সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, ভানুসিংহের পত্রাবলী – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর
অধ্যায়: ভানুসিংহের পত্রাবলী
(দীর্ঘ / রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 4)
নিচের প্রশ্নগুলির প্রাসঙ্গিক ও বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. ‘ভানুসিংহের পত্রাবলী’ পাঠ্যাংশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতন ও কলকাতার বর্ষার যে তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেছেন, তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন আদ্যোপান্ত প্রকৃতিপ্রেমী। ‘ভানুসিংহের পত্রাবলী’ রচনায় তাঁর লেখা দুটি চিঠির মধ্য দিয়ে শান্তিনিকেতন ও কলকাতার বর্ষার এক চমৎকার তুলনামূলক চিত্র ফুটে উঠেছে।
শান্তিনিকেতনের বর্ষা হলো উন্মুক্ত প্রকৃতির এক বিশাল ও স্বাধীন রূপ। সেখানে অবারিত খোলা প্রান্তরের ওপর দিয়ে যখন ঘন কালো বা শ্যামল রঙের মেঘ ঘনিয়ে আসে, তখন আকাশ এক অপরূপ গাম্ভীর্যে ভরে ওঠে। বৃষ্টি নামলে মাঠের নিচু জায়গাগুলোতে দিঘির মতো জল জমে যায় এবং চারদিক এক সজীব, স্নিগ্ধ ও মায়াবী রূপ পায়। এই বর্ষা কবির মনে অসীম আনন্দ ও মুক্তির স্বাদ এনে দেয়।
অন্যদিকে, কলকাতার বর্ষাকে কবির অত্যন্ত শ্রীহীন, বন্দি ও বিষণ্ণ মনে হয়েছে। যান্ত্রিক শহর কলকাতায় বড়ো বড়ো ইমারতের ভিড়ে খোলা আকাশ দেখাই যায় না। বৃষ্টি নামলে সেখানে ধুলোর বদলে চারদিকের রাস্তাঘাট কেবল কাদা ও নোংরা জলে ভরে যায়। কলকাতার এই আবদ্ধ, ইট-কাঠের খাঁচায় বন্দি ও মলিন রূপ কবির মনে গভীর বিরক্তি সৃষ্টি করে এবং তিনি দ্রুত শান্তিনিকেতনের মুক্ত পরিবেশে ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন।
2. “কলকাতায় ইটের খাঁচার মধ্যে কি বর্ষা মানায়?” – কলকাতা শহরকে ‘ইটের খাঁচা’ বলার কারণ কী? কলকাতার বর্ষার এমন শ্রীহীন রূপ কবির মনে কী প্রভাব ফেলেছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘ভানুসিংহের পত্রাবলী’ পাঠ্যাংশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতা শহরকে ‘ইটের খাঁচা’ বা ‘ইটের জঙ্গল’ বলে উল্লেখ করেছেন। খাঁচার মধ্যে পাখি যেমন বন্দি থাকে এবং বাইরের মুক্ত আকাশ বা প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে পায় না, তেমনি কলকাতার এই উঁচু উঁচু দেওয়াল ও বড়ো বড়ো বাড়ির মাঝে মানুষের মনও বন্দি হয়ে পড়ে। আকাশের আলো-বাতাস বা প্রকৃতির উন্মুক্ত রূপ সেখানে ঠিকমতো পৌঁছায় না বলেই কবি এমন কথা বলেছেন।
কলকাতায় বর্ষা অত্যন্ত শ্রীহীন। বৃষ্টি হলে শহরের ধুলো কাদায় পরিণত হয় এবং রাস্তাঘাট নোংরা জলে ভরে ওঠে। প্রকৃতির বিশাল ও স্বাধীন রূপ চার দেওয়ালের আবদ্ধ খাঁচায় কখনোই মানানসই হতে পারে না। কলকাতার এই কদর্য ও আবদ্ধ পরিবেশ কবির মনে গভীর বিষাদ ও বিরক্তির সৃষ্টি করেছিল। তাঁর মন খাঁচায় বন্দি পাখির মতো ছটফট করত এবং তিনি শান্তিনিকেতনের সেই মুক্ত আকাশ ও কালো মেঘের মাঝে ফিরে যাওয়ার জন্য অধীর হয়ে উঠতেন।
3. শান্তিনিকেতনের মাঠে বর্ষা নামার দৃশ্যটি কবি কীভাবে চিঠিতে বর্ণনা করেছেন তা আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘ভানুসিংহের পত্রাবলী’-র প্রথম চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনের মাঠে বর্ষা নামার এক অপরূপ সজীব ও উন্মুক্ত চিত্র এঁকেছেন।
শান্তিনিকেতনের প্রান্তর হলো একেবারে অবারিত এবং দিগন্তবিস্তৃত। সেই খোলা আকাশের ওপর যখন ঘন কালো বা শ্যামল রঙের বর্ষার মেঘ ঘনিয়ে আসে, তখন তা এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য ও সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। মেঘের বিশালত্ব যেন সরাসরি মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চায়। এরপর যখন প্রবল বৃষ্টি নামে, তখন শান্তিনিকেতনের সেই বিশাল মাঠের যেখানে-সেখানে ছোটো ছোটো গর্ত বা নিচু জায়গাগুলোতে জল জমে যায়। সেই জমে থাকা জল একেবারে দিঘির মতো রূপ ধারণ করে। মেঘ আর বৃষ্টির সেই অপরূপ মেলবন্ধনে শান্তিনিকেতনের মাঠ এক স্নিগ্ধ, সতেজ ও মায়াবী রূপ পায়। প্রকৃতির এই উন্মুক্ত ও স্বাধীন বর্ষার রূপ কবির আত্মাকে প্রশান্তি দেয়।
4. ‘ভানুসিংহের পত্রাবলী’ রচনায় প্রকৃতির প্রতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে গভীর ভালোবাসা ও টান প্রকাশ পেয়েছে, তা বিশ্লেষণ করো。
উত্তর দেখো
উত্তর: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করেছেন। ‘ভানুসিংহের পত্রাবলী’-তে সংকলিত চিঠি দুটির ছত্রে ছত্রে প্রকৃতির প্রতি কবির সেই গভীর ভালোবাসা ও অকৃত্রিম টান স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
কাজের প্রয়োজনে যান্ত্রিক শহর কলকাতায় থাকলেও কবির মন সবসময় প্রকৃতির মুক্ত অঙ্গন অর্থাৎ শান্তিনিকেতনে পড়ে থাকত। কলকাতার বড়ো বড়ো ইমারত, কৃত্রিম আরামদায়ক জীবন এবং কাদাময় রাস্তাঘাট কবিকে আকৃষ্ট করতে পারেনি; বরং তা তাঁর কাছে বন্দিদশা বলে মনে হয়েছে। এর বিপরীতে শান্তিনিকেতনের বিশাল প্রান্তর, ঘন কালো মেঘ এবং বৃষ্টিভেজা মাঠের সামান্য প্রাকৃতিক দৃশ্যও তাঁর মনে অসীম আনন্দের ঢেউ তুলেছে। কলকাতার কোলাহল ছেড়ে শান্তিনিকেতনের প্রকৃতির কোলে ফিরে যাওয়ার জন্য তাঁর এই ব্যাকুলতা ও মনের ছটফটানি থেকেই প্রকৃতির প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ভালোবাসার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়।
5. “আমার মনটা কেমন যেন ছটফট করতে থাকে” – উক্তিটির আলোকে কবির মানসিক অবস্থার বর্ণনা দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর: উদ্ধৃত উক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘ভানুসিংহের পত্রাবলী’ থেকে নেওয়া হয়েছে। এখানে কাজের প্রয়োজনে কলকাতায় বন্দি থাকা অবস্থায় এক প্রকৃতিপ্রেমী কবির মানসিক ব্যাকুলতার কথা বলা হয়েছে।
কবি আদ্যোপান্ত প্রকৃতির উপাসক। বর্ষা হলো প্রকৃতির এক বিশাল, স্বাধীন এবং উন্মুক্ত রূপের প্রকাশ, যা শান্তিনিকেতনের খোলা মাঠে সবচেয়ে ভালোভাবে উপভোগ করা যায়। কিন্তু কবি যখন কলকাতা শহরে থাকেন, তখন বড়ো বড়ো বাড়ি বা ইটের খাঁচার কারণে তিনি সেই মুক্ত আকাশ দেখতে পান না। বৃষ্টি নামলে কলকাতা কেবল কাদা ও নোংরা জলে ভরে ওঠে। প্রকৃতির এই আবদ্ধ, শ্রীহীন ও মলিন রূপ দেখার ফলেই কবির প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে। খাঁচায় বন্দি পাখি যেমন মুক্ত আকাশে ওড়ার জন্য ব্যাকুল হয়, তেমনি কলকাতার আবদ্ধ পরিবেশ থেকে মুক্তি পেয়ে শান্তিনিকেতনের খোলা প্রান্তর, কালো মেঘ এবং অঝোর বৃষ্টির মাঝে ফিরে যাওয়ার জন্যই কবির মন ছটফট করতে থাকে।