সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, দুটি গানের জন্ম কথা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
অধ্যায়: দুটি গানের জন্মকথা
(দীর্ঘ / রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 4)
নিচের প্রশ্নগুলির প্রাসঙ্গিক ও বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে’ গানটি রচনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং এর রচনার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রবন্ধকারের বক্তব্য নিজের ভাষায় লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘দুটি গানের জন্মকথা’ প্রবন্ধে ‘জনগণমন’ গানটির রচনার আসল প্রেক্ষাপট জানা যায়। 1911 সালে ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ ভারতে এলে, রবীন্দ্রনাথের এক রাজভক্ত বন্ধু তাঁকে সম্রাটের বন্দনা করে একটি গান রচনার অনুরোধ করেন। একজন পরাধীন দেশের কবি হয়ে বিদেশি শাসকের স্তুতিগান লেখা রবীন্দ্রনাথের পক্ষে চরম অপমানজনক ছিল। এই অন্যায্য অনুরোধে তাঁর মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সেই ক্ষোভ ও আত্মমর্যাদাবোধ থেকেই তিনি ‘জনগণমন’ গানটি রচনা করেন। এই গানে তিনি কোনো রক্তমাংসের ব্রিটিশ সম্রাটের জয়গান করেননি, বরং ভারতের সকল মানুষের অন্তর্যামী, যুগ-যুগান্তরের মানবভাগ্য রথচালক এবং চিরন্তন পথপ্রদর্শক স্বয়ং ঈশ্বর বা ‘ভারতভাগ্যবিধাতা’-র বন্দনা করেছেন।
2. ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি রচনার পশ্চাতে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট ছিল, তা প্রবন্ধ অবলম্বনে আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি রচিত হয়েছিল 1905 সালের এক চরম উত্তাল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে। লর্ড কার্জন যখন বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করার জন্য বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব দেন, তখন সমগ্র বাংলা জুড়ে এক তীব্র স্বদেশি আন্দোলন ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বাংলার মাটি, জল, প্রকৃতি এবং মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা ছিল। ব্রিটিশদের চক্রান্ত ব্যর্থ করতে এবং হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাংলার সকল মানুষের মনে গভীর দেশপ্রেম, একতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করার উদ্দেশ্যেই তিনি এই অবিস্মরণীয় গানটি রচনা করেছিলেন, যা কালক্রমে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
3. ‘দুটি গানের জন্মকথা’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদাবোধের যে পরিচয় পাওয়া যায়, তা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘দুটি গানের জন্মকথা’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গভীর দেশপ্রেম এবং অটল আত্মমর্যাদাবোধের সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। যখন তাঁর এক বন্ধু তাঁকে সম্রাট পঞ্চম জর্জের বন্দনাগান লেখার জন্য জোরাজুরি করেন, তখন তিনি সেই প্রস্তাব অত্যন্ত ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন এবং তার বদলে ঈশ্বরের বন্দনা করে ‘জনগণমন’ রচনা করেন। অন্যদিকে, 1905 সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তিনি বাংলার মানুষকে এক করার জন্য পথে নামেন এবং ‘আমার সোনার বাংলা’ রচনা করে মানুষের মনে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দেন। বিদেশি শাসকের কাছে মাথা নত না করে নিজের দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁর এই অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং আত্মসম্মানবোধ প্রবন্ধটিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
4. ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির সুরে বাউল গানের, বিশেষত গগন হরকরার প্রভাব কতখানি, তা প্রবন্ধ অনুসরণে লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির কথা যেমন রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব, তেমনি এর সুরের গভীরে মিশে আছে বাংলার মাটির গান অর্থাৎ বাউল সুরের অকৃত্রিম প্রভাব। শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে থাকার সময় রবীন্দ্রনাথ বাংলার সাধারণ বাউল গায়কদের জীবন ও দর্শনের সংস্পর্শে আসেন। সেখানে গগন হরকরা নামক এক সাধারণ ডাকপিয়নের গাওয়া ‘আমি কোথায় পাব তারে’ বাউল গানটি তাঁকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন যে বাংলার মানুষের প্রাণের কথা বলতে গেলে বাংলার নিজস্ব মাটির সুরই সবচেয়ে বেশি কার্যকর। তাই বিদেশি বা ধ্রুপদী সুরের বদলে তিনি গগন হরকরার ওই সহজ-সরল ও মর্মস্পর্শী বাউল সুরের কাঠামোতেই ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির সুরারোপ করেছিলেন।
5. ‘জনগণমন’ গানটি নিয়ে যে অহেতুক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, তা কীভাবে খণ্ডিত হয়? পুলিনবিহারী সেনের প্রতি লেখা চিঠির গুরুত্ব এ প্রসঙ্গে কতখানি?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘জনগণমন’ গানটি রচিত হওয়ার পর কিছু নিন্দুক অপপ্রচার করে যে গানটি সম্রাট পঞ্চম জর্জের বন্দনাগান হিসেবে লেখা হয়েছে। এই অযাচিত বিতর্কের অবসান ঘটাতে বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ছাত্র পুলিনবিহারী সেন রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লেখেন। উত্তরে রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট জানান যে, কোনো ব্রিটিশ সম্রাট কোনোভাবেই যুগ-যুগান্তরের মানবভাগ্য রথচালক হতে পারেন না। তিনি তাঁর রাজভক্ত বন্ধুকেও সেই সময় এই কথা জানিয়েছিলেন। বন্ধুটি গানটি শুনে হতাশ হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরেছিলেন। পুলিনবিহারী সেনকে লেখা রবীন্দ্রনাথের এই চিঠিটি একটি ঐতিহাসিক দলিল, যা সমস্ত অপপ্রচার ও মূঢ়তার অবসান ঘটিয়ে গানটির সৃষ্টির প্রকৃত সত্য এবং কবির অটল দেশপ্রেমকে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছিল।