বদলে সে ‘রোগ কেন হয়’ তা নিয়ে ভাবতে বসে যায়। আসলে নরহরির এই চিন্তাশীলতা হলো তার কর্মবিমুখতা, অলসতা এবং চরম কাণ্ডজ্ঞানহীনতার একটা আবরণ মাত্র। লেখক এই নামকরণের মধ্য দিয়ে সমাজের সেইসব মেকি পণ্ডিতদের ব্যঙ্গ করেছেন, যাদের চিন্তা বাস্তব জীবনে কোনো কাজেই লাগে না। যেহেতু নরহরির এই অবাস্তব চিন্তাকে ঘিরেই সমগ্র নাটিকাটি আবর্তিত এবং এর মাধ্যমেই মূল ব্যঙ্গটি ফুটে উঠেছে, তাই ‘চিন্তাশীল’ নামকরণটি সম্পূর্ণ সার্থক ও ব্যঞ্জনাধর্মী হয়েছে।
2. ‘চিন্তাশীল’ নাটিকা অবলম্বনে নরহরি চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাস্যকৌতুক ‘চিন্তাশীল’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো নরহরি। তার চরিত্রের মধ্যে বেশ কয়েকটি অদ্ভুত অথচ শিক্ষণীয় দিক ফুটে উঠেছে:
১. মেকি দার্শনিকতা: নরহরি সারাক্ষণ বড়ো বড়ো দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে ডুবে থাকে। সে অত্যন্ত সাধারণ ও তুচ্ছ বিষয়কে অহেতুক জটিল করে তোলে। যেমন, খাবার খাওয়ার বদলে সে পেটের ভেতরের ‘জঠরাগ্নি’ নিয়ে ভাবে।
২. বাস্তবজ্ঞানহীনতা: নরহরির মধ্যে বাস্তববুদ্ধি বা কাণ্ডজ্ঞানের চরম অভাব রয়েছে। বন্ধু হরিদাসের মায়ের শক্ত ব্যামোর খবর শুনে যখন দ্রুত ডাক্তার ডাকা প্রয়োজন, তখন সে রোগ কেন হয় এবং হাঁপানোর কারণ কী—তা নিয়ে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ শুরু করে। বিপদের গুরুত্ব বোঝার ক্ষমতা তার নেই।
৩. কর্মবিমুখতা ও অলসতা: তার এই চিন্তাশীলতা আসলে কোনো গঠনমূলক কাজ নয়, বরং কাজকে ফাঁকি দেওয়ার একটা কৌশল মাত্র। সে ‘সময় নষ্ট হচ্ছে’ এই অজুহাতে আসল কাজগুলোই ফেলে রাখে।
৪. অনুভূতিহীনতা: বন্ধুর মায়ের অসুখে তার কোনো সহানুভূতি জাগে না, বরং সে এটিকে ‘বড়ো চিন্তার বিষয়’ বলে নিজের গবেষণার খোরাক বানায়।
পরিশেষে বলা যায়, নরহরি চরিত্রটি হলো সমাজের সেইসব পুঁথিগত বিদ্যা-সর্বস্ব মানুষদের প্রতীক, যাদের অগাধ পাণ্ডিত্য বাস্তব জীবনে কানাকড়িও কাজে লাগে না।
3. হরিদাস এবং নরহরির কথোপকথনের মধ্য দিয়ে দুজনের চরিত্রের যে বৈপরীত্য ফুটে উঠেছে তা নিজের ভাষায় লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘চিন্তাশীল’ নাটিকায় হরিদাস এবং নরহরি হলো সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দুজন মানুষ। তাদের কথোপকথন এই বৈপরীত্যকে সুস্পষ্ট করে তোলে:
হরিদাস হলো একজন অত্যন্ত বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন, দায়িত্বশীল এবং কাজের ছেলে। মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে সে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে আসে এবং সমস্যার সরাসরি সমাধান (ডাক্তার বৈদ্যনাথবাবুকে ডাকা) খোঁজে। তার কথায় অস্থিরতা এবং বাস্তব সংকটের প্রতি উদ্বেগ পরিষ্কার।
নরহরি অন্যদিকে চরম বাস্তবজ্ঞানহীন এবং অলস একজন মেকি পণ্ডিত। বন্ধুর উদ্বেগ দেখে তার মনে কোনো সহানুভূতি জাগে না। হরিদাস কেন হাঁপাচ্ছে, মায়ের রোগ কেন হলো—এইসব অবাস্তব তাত্ত্বিক প্রশ্নে সে হরিদাসকে জর্জরিত করে। হরিদাস যখন ডাক্তার ডাকার জন্য তাগিদ দেয়, নরহরি তখন সময়, নিমিষ, দণ্ড নিয়ে দার্শনিক তত্ত্ব আওড়ায়।
সুতরাং, হরিদাস যেখানে ‘কর্ম বা Action’-এর প্রতীক, নরহরি সেখানে ‘অকর্মণ্য ও অহেতুক চিন্তার’ প্রতীক। হরিদাসের বাস্তববোধের কাছে নরহরির পাণ্ডিত্য নিতান্তই হাস্যকর ও মূল্যহীন বলে প্রমাণিত হয়।
4. “বড়ো চিন্তার বিষয়” — কোন্ বিষয়টিকে নরহরি চিন্তার বিষয় বলেছে? তার এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে কী প্রকাশ পেয়েছে?
উত্তর দেখো
উত্তর: প্রসঙ্গ: হরিদাস যখন হাঁপাতে হাঁপাতে এসে নরহরিকে জানায় যে তার মায়ের হঠাৎ খুব শক্ত ব্যামো (অসুখ) হয়েছে এবং তাকে তাড়াতাড়ি গিয়ে ডাক্তার বৈদ্যনাথবাবুকে ডেকে আনতে হবে, তখন নরহরি হরিদাসের মায়ের এই অসুস্থ হয়ে পড়ার খবরটিকেই “বড়ো চিন্তার বিষয়” বলে উল্লেখ করে।
মন্তব্যের তাৎপর্য: নরহরির এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তার চরম সংবেদনশীলতার অভাব এবং কাণ্ডজ্ঞানহীনতা প্রকাশ পেয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে বন্ধুর মায়ের অসুখ একটি উদ্বেগের বিষয় এবং এই সময়ে সবার আগে চিকিৎসা বা ডাক্তারের প্রয়োজন। কিন্তু নরহরি এই বিপদের গুরুত্বটাই বুঝতে পারে না। তার কাছে মায়ের এই অসুস্থতা কোনো দুঃখের বা চিন্তার বিষয় নয়, বরং এটি তার কাছে গবেষণার বিষয়। সুস্থ শরীরে কীভাবে পঞ্চভূতের গোলমাল হয়ে রোগের সৃষ্টি হয়, সেটাই তার কাছে দার্শনিক চিন্তার খোরাক হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে লেখক প্রমাণ করেছেন যে, পুঁথিগত বিদ্যা মানুষকে পণ্ডিত করতে পারে ঠিকই, কিন্তু বাস্তববোধ ও মানবিক অনুভূতি না থাকলে সেই বিদ্যা সম্পূর্ণ অর্থহীন ও হাস্যকর।