মকটেস্ট বেছে নাও

অফলাইন মকটেস্ট

খুব শীঘ্রই আপলোড হবে!

নবম শ্রেণি: বাংলা, চন্দ্রনাথ – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর মান 5

অধ্যায় 20: চন্দ্রনাথ
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)

নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:

1. ‘চন্দ্রনাথ’ গল্প অবলম্বনে চন্দ্রনাথের চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো। (5)

উত্তর দেখো
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রনাথ’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র চন্দ্রনাথ এক অসামান্য ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও অনমনীয় মানসিকতার অধিকারী। তাঁর চরিত্রটি নিচের বৈশিষ্ট্যগুলির মাধ্যমে ফুটে উঠেছে:

ক) অদম্য আত্মসম্মানবোধ: চন্দ্রনাথের চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর প্রচণ্ড আত্মমর্যাদা। তিনি কারোর করুণা বা দয়ার দান গ্রহণ করতে রাজি ছিলেন না। হিরুর দেওয়া নিমন্ত্রণ বা স্কুলের প্রাইজ— সবকিছুই তিনি তাঁর দম্ভ ও সম্মানের খাতিরে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
খ) কঠোর ও অনমনীয় জেদ: চন্দ্রনাথ ছিলেন অত্যন্ত জেদি। তিনি যা সত্য বলে বিশ্বাস করতেন, তা থেকে তাঁকে কেউ টলাতে পারত না। তাঁর এই কাঠিন্য অনেক সময় তাঁকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।
গ) নিঃসঙ্গ ব্যক্তিত্ব: তিনি সাধারণ ছাত্রদের মতো আমোদ-প্রমোদে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি ছিলেন পাহাড়ের মতো একাকী ও গম্ভীর। পনেরো বছর পরেও তাঁর এই চারিত্রিক গাম্ভীর্য বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি।
ঘ) প্রতিভাবান ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী: চন্দ্রনাথ ছিলেন অসম্ভব মেধাবী। তাঁর ললাটে এক অদৃশ্য ‘অগ্নিকণা’র তিলক ছিল, যা তাঁর প্রখর বুদ্ধি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিচয় দেয়।

পরিশেষে বলা যায়, চন্দ্রনাথ এমন এক চরিত্র যিনি নিজের আদর্শের জন্য একাকী পথ চলতেও দ্বিধা করেন না। তাঁর দম্ভ যেমন তাঁর শক্তি, তেমনই তা তাঁর নিঃসঙ্গতারও কারণ।

2. হিরুর দেওয়া নিমন্ত্রণ ও পুরস্কার গ্রহণ না করার মাধ্যমে চন্দ্রনাথের কোন্ মানসিকতা ফুটে উঠেছে? (5)

উত্তর দেখো
হিরু পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার পর যখন চন্দ্রনাথকে প্রীতিভোজে নিমন্ত্রণ করে এবং একটি বিশেষ পুরস্কার দিতে চায়, তখন চন্দ্রনাথ তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। এর মাধ্যমে তাঁর চরিত্রের গভীর মনস্তত্ত্ব প্রকাশিত হয়েছে:

প্রথমত, চন্দ্রনাথ হিরুকে একজন ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর’ ছাত্র বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, হিরু কেবল ভাগ্যের জোরে বা চাটুকারিতার মাধ্যমে প্রথম হয়েছে। নিজের চেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন কারোর হাত থেকে ‘পুরস্কার’ নেওয়া তাঁর কাছে ছিল চরম অবমাননাকর।

দ্বিতীয়ত, চন্দ্রনাথের কাছে দম্ভ ছিল এক পবিত্র বস্তু। তিনি হিরুর আভিজাত্য বা অর্থের প্রদর্শনীকে তুচ্ছ জ্ঞান করতেন। হিরুর বিনয়কে তিনি এক প্রকার ভণ্ডামি বলে মনে করতেন। তিনি কারোর অনুগ্রহ নিয়ে সমাজে বেঁচে থাকতে চাননি। এই প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে চন্দ্রনাথ প্রমাণ করেছেন যে, তিনি পরাজয় স্বীকার করতে রাজি থাকলেও কারোর করুণার পাত্র হতে রাজি নন। এটি তাঁর অপ্রতিদ্বন্দ্বী মেধা এবং পাহাড়ের মতো দৃঢ় ব্যক্তিসত্ত্বারই বহিঃপ্রকাশ।

3. “দম্ভ চন্দ্রনাথের কাছে পবিত্র বস্তু”— উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো। (5)

উত্তর দেখো
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রনাথ’ গল্পে দম্ভ শব্দটি এক বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে দম্ভ একটি দোষ হলেও চন্দ্রনাথের কাছে তা ছিল তাঁর চরিত্রের আভিজাত্য ও বিশুদ্ধতা রক্ষার উপায়।

চন্দ্রনাথের এই দম্ভ আসলে তাঁর আত্মসম্মানবোধের নামান্তর। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, নিজের ক্ষমতার ওপর অটল থাকাই জীবনের শ্রেষ্ঠ ধর্ম। তিনি সমাজের লৌকিকতা বা চাটুকারিতার ধার ধারতেন না। বিদ্যালয়ের হেডমাস্টার মশাই বা হিরুর খুড়োমশাই— কারোর অনুরোধেই তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি।

এই দম্ভ তাঁকে অন্যের কাছে অহংকারী করে তুললেও, তাঁর নিজের কাছে এটি ছিল অন্তরের তেজ। তিনি কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। তাঁর এই দম্ভ ছিল হিমালয়ের মতো অটল। লেখক বোঝাতে চেয়েছেন যে, চন্দ্রনাথের এই দম্ভ কোনো অন্তঃসারশূন্য অহংকার নয়, বরং এটি তাঁর প্রবল আত্মবিশ্বাসের প্রতীক, যা তাঁকে পৃথিবীর ভিড়ে একাকী কিন্তু স্বতন্ত্র করে রেখেছিল।

4. দীর্ঘ পনেরো বছর পর দেখা হওয়া চন্দ্রনাথ ও কথকের কথোপকথন এবং তার মাধ্যমে চন্দ্রনাথের যে রূপ ফুটে উঠেছে তা লেখো। (5)

উত্তর দেখো
স্কুল জীবনের দীর্ঘ পনেরো বছর পর এক নির্জন রেলওয়ে স্টেশনে কথক নরেশের সাথে চন্দ্রনাথের আবার দেখা হয়। এই সাক্ষাতের দৃশ্যটি গল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অংশ।

চন্দ্রনাথ তখন অনেকটা শীর্ণকায়, মাথার চুল বিরল হয়ে এসেছে, কিন্তু তাঁর প্রশস্ত ললাট আর জ্যোতির্ময় চোখের সেই প্রখর তেজ বিন্দুমাত্র কমেনি। তাঁর গলার স্বর আগের মতোই গম্ভীর ও অবিচল। কথক যখন তাঁকে প্রশ্ন করেন, চন্দ্রনাথ তখন জানান যে তিনি এখনও তাঁর সেই অদম্য জেদ নিয়েই জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি কোনো সাংসারিক মোহে আবদ্ধ হননি।

এই সাক্ষাতের মাধ্যমে চন্দ্রনাথের চিরন্তন রূপটি ফুটে উঠেছে। তিনি সময়ের কাছে হেরে যাননি। জগত বদলে গেলেও চন্দ্রনাথ তাঁর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে অটল রয়েছেন। তাঁর ভবঘুরে ও নিঃসঙ্গ জীবন ইঙ্গিত দেয় যে, তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাঁকে সাংসারিক সুখ দেয়নি ঠিকই, কিন্তু তাঁর আত্মমর্যাদা আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে। পনেরো বছর পরেও তিনি সেই একই চন্দ্রনাথ— পাহাড়ের মতো একাকী ও উন্নতশির।

5. “চন্দ্রনাথের কপালে যেন এক অগ্নিকণার তিলক আঁকা ছিল”— উক্তিটি ব্যাখ্যা করো। (5)

উত্তর দেখো
কথক নরেশ চন্দ্রনাথের প্রশস্ত ললাট বা কপালের বর্ণনায় ‘অগ্নিকণা’র কথাটি ব্যবহার করেছেন। এটি কোনো বাস্তব শারীরিক তিলক নয়, বরং চন্দ্রনাথের অসামান্য প্রতিভাশক্তি এবং চারিত্রিক কাঠিন্যের এক চমৎকার রূপক।

চন্দ্রনাথের বুদ্ধির প্রখরতা এবং তাঁর অদম্য জেদ সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল। আগুনের শিখা যেমন সবকিছুকে পুড়িয়ে শুদ্ধ করে, চন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্বও ছিল তেমনই প্রখর। তাঁর এই ‘অগ্নিকণা’ আসলে তাঁর ভাগ্যেরও ইঙ্গিত দেয়। আগুনের ধর্মই হলো দহন করা। চন্দ্রনাথের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও জেদ তাঁকে সারাজীবন এক মানসিক দহনের মধ্যে রেখেছে।

তিনি সাধারণের মাঝে মিশে যেতে পারেননি, কারণ তাঁর কপালের এই তিলক তাঁকে স্বতন্ত্র ও শ্রেষ্ঠ করে রেখেছিল। এই অগ্নিকণা আসলে তাঁর চরিত্রের সেই তেজকে বোঝায়, যা কারোর সামনে মাথা নত করতে জানে না। এই তেজের কারণেই তিনি স্কুল জীবন থেকে শুরু করে শেষ জীবন পর্যন্ত একাকী লড়াই করে গিয়েছেন। লেখকের এই কাল্পনিক তিলকের বর্ণনাটি চন্দ্রনাথের সমগ্র জীবনদর্শনের এক সার্থক প্রতীক হয়ে উঠেছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার