মকটেস্ট বেছে নাও

অফলাইন মকটেস্ট

খুব শীঘ্রই আপলোড হবে!

সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, খোকনের প্রথম ছবি – বনফুল, রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

খোকনের প্রথম ছবি: বিস্তারিত বড় প্রশ্নোত্তর (মান: 5)

1. ‘খোকনের প্রথম ছবি’ গল্পে খোকনের শিল্পীসত্তার জাগরণ কীভাবে ঘটেছিল তা বিস্তারিত আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
বনফুল রচিত ‘খোকনের প্রথম ছবি’ গল্পটিতে একটি ছোট্ট ছেলের প্রকৃত শিল্পী হয়ে ওঠার এক অত্যন্ত সুন্দর মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। খোকনের শিল্পীসত্তার জাগরণ রাতারাতি হয়নি, এটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়েছিল। প্রথম ধাপে খোকন অত্যন্ত সাধারণ জিনিস, যেমন—টুল, টেবিল, চেয়ার ইত্যাদি দেখে হুবহু নকল করে আঁকত। এই স্তরে তার মধ্যে কেবল রেখা টানার বা রূপ দেওয়ার দক্ষতা ছিল, কিন্তু কোনো নিজস্বতা ছিল না।

দ্বিতীয় ধাপে তার আঁকার মাস্টারমশাই তাকে বাইরের প্রকৃতির ছবি আঁকতে বলেন। খোকন গাছ, মেঘ, গোরু ইত্যাদির নিখুঁত ছবি আঁকতে শুরু করে। এটি তাকে বাইরের জগৎকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শেখায়, কিন্তু তখনও সে প্রকৃতিকে অনুকরণই করে চলেছিল। এরপর আসে তৃতীয় এবং চূড়ান্ত পর্যায়। বাবার চিত্রকর বন্ধু এসে তাকে বোঝান যে, প্রকৃতির ছবি নকল করলেই প্রকৃত শিল্প হয় না, শিল্পীকে নিজের কল্পনার বা নিজের মনের ছবি আঁকতে হয়। এই কথাটি খোকনের ভেতরে এক প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে। সে অন্ধকার ঘরে চোখ বুজে নিজের কল্পনাকে জাগ্রত করার চেষ্টা করে এবং অন্ধকারের এক নিজস্ব রূপ খাতায় ফুটিয়ে তোলে। এইভাবেই অনুকরণ থেকে কল্পনার জগতে প্রবেশের মধ্য দিয়ে খোকনের অন্তর্নিহিত প্রকৃত শিল্পীসত্তার সার্থক জাগরণ ঘটেছিল।

2. আঁকার মাস্টারমশাই এবং বাবার চিত্রকর বন্ধু—এই দুজনের উপদেশ খোকনের শিল্পীজীবনে কীরূপ প্রভাব ফেলেছিল তা বুঝিয়ে দাও।

উত্তর দেখো
খোকনের শিল্পসাধনার পথে তার আঁকার মাস্টারমশাই এবং বাবার চিত্রকর বন্ধু—উভয়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তবে তাদের দুজনের উপদেশের উদ্দেশ্য ও প্রভাব ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাস্টারমশাই খোকনকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে ঘরের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে চারপাশের বিশাল প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। তাঁর উপদেশেই খোকন গাছপালা, আকাশ, নদীর ছবি নিপুণভাবে আঁকতে শেখে এবং তার হাত অত্যন্ত পোক্ত হয়। এটি ছিল খোকনের শিল্পশিক্ষার একদম প্রাথমিক বা বুনিয়াদি পর্যায়।

অন্যদিকে, বাবার চিত্রকর বন্ধু খোকনের শিল্পবোধকে সম্পূর্ণ একটি নতুন এবং উচ্চতর মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি খোকনকে বুঝিয়েছিলেন যে, শুধু চোখ দিয়ে দেখে বাস্তবের হুবহু অনুকরণ বা নকল করাটা শিল্পের চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে না। প্রকৃত শিল্পীর কাজ হলো নিজের অন্তর্দৃষ্টি বা কল্পনাশক্তির মাধ্যমে নতুন কিছু সৃষ্টি করা। তাঁর এই গভীর উপলব্ধিমূলক উপদেশটিই খোকনকে তার চেনা গণ্ডির বাইরে ভাবতে বাধ্য করেছিল। ফলে খোকন প্রথমবারের মতো নিজের মনের ভেতরের ছবি আঁকার চেষ্টা করে। অর্থাৎ মাস্টারমশাই তাকে রূপ ফুটিয়ে তুলতে শিখিয়েছিলেন, আর চিত্রকর বন্ধু তাকে শিখিয়েছিলেন সেই রূপে নিজস্ব প্রাণ বা কল্পনা প্রতিষ্ঠা করতে।

3. “তোমার নিজের মনের ছবি কোথায়?”—এই মন্তব্যের তাৎপর্য কী? এই মন্তব্য খোকনকে কীভাবে তার নিজস্ব ছবি আঁকতে সাহায্য করেছিল?

উত্তর দেখো
উদ্ধৃত মন্তব্যটি খোকনের বাবার চিত্রকর বন্ধুর। এই মন্তব্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো প্রকৃত শিল্পের স্বরূপ নির্দেশ করা। খোকন তার খাতায় যত ছবি এঁকেছিল, তা সবই ছিল বাস্তব জগতের কোনো না কোনো বস্তুর হুবহু অনুকরণ। চিত্রকর বন্ধু বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, একজন সার্থক শিল্পী কখনো ক্যামেরার মতো কাজ করেন না। তাঁকে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে নিজের আবেগ, অনুভূতি এবং কল্পনাশক্তিকে মিশিয়ে দিতে হয়, তবেই সেটি ‘নিজের মনের ছবি’ বা প্রকৃত শিল্প হয়ে ওঠে। অনুকরণ কখনোই মৌলিক শিল্প হতে পারে না।

এই মন্তব্যটি খোকনের শিশু মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। সে প্রথমবার বুঝতে পারে যে তার এতদিনের আঁকা ছবিগুলোর মধ্যে তার নিজের কোনো কৃতিত্ব বা নিজস্বতা নেই। নিজের মনের ছবি আঁকার জন্য চিত্রকর বন্ধু তাকে চোখ বুজে কল্পনার সাহায্য নিতে বলেছিলেন। সেই কথা মতো খোকন অন্ধকার ঘরে চোখ বুজে বসে থাকে এবং কল্পনায় দেখা নিবিড় অন্ধকারকেই খাতায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে। চিত্রকর বন্ধুর এই অমোঘ প্রশ্নাটিই খোকনকে বাইরের জগতের অনুকরণ ত্যাগ করে নিজের অন্তর্জগতের সন্ধান করতে এবং তার জীবনের প্রথম মৌলিক ছবি আঁকতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিল।

4. খোকনের আঁকা অন্ধকারের ছবিটিকে কেন তার ‘প্রথম ছবি’ বলা হয়েছে? গল্পটির নামকরণ কতটা সার্থক হয়েছে তা বিচার করো।

উত্তর দেখো
খোকন ছোটবেলা থেকে তার খাতায় অসংখ্য ছবি এঁকেছিল। কিন্তু সেই সমস্ত ছবিই ছিল বাইরের কোনো দৃশ্য বা বস্তুর হুবহু অনুকরণ বা নকল। কিন্তু অন্ধকার ঘরে চোখ বুজে কল্পনার মাধ্যমে সে যে কালো রঙের অন্ধকারের ছবিটি এঁকেছিল, তা বাইরের জগতের কোনো বস্তুর অনুকরণ ছিল না। সেটি ছিল সম্পূর্ণ তার নিজস্ব কল্পনা এবং অনুভূতির প্রকাশ। যেহেতু এই ছবিটিতে প্রথমবারের মতো খোকনের নিজস্বতা, মৌলিকতা এবং অন্তর্দৃষ্টির প্রকাশ ঘটেছিল, তাই অসংখ্য ছবি আঁকা সত্ত্বেও এটিকেই খোকনের ‘প্রথম ছবি’ বলা হয়েছে।

গল্পের নামকরণ সাধারণত বিষয়বস্তু, চরিত্র বা মূল ভাবের ওপর নির্ভর করে করা হয়। আলোচ্য গল্পটিতে খোকন নামের একটি ছেলের ছবি আঁকার প্রতি ভালোবাসা এবং কালক্রমে একজন প্রকৃত শিল্পী হয়ে ওঠার আখ্যান বর্ণিত হয়েছে। গল্পের মূল উপজীব্য বিষয়ই হলো অনুকরণ বা নকল করা ছেড়ে কল্পনার সাহায্যে নিজস্ব মৌলিক ছবি আঁকার শিক্ষা লাভ করা। সেই অন্ধকারের প্রথম নিজস্ব ছবি আঁকার মধ্য দিয়েই গল্পের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে এবং খোকনের শিল্পীসত্তার সার্থক উন্মোচন হয়। যেহেতু সমগ্র কাহিনিটি খোকনের এই প্রথম মৌলিক ছবিটি আঁকার দিকেই এগিয়ে গেছে, তাই নিঃসন্দেহে ‘খোকনের প্রথম ছবি’ নামকরণটি অত্যন্ত গভীর, তাৎপর্যপূর্ণ এবং সার্থক।

5. “খোকন অবাক হয়ে গেল।”—খোকনের অবাক হওয়ার কারণ গল্প অবলম্বনে বিস্তারিত আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
বনফুল রচিত ‘খোকনের প্রথম ছবি’ গল্পের একেবারে শেষ পর্যায়ে খোকনের এই তীব্র বিস্ময় বা অবাক হওয়ার কথাটি বলা হয়েছে। চিত্রকর বন্ধুর উপদেশে নিজের মনের ছবি আঁকার জন্য খোকন নিজের ঘরের আলো নিভিয়ে অন্ধকার ঘরে চোখ বুজে বসেছিল। চোখ বুজে সে কল্পনায় কেবল এক নিবিড় ও অনন্ত অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায়নি। তাই সে সিদ্ধান্ত নেয় যে সে এই কল্পনার অন্ধকারের ছবিটিই আঁকবে। সে একটি খাতার পাতা নিয়ে কালো রং দিয়ে পুরো পাতাটিকে ঘন কালো করে লেপে দেয়।

অন্ধকার ঘরে আঁকা ছবিটি শেষ করার পর খোকন যখন খাতাটিকে বাইরের আলোতে নিয়ে আসে, তখন সে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পায়। সে চেয়েছিল কেবল একটি নিরেট অন্ধকারের ছবি আঁকতে, কিন্তু আলোতে খাতাটি মেলে ধরে সে দেখে যে, সেই ঘন কালো অন্ধকারের ঠিক মাঝখানে একটি মুখের আকৃতি এবং দুটি উজ্জ্বল চোখ যেন জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। ওই চোখ দুটি যেন একদৃষ্টে তারই দিকে তাকিয়ে আছে। খোকন সচেতনভাবে কোনো মুখ বা চোখ আঁকেনি, বরং তার নিজের অন্তর্নিহিত শিল্পীসত্তাই অবচেতনভাবে অন্ধকারের মাঝে এই রূপটি দান করেছিল। কল্পনার এই অদ্ভুত, স্বতঃস্ফূর্ত ও বিস্ময়কর প্রকাশ দেখেই খোকন চূড়ান্তভাবে অবাক হয়ে গিয়েছিল।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার