মকটেস্ট বেছে নাও

অফলাইন মকটেস্ট

খুব শীঘ্রই আপলোড হবে!

সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, একুশের তাৎপর্য – আবুল ফজল, রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর

একুশের তাৎপর্য: বিস্তারিত বড় প্রশ্নোত্তর (মান: 5)

1. “একুশ মানে মাথা নত না করা”—প্রাবন্ধিক আবুল ফজল এই কথাটির মধ্য দিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছেন?

উত্তর দেখো
1952 সালের 21 শে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতি প্রমাণ করেছিল যে তারা অন্যায়ের কাছে কখনোই মাথা নত করতে জানে না। পাকিস্তানি শাসকেরা যখন গায়ের জোরে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির মাতৃভাষার অধিকার কেড়ে নিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিল, তখন ছাত্র-জনতা বুকের রক্ত দিয়ে তা প্রতিহত করে।

প্রাবন্ধিক আবুল ফজল এই আপসহীন মনোভাব, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস এবং অধিকার আদায়ের দৃঢ় প্রত্যয়কেই “মাথা নত না করা” বলেছেন। একুশের এই আন্দোলন ছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক প্রবল চপেটাঘাত। বাঙালি বুঝিয়ে দিয়েছিল যে গুলির ভয় দেখিয়ে তাদের ন্যায়সঙ্গত দাবিকে দমিয়ে রাখা যাবে না। একুশের চেতনা তাই কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বাঙালির আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস এবং যেকোনো অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই করার এক শাশ্বত ও দীপ্ত প্রেরণা।

2. ‘একুশের তাৎপর্য’ প্রবন্ধে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার সঙ্গে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষের যে নিবিড় সম্পর্ক দেখানো হয়েছে, তা আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
ভাষা হলো মানুষের আত্মপরিচয়ের প্রধান মাধ্যম। আবুল ফজল তাঁর প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করেই একটি জাতির প্রথম জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে। যখন পাকিস্তানি শাসকেরা বাঙালির মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চাইল, তখন বাঙালি প্রথমবারের মতো গভীরভাবে অনুভব করল যে তারা ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিকভাবে একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জাতি

ভাষার অধিকার রক্ষার এই সংগ্রামই সমগ্র বাঙালি জাতিকে ধর্ম ও বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে একত্রিত করেছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আগে সাংস্কৃতিক মুক্তি একান্ত প্রয়োজন। মাতৃভাষাকে বাঁচানোর এই ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম ও আত্মোপলব্ধিই বাঙালির মনে স্বদেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদের প্রবল উন্মেষ ঘটায়। এই চেতনার ওপর ভিত্তি করেই বাঙালি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে একটি স্বাধীন দেশ গড়ার স্বপ্নে রূপান্তরিত হয়েছিল।

3. একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক পটভূমিটি ‘একুশের তাৎপর্য’ প্রবন্ধ অবলম্বনে নিজের ভাষায় লেখো।

উত্তর দেখো
‘একুশের তাৎপর্য’ প্রবন্ধে আবুল ফজল 1952 সালের মহান ভাষা আন্দোলনের যে পটভূমি তুলে ধরেছেন, তা বাংলার ইতিহাসের এক যুগান্তকারী অধ্যায়। 1947 সালে দেশভাগের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ওপর জোর করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।

এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমগ্র দেশের ছাত্রসমাজ ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে। তারা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। শাসকগোষ্ঠী আন্দোলন দমাতে 144 ধারা জারি করে। কিন্তু 1952 সালের 21 শে ফেব্রুয়ারি অকুতোভয় ছাত্ররা 144 ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে বিশাল মিছিল বের করে। সেই শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ অসংখ্য তরতাজা প্রাণ শহিদ হন। এই রক্তস্নাত, বেদনাবিধুর অথচ গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসই হলো একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক পটভূমি।

4. “মাতৃভাষার অধিকার হরণ মানে একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া”—উক্তিটির তাৎপর্য বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করো।

উত্তর দেখো
মাতৃভাষা মানুষের চিন্তা, বুদ্ধিবৃত্তি এবং সংস্কৃতির প্রধান ধারক ও বাহক। মাতৃভাষায় মানুষ যতটা সহজে জ্ঞান অর্জন করতে পারে এবং নিজের ভেতরের প্রতিভাকে বিকশিত করতে পারে, অন্য কোনো বিদেশি বা আরোপিত ভাষায় তা একেবারেই অসম্ভব।

প্রাবন্ধিক আবুল ফজল মনে করেন, যদি বলপ্রয়োগ করে কোনো জাতির মাতৃভাষা কেড়ে নেওয়া হয়, তবে সেই জাতির নিজস্ব চিন্তা ও মননের স্বাভাবিক বিকাশ চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়। চিন্তার স্বাধীনতা ছাড়া সেই জাতি ধীরে ধীরে মানসিক দাসে পরিণত হয়। মানুষের শরীরে মেরুদণ্ড যেমন তাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করে, তেমনি একটি নিজস্ব ভাষাও জাতিকে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করে। মাতৃভাষা ছাড়া জাতি দুর্বল ও পঙ্গু হয়ে পড়ে। তাই ভাষার অধিকার হরণ করাকে প্রাবন্ধিক জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার সমতুল্য এক জঘন্য অপরাধ বলে মনে করেছেন।

5. ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগ কীভাবে পরবর্তীকালে বাঙালির স্বাধীনতাসংগ্রামকে অনুপ্রাণিত করেছিল? প্রবন্ধের আলোকে বুঝিয়ে দাও।

উত্তর দেখো
একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল বাঙালির শৃঙ্খল মুক্তির প্রথম এবং সবচেয়ে সফল সংগ্রাম। এই রক্তক্ষয়ী দিনটিতে বাঙালি জাতি প্রথমবার গভীরভাবে বুঝতে পেরেছিল যে, ভয়কে জয় করে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুললে এবং প্রাণের মায়া ত্যাগ করতে পারলে যেকোনো শক্তিশালী স্বৈরাচারকেই পরাজিত করা সম্ভব

ভাষা শহিদদের বুকের তাজা রক্ত বাঙালির অন্তরে অধিকার আদায়ের এক অভূতপূর্ব সাহস সঞ্চার করেছিল। মাতৃভাষাকে রক্ষার এই লড়াই থেকেই বাঙালির মনে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার সুতীব্র স্পৃহা জন্ম নেয়। একুশের এই লড়াকু চেতনাই বাঙালিকে পরবর্তীতে বিভিন্ন স্বাধিকার আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত 1971 সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করেছিল। রফিক-সালামদের আত্মত্যাগ শুধু ভাষার মর্যাদা আনেনি, তা স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনের মূল ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেছিল।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার