সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, চিরদিনের – সুকান্ত ভট্টাচার্য, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
অধ্যায়: চিরদিনের
(সংক্ষিপ্ত / ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 2)
নিচের প্রশ্নগুলির প্রাসঙ্গিক ও বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. ‘বৃষ্টিমুখর লাজুক গাঁয়ে’ এসে ঘড়ির কাঁটা থেমে গেছে বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘চিরদিনের’ কবিতায় পল্লিবাংলার শান্ত ও ধীর জীবনযাত্রার কথা বলা হয়েছে। শহরের জীবন ঘড়ির কাঁটার মতো অত্যন্ত ব্যস্ত এবং দ্রুতগতি সম্পন্ন। কিন্তু বৃষ্টিস্নাত গ্রাম্য প্রকৃতিতে সেই যান্ত্রিক ব্যস্ততা নেই। সেখানে জীবন চলে প্রকৃতির নিজস্ব ছন্দে ও শান্ত গতিতে। গ্রামের এই নিস্তব্ধ, ধীর ও শান্ত পরিবেশ বোঝাতেই কবি বলেছেন যে সেখানে এসে ব্যস্ত ঘড়ির কাঁটা যেন থেমে গেছে।
2. 1350 সালের আকালের দিনে মানুষের অবস্থা কেমন হয়েছিল তা ‘চিরদিনের’ কবিতা অবলম্বনে লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: 1350 বঙ্গাব্দে অবিভক্ত বাংলায় এক ভয়ংকর আকাল বা দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, যা ইতিহাসে ‘তেতাল্লিশের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। এই দুর্ভিক্ষের ফলে খাদ্যের তীব্র অভাবে গ্রামের সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। চারদিকে মৃত্যুর হাহাকার এবং খাদ্যাভাবের কারণে বহু মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল, যার ফলে গ্রামের পর গ্রাম প্রায় জনশূন্য ও মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল।
3. আকালের পরেও গ্রামের মানুষ আবার কেন তাদের ভিটেমাটিতে ফিরে এসেছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: আকালের কারণে গ্রামের মানুষ সাময়িকভাবে দিশেহারা হয়ে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হলেও, তাদের নাড়ির টান এই মাটির সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তারা মূলত কৃষিজীবী এবং এই মাটিই তাদের জীবন ও জীবিকার প্রধান উৎস। তাই আকালের বিভীষিকা কাটতেই তারা নিজেদের জন্মভূমি ও পুরোনো পেশার টানে আবার নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে আসে এবং নতুন করে বাঁচার লড়াই শুরু করে।
4. সকালে পাখির ডাক শুনে কৃষকেরা কী করে? তাদের সান্ধ্যকালীন আড্ডার বিবরণ দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘চিরদিনের’ কবিতায় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য জানিয়েছেন যে, সকালে পাখির ডাক শুনে গ্রামের কৃষকেরা ঘুম থেকে জেগে ওঠে এবং নিজেদের কাজের জন্য লাঙল ও বলদ নিয়ে মাঠে বেরিয়ে পড়ে। এরপর সারাদিন মাঠে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করার পর সন্ধ্যায় তারা ঘরে ফেরে এবং নিজেদের দাওয়ায় বা উঠোনে বসে প্রতিবেশীদের সঙ্গে গল্পগুজব করে। এভাবেই তাদের প্রতিদিনের শান্ত ও ছকে বাঁধা জীবন কাটে।
5. “কৃষকের ঘরে শূন্যতা নাই” – এই শূন্যতা না থাকার কারণ কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: 1350 সালের ভয়ংকর আকালে কৃষকের ঘরদোর শূন্য হয়ে গেলেও, সেই শূন্যতা চিরস্থায়ী হয়নি। গ্রামের কৃষকেরা অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং আশাবাদী। তারা আবার নতুন করে মাঠে বীজ বপন করেছে এবং তাদের কঠোর পরিশ্রমে মাঠে সবুজ ফসলের সমারোহ দেখা দিয়েছে। এই নতুন ফসলের সম্ভাবনা এবং গোলাভরা ধানের স্বপ্নেই কৃষকের মন থেকে আকালের সমস্ত শূন্যতা ও হতাশা দূর হয়ে গেছে।
অধ্যায়: চিরদিনের
(অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর – মান: 2/3)
নিচের প্রশ্নগুলির প্রাসঙ্গিক ও বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. কবি গ্রামটিকে ‘লাজুক গাঁ’ বলেছেন কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: পল্লিগ্রামের পরিবেশ শহরের মতো কোলাহলপূর্ণ, চঞ্চল বা আত্মপ্রদর্শনকারী নয়। গ্রামের রূপ অত্যন্ত শান্ত, স্নিগ্ধ, নীরব এবং অন্তর্মুখী। বৃষ্টির দিনে সেই গ্রাম যেন প্রকৃতির চাদরে নিজেকে আরও গুটিয়ে নেয়। শহরের কৃত্রিম ব্যস্ততা ও যান্ত্রিকতা এই গ্রামে নেই বলেই গ্রামের এই সলজ্জ, মায়াবী ও শান্ত রূপটিকে বোঝাতে কবি একে ‘লাজুক গাঁ’ বলেছেন।
2. “দুর্ভিক্ষের আঁচল জড়ানো গায়ে” – কার গায়ে এবং কেন এমন আঁচল জড়ানো?
উত্তর দেখো
উত্তর: এখানে পল্লিগ্রামটির গায়ে দুর্ভিক্ষের আঁচল জড়ানো থাকার কথা বলা হয়েছে। 1350 বঙ্গাব্দের ভয়াবহ আকাল বা তেতাল্লিশের মন্বন্তর গ্রামবাংলায় যে মৃত্যু ও হাহাকারের বিভীষিকা সৃষ্টি করেছিল, তার ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। চারপাশের পরিবেশ, মানুষের জীবনযাত্রা এবং শূন্য ভিটেমাটিতে এখনো সেই ভয়ংকর খাদ্যাভাব ও ধ্বংসলীলার করুণ স্মৃতি বা ছাপ লেগে আছে। এই মর্মান্তিক অবস্থাকেই কবি ‘দুর্ভিক্ষের আঁচল জড়ানো’ বলেছেন।
3. আকালের পর গ্রামে ফিরে আসা মানুষদের চোখেমুখে কীসের ছাপ ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: আকালের চরম দুর্দশা ও খাদ্যাভাবের কারণে দিশেহারা হয়ে যেসব মানুষ গ্রাম ছেড়েছিল, পরিস্থিতি শান্ত হলে তারা আবার নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে আসে। কিন্তু তাদের চোখেমুখে তখনো সেই ভয়ংকর আকালের গভীর হতাশা, সর্বস্ব হারানোর শূন্যতা এবং এক চরম বিভ্রান্তির ছাপ লেগে ছিল। তবে এই শূন্যতার পাশাপাশি নতুন করে বাঁচার এক অস্পষ্ট আশাও তাদের চোখে লুকিয়ে ছিল।
4. “সবুজ ফসলে সুবর্ণ যুগ আসে” – ‘সুবর্ণ যুগ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? তা কীভাবে আসে?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘সুবর্ণ যুগ’ বলতে এখানে প্রাচুর্য, সুখ, শান্তি এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এক সমৃদ্ধশালী অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে।
আকালের ভয়াবহ ধ্বংসলীলার পর কৃষকেরা যখন আবার নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে এসে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে মাঠে বীজ বপন করে, তখন একসময় মাঠ ভরে ওঠে সবুজ ফসলে। এই সবুজ ফসলই হলো কৃষকের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। মাঠে প্রচুর ফসল ফলানোর মাধ্যমেই কৃষকের জীবন থেকে আকালের অন্ধকার দূর হয় এবং সুখ ও প্রাচুর্যের সেই সুবর্ণ যুগ ফিরে আসে।
5. ‘চিরদিনের’ কবিতায় পল্লিগ্রামের সকাল ও সন্ধ্যার যে বিপরীত চিত্র রয়েছে, তা সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: কবিতায় পল্লিগ্রামের সকালটি কর্মমুখর এবং সন্ধ্যাটি অত্যন্ত শান্ত।
সকালে পাখির ডাকে গ্রামের মানুষের ঘুম ভাঙে এবং কৃষকেরা লাঙল-বলদ নিয়ে মাঠের কাজের উদ্দেশ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, সন্ধ্যা নেমে এলে গ্রামের ঘরে ঘরে শাঁখ বাজে, চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে আসে এবং সারাদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর কৃষকেরা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য উঠোনে বা দাওয়ায় বসে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করে।
6. “বসেছে দাওয়ায়…” – কারা, কখন দাওয়ায় বসেছে? তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু কী হতে পারে?
উত্তর দেখো
উত্তর: সারাদিন মাঠে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করার পর সন্ধেবেলায় গ্রামের কৃষকেরা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য তাদের বাড়ির দাওয়ায় বা উঠোনে এসে বসেছে।
তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হতে পারে অতীত আকালের সেই মর্মান্তিক স্মৃতি, বর্তমানের বেঁচে থাকার কঠোর লড়াই, মাঠের ফসল কেমন হয়েছে সেই চিন্তা এবং আগামী দিনে নতুন ফসলের প্রাচুর্য বা সুবর্ণ যুগ আসার বুকভরা স্বপ্ন।
7. ‘চিরদিনের’ কবিতায় কৃষকদের চরিত্রের কোন্ বিশেষ দিকটি ফুটে উঠেছে?
উত্তর দেখো
উত্তর: এই কবিতায় বাংলার কৃষকদের চরম সহনশীলতা, হার-না-মানা মনোভাব এবং অদম্য জীবনীশক্তির দিকটি ফুটে উঠেছে। 1350 সালের ভয়াবহ মন্বন্তর তাদের সর্বস্বান্ত করে দিলেও, তারা চিরকালের জন্য হাল ছেড়ে দেয়নি। তারা প্রকৃতির নিয়মের মতোই চিরন্তন। শত বিপর্যয়ের পরেও তারা আবার নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে আসে এবং কঠোর পরিশ্রম করে মাটির বুক চিরে নতুন ফসল ফলায়। তাদের এই প্রবল আশাবাদী ও লড়াকু মানসিকতাই এখানে জয়যুক্ত হয়েছে।
8. বৃষ্টিমুখর গ্রামকে কবি ‘স্নিগ্ধ’ বলেছেন কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহে গ্রামের প্রকৃতি রুক্ষ ও মলিন হয়ে থাকে। কিন্তু যখন বৃষ্টি নামে, তখন সেই বৃষ্টির জলে গ্রামের সমস্ত গাছপালা, ধুলোবালি ও রুক্ষতা ধুয়ে মুছে যায়। গ্রামটি সতেজ, সবুজ ও পবিত্র রূপ ধারণ করে। বৃষ্টির জল পল্লিপ্রকৃতির বুকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এবং কোমলতা নিয়ে আসে। এই সতেজ ও শান্ত রূপটিকে বোঝাতেই কবি বৃষ্টিমুখর গ্রামকে ‘স্নিগ্ধ’ বলেছেন।