নবম শ্রেণি: বাংলা, আকাশে সাতটি তারা – জীবনানন্দ দাশ, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর মান 5
অধ্যায় 12: আকাশে সাতটি তারা
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. “আকাশে সাতটি তারা যখন ফুটে ওঠে আমি এই ঘাসে / বসে থাকি;” – কবি ঘাসে বসে কী কী প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করেন তা নিজের ভাষায় লেখো। (5)
উত্তর দেখো
জীবনানন্দ দাশের ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি পল্লিপ্রকৃতির এক অপরূপ সন্ধ্যার চিত্র এঁকেছেন। দিনের শেষে আকাশে যখন সপ্তর্ষিমণ্ডল বা সাতটি তারা ফুটে ওঠে, তখন কবি পল্লিবাংলার নরম ঘাসের ওপর বসে প্রকৃতির মায়াময় রূপ অবলোকন করেন।
কবি দেখেন, সূর্যাস্তের সময় পশ্চিম আকাশে ভাসমান কামরাঙা ফলের মতো লাল রঙের মেঘ মৃত মনিয়া পাখির মতো ধীরে ধীরে গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে যায়। এরপরই প্রকৃতির বুকে অত্যন্ত শান্ত এবং অনুগতভাবে নেমে আসে বাংলার নীল সন্ধ্যা। এই অন্ধকারকে কবির মনে হয় যেন এক রূপসী কেশবতী কন্যা। সেই কন্যার মেঘবরণ কালো চুলের স্পর্শে কবির চোখ-মুখ ঢাকা পড়ে যায়।
কবি অনুভব করেন, সেই কেশবতী কন্যার অজস্র চুলের চুম্বন যেন অবিরত ঝরে পড়ছে পল্লিগ্রামের অতি পরিচিত হিজল, কাঁঠাল এবং জাম গাছের পাতায় পাতায়। চোখের দৃষ্টির পাশাপাশি কবি ঘ্রাণ দিয়েও প্রকৃতির এই পরিবর্তনকে অবলোকন করেন। নরম ধান, কলমি লতা, হাঁসের পালক এবং পুকুরের জলের মৃদু আঁশটে গন্ধের মাঝেই তিনি বাংলার এই নিজস্ব রূপকে পরম মমতায় অনুভব করেন।
2. “পৃথিবীর কোনো পথ এ কন্যারে দেখে নি কো” – ‘কন্যা’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? পৃথিবীর কোনো পথ তাকে দেখেনি কেন? কবিতা অবলম্বনে বুঝিয়ে দাও। (1+4=5)
উত্তর দেখো
‘কন্যা’র পরিচয়: ‘কন্যা’ বলতে কবি জীবনানন্দ দাশ পল্লিবাংলার বুকে ধীরে ধীরে নেমে আসা শান্ত, স্নিগ্ধ এবং মায়াময় অন্ধকার বা নীল সন্ধ্যাকে বুঝিয়েছেন, যাকে তিনি ‘কেশবতী কন্যা’ হিসেবে কল্পনা করেছেন।
পৃথিবীর কোনো পথ তাকে না দেখার কারণ: জীবনানন্দ দাশ ছিলেন রূপসী বাংলার কবি। বাংলার মাটি এবং প্রকৃতির প্রতি তাঁর ছিল এক অটুট টান এবং গভীর ভালোবাসা। কবি মনে করেন, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে বা প্রান্তে বাংলার মতো এমন স্নিগ্ধ এবং শান্ত সন্ধ্যা নামে না। বাংলার এই সন্ধ্যা কালবৈশাখীর মতো ভয়ংকর নয়, বরং তা এক অনুগত কন্যার মতো নিঃশব্দে প্রকৃতির বুকে ছড়িয়ে পড়ে। এই সন্ধ্যার অন্ধকারের স্পর্শ কবির কাছে নারী-চুলের কোমল স্পর্ষের মতো মনে হয়, যা হিজল, কাঁঠাল এবং জাম গাছের পাতায় পাতায় মমতায় ঝরে পড়ে। ধানের গন্ধ, কলমির ঘ্রাণ এবং পুকুরের জলের মতো অতি সাধারণ উপাদানে ঘেরা এই মায়াময় রূপটি পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখতে পাওয়া অসম্ভব। তাই পৃথিবীর অন্য কোনো পথ অর্থাৎ অন্য কোনো দেশের প্রকৃতি এমন অনন্য রূপসী কন্যাকে বা এমন অপরূপ সন্ধ্যাকে কোনোদিন দেখতে পায়নি বলে কবি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।
3. “এরই মাঝে বাংলার প্রাণ:” – উদ্ধৃতাংশটির প্রসঙ্গ নির্দেশ করে বাংলার প্রাণের যে পরিচয় কবি জীবনানন্দ দাশ দিয়েছেন, তা নিজের ভাষায় লেখো। (1+4=5)
উত্তর দেখো
প্রসঙ্গ: ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতার শেষ অংশে পল্লিবাংলার অতি সাধারণ কিন্তু নিজস্ব কিছু উপাদান এবং তাদের অকৃত্রিম ঘ্রাণের কথা উল্লেখ করার প্রসঙ্গেই কবি এই উক্তিটি করেছেন।
বাংলার প্রাণের পরিচয়: কবি জীবনানন্দ দাশের দৃষ্টিতে বাংলার প্রকৃত রূপ এবং প্রাণ কোনো বিশাল রাজপ্রাসাদ, কৃত্রিম চাকচিক্য বা আড়ম্বরের মধ্যে লুকিয়ে নেই। বাংলার আসল প্রাণ স্পন্দিত হয় তার পল্লিপ্রকৃতির অত্যন্ত সাধারণ, তুচ্ছ এবং মাটির কাছাকাছি থাকা উপাদানগুলির মধ্যে।
সন্ধ্যা নেমে এলেই পল্লিপ্রকৃতির বুক থেকে যে এক অদ্ভুত সোঁদা এবং স্নিগ্ধ গন্ধ ভেসে আসে, তার মধ্যেই বাংলার আসল পরিচয় লুকিয়ে আছে। মাঠের নরম ধান, পুকুরের জলের কলমি লতা, হাঁসের ভেজা পালক এবং শর ঘাসের গন্ধ বাংলার এক পরিচিত ঘ্রাণ। এর সঙ্গে মিশে থাকে পুকুরের চাঁদা ও সরপুঁটি মাছের মৃদু আঁশটে গন্ধ, চাল ধোয়া কিশোরীর ভিজে শীতল হাত, কিশোরের পায়ে দলা হওয়া মুথা ঘাস এবং ঝরে পড়া লাল লাল বটফলের ক্লান্ত নীরবতার ঘ্রাণ। এই সবকিছুর এক অপূর্ব মিশ্রণই হলো রূপসী বাংলার নিজস্ব সত্তা। এই সহজ-সরল এবং অকৃত্রিম রূপ-রস-গন্ধের মাঝেই কবি বাংলার শাশ্বত প্রাণকে খুঁজে পেয়েছেন।
4. ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবির যে নিসর্গপ্রেম বা প্রকৃতিপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়, তা কবিতা অবলম্বনে আলোচনা করো। (5)
উত্তর দেখো
বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দ দাশ ‘রূপসী বাংলার কবি’ বা প্রকৃতির কবি হিসেবেই সর্বাধিক পরিচিত। তাঁর ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতাটি সেই গভীর নিসর্গপ্রেম এবং অতীন্দ্রিয় অনুভূতির এক অনবদ্য দলিল।
কবিতায় দেখা যায়, কবি প্রকৃতির বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে তার অন্তর্নিহিত রূপটিকে বেশি ভালোবাসেন। দিন শেষের সূর্যাস্তকে তিনি কামরাঙা লাল মেঘ ও মৃত মনিয়া পাখির এক করুণ এবং সুন্দর চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। আকাশে সাতটি তারা ফুটে উঠলে যে সন্ধ্যা নেমে আসে, কবি তাকে অন্ধকার হিসেবে না দেখে এক মেঘবরণ চুলওয়ালা ‘কেশবতী কন্যা’ হিসেবে কল্পনা করেছেন। সেই অন্ধকারের স্নিগ্ধ স্পর্শ তিনি নিজের চোখ ও মুখে অনুভব করেন।
কবির এই প্রকৃতিপ্রেম কেবল দৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি ঘ্রাণ এবং স্পর্শ দিয়েও প্রকৃতিকে অনুভব করেছেন। নরম ধান, কলমি লতা, হাঁসের পালক, শর ঘাস, পুকুরের মাছের আঁশটে গন্ধ, কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে শীতল হাত এবং কিশোরের পায়ে দলা মুথা ঘাস— এই অত্যন্ত তুচ্ছ এবং সাধারণ উপাদানগুলির প্রতি কবির এক অসীম মমতা প্রকাশ পেয়েছে। পল্লিবাংলার এই অকৃত্রিম রূপ, রস এবং গন্ধের মধ্যেই তিনি বাংলার আসল প্রাণ খুঁজে পেয়েছেন, যা তাঁর গভীর ও শাশ্বত প্রকৃতিপ্রেমেরই এক উজ্জ্বল প্রমাণ।
5. ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। (5)
উত্তর দেখো
সাহিত্যে নামকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমেই পাঠকেরা রচনার মূল ভাববস্তুর সঙ্গে পরিচিত হন। জীবনানন্দ দাশের আলোচ্য কবিতাটির ‘আকাশে সাতটি তারা’ নামকরণটি বিষয়বস্তু এবং ব্যঞ্জনা— উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং সার্থক।
কবিতাটি শুরুই হয়েছে আকাশে সাতটি তারা বা সপ্তর্ষিমণ্ডল ফুটে ওঠার দৃশ্য দিয়ে। এই সাতটি তারা ফুটে ওঠাই হলো দিন শেষ হয়ে সন্ধ্যা নামার প্রধান সংকেত। এই ঘটনাটি ঘটার পরেই বাংলার আকাশে এক মায়াময় কেশবতী কন্যারূপী অন্ধকার নেমে আসে। অর্থাৎ, আকাশে সাতটি তারা ফুটে ওঠার এই মুহূর্তটিই হলো কবিতার সমস্ত প্রাকৃতিক বর্ণনা এবং কবির অতীন্দ্রিয় অনুভূতির মূল সূত্রপাত বা উদ্দীপক।
এই তারাদের উপস্থিতির পর থেকেই কবি পল্লিবাংলার আসল রূপটি অনুভব করতে শুরু করেন। হিজল, কাঁঠাল, জাম গাছের পাতায় অন্ধকারের স্পর্শ, নরম ধানের গন্ধ, পুকুরের জলের ঘ্রাণ এবং কলমি দামের মায়া— এই সমস্ত কিছু যেন ওই আকাশে সাতটি তারা ফুটে ওঠার মুহূর্ত থেকেই জীবন্ত হয়ে ওঠে। যেহেতু সমগ্র কবিতাটির পরিবেশ, অনুভূতি এবং বাংলার প্রাণের স্পন্দন এই একটি বিশেষ মুহূর্তকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে, তাই ‘আকাশে সাতটি তারা’ নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক এবং অর্থবহ হয়েছে।