সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, দেবাত্মা হিমালয় – প্রবোধ কুমার স্যানাল, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
অধ্যায়: দেবাত্মা হিমালয়
(দীর্ঘ / রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 4)
নিচের প্রশ্নগুলির প্রাসঙ্গিক ও বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. প্রবোধকুমার সান্যাল রচিত ‘দেবাত্মা হিমালয়’ ভ্রমণকাহিনিটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: সাহিত্যের নামকরণ সাধারণত রচনার মূল বিষয়বস্তু, চরিত্র বা লেখকের কোনো গভীর উপলব্ধিকে নির্দেশ করে। আলোচ্য ভ্রমণকাহিনিটির নামকরণ ‘দেবাত্মা হিমালয়’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ব্যঞ্জনাধর্মী।
এই রচনায় লেখক হিমালয়কে কেবল ভূগোলের পাতায় থাকা বরফে ঢাকা একটি পর্বতমালা বা পাথরের স্তূপ হিসেবে বর্ণনা করেননি। যুগ যুগ ধরে ভারতীয় দর্শনে হিমালয়কে দেবতাদের পবিত্র বাসভূমি বলে মনে করা হয়। লেখক তাঁর যাত্রাপথে দেখেছেন, কীভাবে পুণ্যার্থীরা চরম শারীরিক কষ্ট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে কেবল ঐকান্তিক ভক্তির জোরে এই দুর্গম পথ পাড়ি দেন। সাধু-সন্ন্যাসীদের নীরব তপস্যা এবং চারপাশের অসীম নৈসর্গিক সৌন্দর্য লেখকের মনে এই উপলব্ধির জন্ম দিয়েছে যে, হিমালয় কোনো জড় পদার্থ নয়; এটি এক জীবন্ত, জাগ্রত এবং আধ্যাত্মিক সত্তা। এর প্রতিটি কণায় যেন দেবতার পবিত্র আত্মা বিরাজমান। হিমালয়ের এই আধ্যাত্মিক রূপ এবং তার প্রতি মানুষের অটুট ভক্তিই রচনার মূল উপজীব্য হওয়ায় ‘দেবাত্মা হিমালয়’ নামকরণটি সর্বতোভাবে সার্থক হয়েছে।
2. ‘দেবাত্মা হিমালয়’ পাঠ্যাংশে হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ি পথ এবং নৈসর্গিক সৌন্দর্যের যে বর্ণনা রয়েছে, তা নিজের ভাষায় লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: লেখক প্রবোধকুমার সান্যালের কলমে হিমালয়ের দুর্গমতা এবং তার নৈসর্গিক সৌন্দর্য যেন এক সুতোয় গাঁথা হয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
দুর্গম পথ: হিমালয়ের পাহাড়ি রাস্তা অত্যন্ত খাড়া, বিপদসংকুল এবং সাপের মতো আঁকাবাঁকা। পথের একপাশে থাকে আকাশচুম্বী খাড়া পাহাড় আর অন্যপাশে থাকে দৃষ্টিহীন গভীর গিরিখাদ। পাহাড়ি নদীর স্রোত এখানে সমতলের মতো শান্ত নয়, বরং তা অত্যন্ত প্রখর, উদ্দাম এবং গর্জনশীল। পদে পদে মৃত্যুর হাতছানি থাকে।
নৈসর্গিক সৌন্দর্য: এই ভয়ংকর রূপের আড়ালেই লুকিয়ে আছে অপরূপ সৌন্দর্য। বরফে মোড়া শুভ্র পর্বতশৃঙ্গ, পাইন ও দেওদার গাছের ঘন সবুজ অরণ্য, মেঘের লুকোচুরি এবং গভীর উপত্যকা এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করে। ভয়ংকর দুর্গমতা এবং মোহময় সৌন্দর্যের এই যুগলবন্দিই হিমালয়কে অনন্য করে তুলেছে এবং লেখকের বর্ণনায় তা অনবদ্য রূপ পেয়েছে।
3. তীর্থযাত্রীদের ভক্তি ও বিশ্বাস কীভাবে হিমালয়ের দুর্গমতাকে জয় করেছে? প্রবোধকুমার সান্যালের রচনা অবলম্বনে বুঝিয়ে দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘দেবাত্মা হিমালয়’ রচনায় লেখক দেখিয়েছেন যে মানুষের অটুট ভক্তি এবং বিশ্বাস কীভাবে প্রকৃতির কঠিনতম বাধাকেও তুচ্ছ প্রমাণ করতে পারে।
হিমালয়ের দুর্গম পথ, খাড়া চড়াই, হাঁড়-কাঁপানো শীত এবং পদে পদে মৃত্যুর ভয়—সবকিছুই সাধারণ মানুষকে পিছিয়ে আসার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু লেখক দেখেছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা তীর্থযাত্রীরা এই চরম শারীরিক কষ্টকে হাসিমুখে বরণ করে নিচ্ছেন। তাঁদের কাছে কোনো কষ্টই বড়ো নয়, কারণ তাঁদের বুকে রয়েছে দেবদর্শনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং ঈশ্বরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। যাত্রাপথে ছোটো ছোটো ‘চটি’-তে সামান্য বিশ্রাম নিয়েই তাঁরা আবার এগিয়ে চলেন। কেউ ক্লান্ত হয়ে পড়লে অন্য পুণ্যার্থীরা তাকে সাহায্য করেন। অর্থাৎ, পেশিশক্তি বা শারীরিক ক্ষমতার চেয়ে মনের জোর ও ঐকান্তিক ভক্তিই যে তীর্থযাত্রীদের এই দুর্গম পথ পার হওয়ার প্রধান সম্বল, লেখক তা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে বর্ণনা করেছেন।
4. “এ পাথর কেবল জড় পদার্থ নয়”— উক্তিটির আলোকে হিমালয় সম্পর্কে লেখকের দার্শনিক উপলব্ধির পরিচয় দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর: প্রসঙ্গ: আলোচ্য উক্তিটি প্রবোধকুমার সান্যালের ‘দেবাত্মা হিমালয়’ নামক ভ্রমণকাহিনি থেকে নেওয়া হয়েছে। হিমালয়ের বিশালতা ও তার আধ্যাত্মিক পরিবেশ অনুভব করেই লেখক এ কথা বলেছেন।
লেখকের উপলব্ধি: সাধারণ দৃষ্টিতে পাহাড় মানেই হলো পাথর, মাটি আর বরফের এক বিশাল জড় স্তূপ। কিন্তু লেখকের অনুভূতি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। হিমালয়ের নির্জন, শান্ত এবং সুবিশাল পরিবেশের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের ভেতরের এক পরম শান্তি অনুভব করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, কীভাবে যুগ যুগ ধরে এই পবিত্র ভূমিতে সাধু-সন্ন্যাসীরা নীরব তপস্যা করে আসছেন। তীর্থযাত্রীদের নিঃস্বার্থ ভক্তি এবং চারপাশের ঐশ্বরিক সৌন্দর্য দেখে লেখকের মনে হয়েছিল, হিমালয়ের প্রতিটি পাথর, গাছপালা এবং জলধারায় যেন এক পরম সত্তা বা ঈশ্বর বিরাজ করছেন। এটি কোনো প্রাণহীন জড় পদার্থ নয়, বরং এটি এক জীবন্ত ‘দেবাত্মা’—যাকে স্পর্শ করলে মানুষের মন পবিত্রতায় ভরে ওঠে। হিমালয় সম্পর্কে লেখকের এই গভীর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক উপলব্ধিই উক্ত মন্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে।