মকটেস্ট বেছে নাও

অফলাইন মকটেস্ট

খুব শীঘ্রই আপলোড হবে!

নবম শ্রেণি: বাংলা, নিরুদ্দেশ – প্রেমেন্দ্র মিত্র, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর মান 5

অধ্যায় 15: নিরুদ্দেশ
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)

নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:

1. নিরুদ্দেশ হওয়ার পর শোভনের মানসিক অবস্থার বিবর্তন আলোচনা করো। খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন তার ওপর কী প্রভাব ফেলেছিল? (3+2=5)

উত্তর দেখো
উত্তর: প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পে কেন্দ্রীয় চরিত্র শোভন বাবার সামান্য বকাবকিতে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল। প্রথম দিকে তার মনে কেবল তীব্র অভিমান এবং জেদ ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তার সেই অভিমান একধরনের বিকৃত আত্মতৃপ্তিতে পরিণত হয়। সে যখন বাইরে সাধারণ মানুষের মতো তুচ্ছ জীবন কাটাচ্ছিল, তখন খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন তার মানসিকতাকে আমূল বদলে দেয়।

খবরের কাগজে যখন তার বাবা তাকে ফিরে আসার জন্য কাতর আবেদন জানিয়ে বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করেন, তখন শোভন নিজেকে কোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসের নায়ক বা ‘হিরো’ মনে করতে শুরু করে। বিজ্ঞাপনগুলি তার মনে এক মিথ্যা অহংকার ও বীরত্বের জন্ম দেয়। সে নিজের গুরুত্ব বুঝতে পেরে গর্ববোধ করত। বিজ্ঞাপনে বাবা-মায়ের অসহায় আর্তি তাকে অনুতপ্ত করার বদলে বরং তার পালিয়ে থাকাকে আরও দীর্ঘায়িত করেছিল। অবশেষে ২ বছর পর যখন সে বাড়ি ফেরে, তখন তার মনের সেই নায়কোচিত ভাব সম্পূর্ণ ভেঙে যায় এবং সে বাস্তবের কঠোর সত্যের মুখোমুখি হয়।

2. “কিন্তু তার চেয়েও বড়ো ট্র্যাজেডি কি জানো?” – সোমেশ কোন্ ট্র্যাজেডির কথা বলেছেন? গল্প অবলম্বনে সেই ট্র্যাজেডির মর্মস্পর্শী বর্ণনা দাও। (1+4=5)

উত্তর দেখো
উত্তর: এখানে সোমেশ নিরুদ্দেশ হওয়া শোভনের জীবনে ঘটে যাওয়া এক চরম মর্মান্তিক পরিণতির কথা বলেছেন।

শোভন যখন ২ বছর পর অনুতপ্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছিল, তখন সে দেখে তার বাবা মারা গেছেন এবং তার মা অন্ধপ্রায় অবস্থায় এক প্রতারক বা নকল ছেলেকে নিজের ছেলে হিসেবে মেনে নিয়ে সেবা করছেন। প্রতারক ছেলেটি কৌশলে শোভনের কানের কাটা দাগ নকল করে মায়ের বিশ্বাস অর্জন করেছিল। আসল শোভন যখন মায়ের ঘরে প্রবেশ করে, সে দেখে মা সেই অচেনা ছেলেটিকে পরম মমতায় বেদানার রস খাওয়াচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে শোভন বুঝতে পারে যে, সে যদি এখন নিজের আসল পরিচয় দেয়, তবে মায়ের ওই ভুল ভেঙে যাবে এবং তিনি প্রতারিত হওয়ার শোকে হয়তো প্রাণ হারাবেন। মায়ের মানসিক শান্তি রক্ষার জন্য শোভন চরম আত্মত্যাগ করে নিজের পরিচয় গোপন রাখে এবং চিরকালের জন্য সত্যি সত্যি নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। নিজের বাড়িতে ফিরেও নিজের পরিচয় দিতে না পারা এবং মাকে চিরতরে হারানোই হলো সেই ‘বড়ো ট্র্যাজেডি’।

3. ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পে সোমেশ চরিত্রটি কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা আলোচনা করো। সোমেশই কি আসল শোভন? উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও। (2+3=5)

উত্তর দেখো
উত্তর: ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পে সোমেশ চরিত্রটি গল্পের কথক এবং চালিকাশক্তি। তিনি নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনের পেছনের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের মাধ্যমে গল্পের গভীরতাকে প্রকাশ করেছেন। তাঁর বলা গল্পের মাধ্যমেই পাঠক নিরুদ্দেশ হওয়া ছেলেদের এবং তাদের পরিবারের করুণ পরিণতি জানতে পারে।

গল্পের শেষে পাঠকদের মনে দৃঢ় ধারণা জন্মে যে, সোমেশই আসলে সেই নিরুদ্দেশ হওয়া আসল শোভন। এর সপক্ষে প্রধান যুক্তি হলো— শোভনের ফিরে আসার কাহিনিটি সোমেশ এত সূক্ষ্মভাবে বর্ণনা করেছেন, যা একমাত্র যার সাথে ঘটেছে তার পক্ষেই সম্ভব। বিশেষ করে মায়ের ঘরের সেই মর্মস্পর্শী দৃশ্য এবং মনের যন্ত্রণার বর্ণনা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যেত। এছাড়া, গল্পটি শেষ করার পর সোমেশের হঠাৎ চুপ করে যাওয়া, এক গভীর দীর্ঘশ্বাস এবং জানালার বাইরে দুর্যোগের দিকে তাকিয়ে থাকা তার ভেতরের চাপা কষ্টকেই প্রকাশ করে। এই নিস্তব্ধতা প্রমাণ করে যে তিনি অন্য কারও গল্প নয়, বরং নিজের জীবনের ট্র্যাজেডিই বর্ণনা করছিলেন।

4. ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পের নামকরণ কতখানি সার্থক হয়েছে তা বিচার করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর: প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পের নামকরণটি বিষয়বস্তু এবং ব্যঞ্জনা— উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত সার্থক হয়েছে। ‘নিরুদ্দেশ’ শব্দটির সাধারণ অর্থ হলো হারিয়ে যাওয়া বা হদিস না পাওয়া। গল্পটি শুরুই হয়েছে সংবাদপত্রে নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন নিয়ে বিতর্কের মধ্য দিয়ে।

গল্পের প্রথম স্তরে আমরা দেখি শোভন নামে একটি ছেলে অভিমান করে নিরুদ্দেশ হয়েছে। দ্বিতীয় স্তরে, ২ বছর পর সে যখন ফিরে আসে, সে দেখে তার অস্তিত্ব পরিবার থেকে চিরতরে মুছে গেছে এবং অন্য এক প্রতারক তার জায়গা দখল করেছে। গল্পের সবচেয়ে বড় ব্যঞ্জনা হলো শোভনের অন্তিম নিরুদ্দেশ হওয়া। সে যখন দেখে মা ভুল করে অন্যকে নিজের ছেলে ভেবে সুখে আছেন, তখন মায়ের সেই শান্তি রক্ষার্থে সে নিজের পরিচয় লুকিয়ে চিরকালের জন্য সেই বাড়ি থেকে চলে যায়। সে এখন আর শুধু অভিমানী পলাতক নয়, বরং সে এক ভবঘুরে, নামহীন ব্যক্তিতে পরিণত হয়ে সত্যি সত্যি নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। যেহেতু একটি নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে শুরু হয়ে একজন মানুষের চিরস্থায়ী নিরুদ্দেশ হওয়ার ট্র্যাজেডিতে গল্পটি শেষ হয়েছে, তাই এই নামকরণটি সার্থক।

5. শোভনের মায়ের অন্ধস্নেহ এবং প্রতারক ছেলের সুযোগসন্ধানী মানসিকতার যে চিত্র গল্পে ফুটে উঠেছে তা সংক্ষেপে বর্ণনা করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর: ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পে শোভনের মা হলেন পুত্রশোকে কাতর এক অসহায় মায়ের প্রতিচ্ছবি। তার দৃষ্টিহীনতা বা অন্ধপ্রায় অবস্থা কেবল শারীরিক নয়, বরং মানসিকও। তিনি এতটাই ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আকুলতায় ডুবেছিলেন যে, যেকোনো সুযোগেই কেউ তাকে ‘মা’ বলে ডাকলে তিনি তাকে বিশ্বাস করে নেন। এই অন্ধস্নেহের কারণেই তিনি একজন অপরিচিত প্রতারককে নিজের আসল ছেলে ভেবে পরম মমতায় সেবা করতে শুরু করেন।

অন্যদিকে, ওই প্রতারক ছেলেটি হলো সমাজের ধূর্ত এবং বিবেকহীন মানুষের প্রতীক। সে সংবাদপত্রের নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন পড়ে নিখুঁতভাবে শোভনের তথ্য সংগ্রহ করেছিল এবং নিজের কানের কাছে কাটা দাগ তৈরি করে নিজেকে আসল শোভন হিসেবে প্রমাণ করেছিল। শোভনের বাবার মৃত্যুর পর অসহায় মায়ের সম্পত্তি এবং স্নেহের সুযোগ নিয়ে সে আয়েশি জীবন কাটাচ্ছিল। তার এই জঘন্য প্রতারণা আর মায়ের অন্ধস্নেহ মিলে আসল শোভনের ফিরে আসার সমস্ত পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। এই পরিস্থিতির ফলেই আসল ছেলে নিজের বাড়িতেই অনাহুত হয়ে পড়ে এবং চিরস্থায়ী যন্ত্রণার শিকার হয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার