মকটেস্ট বেছে নাও

অফলাইন মকটেস্ট

খুব শীঘ্রই আপলোড হবে!

সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, মাতৃভাষা – চিত্তরঞ্জন দাস, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর

মাতৃভাষা: বিস্তারিত বড় প্রশ্নোত্তর (মান: 5)

1. চিত্তরঞ্জন দাশ ‘মাতৃভাষা’ কবিতায় মাতৃভাষাকে ‘জননী’র সঙ্গে তুলনা করেছেন কেন? তাঁর এই তুলনার সার্থকতা বিচার করো।

উত্তর দেখো

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁর ‘মাতৃভাষা’ কবিতায় মাতৃভাষাকে পরম শ্রদ্ধেয় জননী বা মায়ের উচ্চাসনে বসিয়েছেন। একজন মা যেমন সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন এবং জন্মের পর স্নেহে-মমতায় লালন-পালন করে তাকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন, মাতৃভাষাও ঠিক একইভাবে একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষা করে।

মানুষের প্রথম ভাব প্রকাশের মাধ্যম হলো তার মাতৃভাষা। শৈশবে মায়ের কোল থেকে শিশু যে ভাষা শেখে, সেই ভাষার মাধ্যমেই তার বুদ্ধি, মনন এবং চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটে। কবি মনে করেন, মায়ের কোল ছেড়ে যেমন অন্য কোথাও প্রকৃত শান্তি পাওয়া যায় না, তেমনি নিজের ভাষাকে অবজ্ঞা করে অন্য কোনো বিজাতীয় ভাষায় প্রাণের আরাম খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। মাতৃভাষা একটি জাতিকে তার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির দুগ্ধ দান করে পুষ্ট করে। তাই মাতৃভাষাকে জননীর সঙ্গে তুলনা করা যেমন যৌক্তিক, তেমনি অত্যন্ত সার্থক ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ হয়েছে।

2. “বিজাতীয় ভাষা-হিল্লোলে”—শব্দবন্ধটির তাৎপর্য কী? বিজাতীয় ভাষার প্রতি মোহ বাঙালির কী ক্ষতি করেছে বলে কবি মনে করেন?

উত্তর দেখো

‘বিজাতীয় ভাষা-হিল্লোল’ বলতে কবি পরাধীন ভারতবর্ষের সেই সময়ের ইংরেজি শিক্ষার প্রবল ঢেউ বা জোয়ারকে বুঝিয়েছেন। ব্রিটিশ শাসনের প্রভাবে তখন বাঙালি সমাজে নিজের ভাষার চেয়ে ইংরেজি জানাটাই আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

কবির মতে, বিজাতীয় ভাষার এই মোহে পড়ে বাঙালি তার নিজস্ব সত্তা ও আত্মমর্যাদা হারিয়েছে। মানুষ মনে করত বিদেশি ভাষা শিখলে তারা আধুনিক হবে, কিন্তু বাস্তবে তারা তাদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল। এই মোহ বাঙালিকে মানসিকভাবে পরাধীন করে তুলেছিল এবং তাদের নিজস্ব সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভাণ্ডারকে অবহেলার চোখে দেখতে শিখিয়েছিল। নিজের ভাষাকে ত্যাগ করে অন্য ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করা যে এক প্রকার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত, কবি এখানে সেই সত্যকেই তুলে ধরেছেন। এই মোহের কারণে জাতি হিসেবে বাঙালির আত্মিক মুক্তি বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল বলে কবি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।

3. “জাগো তবে”—কবি কাদের এবং কেন জাগতে বলেছেন? তাঁদের উদ্দেশ্যে কবির মূল আহ্বানটি কী ছিল?

উত্তর দেখো

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এখানে সেইসব অসচেতন ও লক্ষ্যভ্রষ্ট দেশবাসীকে জাগতে বলেছেন যারা বিজাতীয় ভাষার অন্ধ অনুকরণে ব্যস্ত। তারা নিজেদের ভাষার ঐশ্বর্য না বুঝে পরকীয় ভাষার আড়ম্বরে মজে ছিল। এই মানসিক সুপ্তাবস্থাকেই কবি ঘুমের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তাঁদের জাগিয়ে তোলার মূল কারণ ছিল জাতীয় সংহতি ও আত্মপরিচয় রক্ষা করা। কবি চেয়েছিলেন দেশবাসী যেন উপলব্ধি করে যে, পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে হলে আগে নিজেদের ভাষাকে মুক্ত করতে হবে। তাঁর মূল আহ্বান ছিল—বিজাতীয় ভাষার মায়া ত্যাগ করে যেন মানুষ আবার মাতৃভাষার মন্দিরে ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিয়ে ফিরে আসে। নিজের ভাষাকে ভালোবাসা ও চর্চা করার মাধ্যমেই একটি জাতি প্রকৃত গৌরবের অধিকারী হতে পারে। কবির এই ‘জাগো’ ডাক আসলে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ডাক, যা দেশবাসীকে তাদের লুপ্ত গৌরব পুনরুদ্ধারে অনুপ্রাণিত করে।

4. ‘মাতৃভাষা’ কবিতায় কবির যে গভীর স্বদেশপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়, তা কবিতাটির মূল ভাবাবলম্বনে আলোচনা করো।

উত্তর দেখো

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক কবি। তাঁর ‘মাতৃভাষা’ কবিতায় স্বদেশপ্রেম কোনো বাহ্যিক শ্লোগান নয়, বরং তা ভাষার প্রতি নিগূঢ় ভক্তির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কবি বিশ্বাস করতেন, মাতৃভূমি এবং মাতৃভাষা সমার্থক। মা ও মাতৃভূমিকে যেমন কেউ ত্যাগ করতে পারে না, ভাষাকেও তেমনি বর্জন করা অসম্ভব।

কবির স্বদেশপ্রেম এখানে আত্মমর্যাদাবোধের প্রতীক হিসেবে ধরা দিয়েছে। তিনি পরাধীন জাতির হীনম্মন্যতাকে দূর করে নিজের সম্পদকে চেনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর কাছে বিদেশের ঐশ্বর্যের চেয়ে দেশের সহজ-সরল ভাষাই বেশি মূল্যবান। তিনি ভাষার মুক্তিকে দেশের মুক্তির প্রথম ধাপ বলে মনে করেছেন। নিজের ভাষাকে ভালোবাসার মাধ্যমেই যে জাতির মেরুদণ্ড শক্ত হয়, এই চিরন্তন স্বদেশপ্রেমের বার্তাটিই কবিতার ছত্রে ছত্রে ধ্বনিত হয়েছে। মাতৃভাষাকে মায়ের সম্মানে প্রতিষ্ঠিত করার জেদই চিত্তরঞ্জন দাশের দেশপ্রেমের মূল চাবিকাঠি।

5. “ভাষার মন্দিরে” অর্পণ করার মাধ্যমে কবি কীসের ইঙ্গিত দিয়েছেন? সার্থক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে মাতৃভাষার ভূমিকা আলোচনা করো।

উত্তর দেখো

‘ভাষার মন্দির’ বলতে কবি মাতৃভাষাকে একটি পবিত্র ও উপাস্য স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এখানে অর্পণ করার অর্থ হলো নিজের ভক্তি, একাগ্রতা এবং নিষ্ঠাকে ভাষার সেবায় নিয়োজিত করা। মন্দির যেমন মানুষকে পবিত্রতা শেখায়, ভাষাও তেমনি মানুষের মনকে সংস্কৃতিবান করে তোলে।

সার্থক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে মাতৃভাষার ভূমিকা অপরিসীম। মানুষ তার স্বপ্ন দেখে এবং চিন্তা করে মাতৃভাষায়। চিত্তরঞ্জন দাশের মতে, বিজাতীয় ভাষা আমাদের কেবল তথ্য দেয়, কিন্তু মাতৃভাষা আমাদের বোধ ও মননকে পরিপুষ্ট করে। মাতৃভাষার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী হয় এবং তার মৌলিকত্ব বজায় রাখতে সাহায্য করে। নিজের ভাষাকে অবজ্ঞা করে যে মানুষ বড় হতে চায়, সে আসলে শিকড়হীন বৃক্ষের মতো দুর্বল। তাই প্রকৃত মানুষ হতে গেলে আগে নিজের ভাষার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে এবং তাকে সম্মান করতে শিখতে হবে—এটাই কবির অভিমত।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার