মকটেস্ট বেছে নাও

অফলাইন মকটেস্ট

খুব শীঘ্রই আপলোড হবে!

নবম শ্রেণি: বাংলা, নব নব সৃষ্টি -সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাধর্মী দীর্ঘ প্রশ্নত্তোর মান ৫

অধ্যায় 6: নব নব সৃষ্টি
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)

নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:

1. “সংস্কৃত ভাষা আত্মনির্ভরশীল।” – প্রাবন্ধিক কেন সংস্কৃত ভাষাকে আত্মনির্ভরশীল বলেছেন? বর্তমান যুগের বাংলা ভাষা কি আত্মনির্ভরশীল? আলোচনা করো। (3+2=5)

উত্তর দেখো

উত্তর:

সংস্কৃত আত্মনির্ভরশীল হওয়ার কারণ: প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে সংস্কৃত ভাষাকে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল ভাষা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর প্রধান কারণ হলো, সংস্কৃত ভাষার নিজস্ব শব্দভাণ্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। নতুন কোনো চিন্তা, আধুনিক কোনো অনুভূতি বা অচেনা কোনো বস্তুকে বোঝানোর জন্য যখনই নতুন শব্দের প্রয়োজন হয়, সংস্কৃত ভাষা কখনোই অন্য কোনো বিদেশি ভাষার কাছে ঋণ গ্রহণ করে না। বরং সে নিজের শব্দভাণ্ডারে থাকা প্রাচীন নিজস্ব ধাতু বা শব্দাবয়বের সামান্য অদলবদল ঘটিয়ে প্রয়োজনীয় নতুন শব্দটি তৈরি করে নেয়। নিজস্ব উপাদানের সাহায্যে নতুন শব্দ সৃষ্টির এই স্বাধীন ক্ষমতার জন্যই সংস্কৃত ভাষাকে আত্মনির্ভরশীল বলা হয়েছে।

বাংলা ভাষার আত্মনির্ভরশীলতা: প্রাবন্ধিকের মতে, বর্তমান যুগের বাংলা ভাষা আত্মনির্ভরশীল নয়। কারণ, বাংলা ভাষা প্রয়োজনের তাগিদে বা নতুন জ্ঞানবিজ্ঞানের সংস্পর্শে এসে নিজের শব্দভাণ্ডারের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে পারেনি। বরং সে যুগ যুগ ধরে অনায়াসে আরবি, ফারসি, ইংরেজি, পর্তুগিজ প্রভৃতি ভাষা থেকে প্রচুর বিদেশি শব্দ ধার করেছে। এই ব্যাপক শব্দ ধার করার ফলে বাংলা একটি মিশ্র প্রকৃতির ভাষায় পরিণত হয়েছে এবং অন্য ভাষার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

2. “বিদেশি শব্দ নেওয়া ভালো না মন্দ সে প্রশ্ন অবান্তর।” – প্রাবন্ধিক কেন এ কথা বলেছেন? বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দের প্রভাব আলোচনা করো। (3+2=5)

উত্তর দেখো

উত্তর:

প্রশ্নটি অবান্তর হওয়ার কারণ: ভাষার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের মনের ভাবকে সহজ, সাবলীল এবং যুগোপযোগী করে প্রকাশ করা। পৃথিবীতে ধর্ম, রাজনীতি বা সংস্কৃতির সংঘাত ও মিলনের ফলে এক ভাষার শব্দ অন্য ভাষায় প্রবেশ করবেই, এটি একটি স্বাভাবিক এবং ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে, যুগের প্রয়োজনে এবং জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রসারের সঙ্গে তাল মেলাতে গেলে বিদেশি শব্দ গ্রহণ করা অপরিহার্য। তাই ভাষা শুদ্ধ রাখার নামে বিদেশি শব্দ নেওয়া ভালো না মন্দ, এই নিয়ে অহেতুক বিচার-বিশ্লেষণ বা তর্ক করাটা প্রাবন্ধিকের কাছে সম্পূর্ণ অর্থহীন বা অবান্তর বলে মনে হয়েছে।

বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দের প্রভাব: বাংলা ভাষাতেও প্রয়োজনের তাগিদে প্রচুর আরবি, ফারসি, পর্তুগিজ ও ইংরেজি শব্দ প্রবেশ করেছে। পাঠান-মোগল যুগে ফারসি এবং ব্রিটিশ যুগে ইংরেজির ব্যাপক প্রভাব বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে বিশালভাবে সমৃদ্ধ করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কাজী নজরুল ইসলামের মতো মহান কবিরাও তাঁদের রচনায় স্বাচ্ছন্দ্যে আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করে ভাষাকে আরও শক্তিশালী এবং প্রাণবন্ত করে তুলেছেন।

3. “বাঙালির চরিত্রে বিদ্রোহ বিদ্যমান” – ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধ অবলম্বনে প্রাবন্ধিকের এই মন্তব্যের কারণ বিশ্লেষণ করো। (5)

উত্তর দেখো

উত্তর:

প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে বাঙালির জাতীয় চরিত্রের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উজ্জ্বল দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বাঙালির চরিত্রে চিরকালই এক সহজাত ‘বিদ্রোহ’ বিদ্যমান। এর কারণগুলি হলো:

বাঙালি জাতি চিরকালই গতানুগতিকতা, অন্ধ অনুকরণ এবং অন্যায়ের বিরোধী। রাজনীতি, ধর্ম, সমাজ কিংবা সাহিত্য— জীবনের যে কোনো ক্ষেত্রেই বাঙালি যখনই সত্য, শিব ও সুন্দরের অভাব দেখেছে, তখনই তার বিরুদ্ধে প্রবলভাবে রুখে দাঁড়িয়েছে। সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বাঙালি নিজের প্রাচীন ঐতিহ্যকেও ভাঙতে দ্বিধা করেনি, আবার দরকারে বিদেশি জিনিসকেও আপন করে নিয়েছে।

বাঙালি কখনো অন্যের চাপিয়ে দেওয়া মতাদর্শ বা জোর-জুলুম সহজে মেনে নেয়নি। ধর্ম বদলালেও বাঙালি তার মাতৃভাষা বাংলাকে কখনো ত্যাগ করেনি। পদাবলী কীর্তন থেকে শুরু করে আধুনিক সাহিত্য— সর্বত্রই বাঙালির এই স্বাধীন চিন্তাধারা, মাতৃভাষার প্রতি গর্ব এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর মানসিকতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সত্যকে গ্রহণ করা এবং অন্যায়কে বর্জন করার এই স্বাধীন ও অদম্য মানসিকতার জন্যই প্রাবন্ধিক বাঙালির চরিত্রকে বিদ্রোহী বলেছেন।

4. “ধর্ম বদলালেই জাতির মাতৃভাষা বদলায় না।” – মন্তব্যটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধ অবলম্বনে বুঝিয়ে দাও। (5)

উত্তর দেখো

উত্তর:

উদ্ধৃত মন্তব্যটির মাধ্যমে প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী ভাষা এবং একটি জাতির সংস্কৃতির গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা অত্যন্ত সুন্দরভাবে বুঝিয়েছেন।

ধর্ম হলো মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা উপাসনার মাধ্যম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বা পারিপার্শ্বিক প্রভাবে মানুষ ধর্ম পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু মাতৃভাষা হলো একটি জাতির অস্তিত্ব, আবেগ এবং আত্মপরিচয়ের মূল ভিত্তি। মানুষ যে মাটিতে জন্মায়, যে হাওয়ায় শ্বাস নেয়, তার সেই নাড়ির টান মাতৃভাষার মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায়।

প্রাবন্ধিক বাঙালির উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে, ঐতিহাসিক কারণে বহু বাঙালি ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু মুসলমান হয়েও তারা আরবি, ফারসি বা উর্দু ভাষাকে নিজেদের মাতৃভাষা হিসেবে মেনে নেয়নি। তারা বাংলার মাটি, বাংলার সাহিত্য এবং বাংলা ভাষাকেই পরম মমতায় আপন করে রেখেছে। ধর্মীয় পরিচয় তাদের ভাষিক পরিচয়কে মুছে ফেলতে পারেনি। মাতৃভাষার প্রতি মানুষের এই অকৃত্রিম নাড়ির টান এবং ভালোবাসাকে প্রমাণ করার জন্যই প্রাবন্ধিক এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যটি করেছেন।

5. ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। (5)

উত্তর দেখো

উত্তর:

সাহিত্যে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি সার্থক নামকরণের মাধ্যমেই রচনার মূল ভাব ও অন্তর্নিহিত বক্তব্য পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর আলোচ্য প্রবন্ধটির ‘নব নব সৃষ্টি’ নামকরণটি বিষয়বস্তুর দিক থেকে সম্পূর্ণ সার্থক এবং তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রবন্ধটির মূল আলোচ্য বিষয় হলো ভাষার বিবর্তন এবং তার মিশ্র প্রকৃতি। প্রাবন্ধিক দেখিয়েছেন যে, সংস্কৃত বা প্রাচীন গ্রিক ভাষার মতো কিছু ভাষা নিজস্ব শব্দভাণ্ডার থেকে নতুন শব্দ সৃষ্টি করে। কিন্তু বাংলা বা ইংরেজির মতো ভাষাগুলি যুগের প্রয়োজনে, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রসারের কারণে প্রতিনিয়ত বিদেশি শব্দ গ্রহণ করে। বিদেশি শব্দের এই নিরন্তর অনুপ্রবেশ ভাষার কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি ভাষার মধ্যে এক নতুন সজীবতা বা ‘নব নব সৃষ্টি’র উন্মেষ ঘটায়।

ভাষা হলো প্রবহমান নদীর মতো। নতুন শব্দ গ্রহণ এবং নতুন ভাব প্রকাশের মাধ্যমেই ভাষা যুগোপযোগী হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষায় আরবি, ফারসি বা ইংরেজি শব্দের সফল প্রয়োগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের মতো কবিরা সাহিত্যে যে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন, তা এই নব নব সৃষ্টিরই ফসল। যেহেতু ভাষার এই সৃজনশীলতা, গ্রহণক্ষমতা এবং নতুন রূপ পরিগ্রহ করার বিষয়টিই প্রবন্ধের মূল উপজীব্য, তাই ‘নব নব সৃষ্টি’ নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক ও যুক্তিযুক্ত হয়েছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার