মকটেস্ট বেছে নাও

অফলাইন মকটেস্ট

খুব শীঘ্রই আপলোড হবে!

সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, কুতুব মিনারের কথা – সৈয়দ মুজতবা আলী, রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর

কুতুব মিনারের কথা: বিস্তারিত বড় প্রশ্নোত্তর (মান: 5)

1. লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী কুতুব মিনারকে ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মিনার’ বলে অভিহিত করেছেন কেন? প্রবন্ধ অবলম্বনে আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে, কুতুব মিনার কেবল ভারতের নয়, সমগ্র পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মিনার। তাঁর এই দাবির পেছনে একাধিক জোরালো যুক্তি রয়েছে। প্রথমত, একটি শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যের মূল চাবিকাঠি হলো তার নিখুঁত অনুপাত বা প্রপোরশন (Proportion)। বিশাল উচ্চতা সত্ত্বেও কুতুব মিনারের গঠনশৈলীতে এমন এক অসামান্য সামঞ্জস্য রয়েছে, যা বিশ্বের আর কোনো মিনারে দেখা যায় না।

দ্বিতীয়ত, এর নকশার বৈচিত্র্য। এত বিশাল একটি মিনার যাতে দেখতে একঘেয়ে না লাগে, তার জন্য স্থপতিরা এর গায়ে পরপর বাঁশি এবং কোণের নকশা করেছেন। তৃতীয়ত, মিনারের বাইরের দেওয়ালে লাল বেলেপাথর কেটে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে লতাপাতা, ফুলের মালা এবং কোরানের পবিত্র আয়াত খোদাই করা হয়েছে। খোদাইয়ের এই কাজ এতটাই সূক্ষ্ম এবং রুচিশীল যে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সবশেষে, আরব, ইরান বা তুরস্কের মতো কোনো মুসলিম দেশেই কুতুব মিনারের আগে তৈরি হওয়া এমন উৎকৃষ্ট কোনো মিনারের নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায় না। এই অখণ্ড সৌন্দর্য, মৌলিকতা এবং নিখুঁত গঠনশৈলীর কারণেই লেখক একে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার বলেছেন।

2. কুতুব মিনারের পাঁচটি তলার গঠনশৈলী বা স্থাপত্য রীতির যে বৈচিত্র্য প্রবন্ধে ফুটে উঠেছে, তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করো।

উত্তর দেখো
কুতুব মিনারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর প্রতিটি তলার গঠনশৈলীর অদ্ভুত বৈচিত্র্য। মিনারটি মোট 5 টি তলা বিশিষ্ট। স্থপতিরা খুব সচেতনভাবেই মিনারটিকে একঘেয়েমির হাত থেকে রক্ষা করতে প্রতিটি তলায় আলাদা আলাদা নকশা তৈরি করেছিলেন। মিনারের প্রথম তলায় রয়েছে পরপর বাঁশি এবং কোণের নকশা। বাঁশিগুলি গোলাকার এবং কোণগুলি কৌণিক আকার বিশিষ্ট, যা মিনারের গায়ে আলো-ছায়ার এক মায়াবী খেলা তৈরি করে।

এরপর দ্বিতীয় তলাটিতে নকশার পরিবর্তন করা হয়েছে। এখানে কোণ বাদ দিয়ে শুধুমাত্র বাঁশির নকশা রাখা হয়েছে। আবার তৃতীয় তলাটিতে এর ঠিক বিপরীত কাজ করা হয়েছে, অর্থাৎ সেখানে বাঁশি বাদ দিয়ে শুধুমাত্র কোণের নকশা করা হয়েছে। এই বৈচিত্র্য মিনারটিকে একটি অনন্য স্থাপত্য রূপ দান করেছে। চতুর্থ এবং পঞ্চম তলার গঠন কেমন ছিল তা আজ আর স্পষ্টভাবে জানা যায় না, কারণ বজ্রপাতে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে ফিরোজ শাহ তুঘলক মার্বেল পাথর দিয়ে তা মেরামত করে দেন। সব মিলিয়ে এই 5 টি তলার সুপরিকল্পিত বিন্যাসই কুতুব মিনারকে এত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

3. কুতুব মিনারের নির্মাণকাজ ও পরবর্তী সংস্কারের ঐতিহাসিক পটভূমি প্রবন্ধ অবলম্বনে আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
কুতুব মিনারের নির্মাণের পেছনে একটি দীর্ঘ ইতিহাস লুকিয়ে আছে। ঐতিহাসিকদের মতে, ভারতবর্ষে মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবক নিজের ক্ষমতা, গৌরব এবং বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্যই দিল্লির বুকে এই বিশাল বিজয়স্তম্ভ নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন। কেউ কেউ মনে করেন, তৎকালীন বিখ্যাত সাধু কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীর সম্মানার্থে এর নাম রাখা হয় কুতুব মিনার। তবে কুতুবুদ্দিন আইবক এই সুবিশাল মিনারের মাত্র 1 তলা তৈরি করে যেতে পেরেছিলেন।

তাঁর মৃত্যুর পর, তাঁর জামাতা এবং পরবর্তী সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ এই মিনারের কাজ আবার শুরু করেন এবং তা সম্পূর্ণ করেন। পরবর্তীকালে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে, বিশেষ করে বজ্রপাতে মিনারের ওপরের দিকের তলাগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক সেই ভগ্ন অংশগুলি মেরামত করেন। তিনি মেরামতের সময় লাল বেলেপাথরের পরিবর্তে সাদা মার্বেল পাথরের ব্যবহার করেছিলেন। এভাবেই একাধিক সুলতানের হাত ধরে কুতুব মিনার আজকের রূপ লাভ করেছে।

4. কুতুব মিনারের অলংকরণে হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির মেলবন্ধন কীভাবে ঘটেছে তা বুঝিয়ে দাও।

উত্তর দেখো
সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘কুতুব মিনারের কথা’ প্রবন্ধে ভারতের হিন্দু এবং মুসলিম—এই দুই মহান সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধনের চিত্র ফুটে উঠেছে। কুতুব মিনার মুসলিম শাসকদের আদেশে মুসলিম স্থাপত্য রীতি অনুযায়ী নির্মিত হলেও, এর নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত কারিগর বা স্থপতিরা ছিলেন মূলত এদেশেরই হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।

হিন্দু স্থাপত্যের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো দেওয়ালে নানা রকম দেবদেবীর মূর্তি বা প্রাণীর ছবি খোদাই করা। কিন্তু মুসলিম ধর্মে বা স্থাপত্যে মূর্তি বা প্রাণীর ছবি তৈরি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তাই হিন্দু স্থপতিরা এখানে তাদের চিরাচরিত মূর্তি গড়ার সুযোগ পাননি। কিন্তু এই বাধা তাদের শৈল্পিক প্রতিভাকে দমাতে পারেনি। তারা মূর্তির বদলে লাল বেলেপাথর কেটে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে লতাপাতা, ফুলের মালা এবং আরবি অক্ষরে কোরানের পবিত্র আয়াত খোদাই করেন। হিন্দু স্থপতিদের হাতের এই অপূর্ব কারুকাজ এবং মুসলিম স্থাপত্যের কাঠামোগত পরিকল্পনার সংমিশ্রণেই কুতুব মিনার হয়ে উঠেছে ভারতের হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও সংস্কৃতির এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।

5. কুতুব মিনারের সঙ্গে তাজমহলের সৌন্দর্যের যে তুলনামূলক আলোচনা লেখক করেছেন, তা নিজের ভাষায় লেখো।

উত্তর দেখো
প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর প্রবন্ধে কুতুব মিনারের অনন্যতা বোঝাতে গিয়ে ভারতের অপর এক বিশ্ববিখ্যাত স্থাপত্য তাজমহলের সঙ্গে এর একটি সুন্দর তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। লেখকের মতে, তাজমহল নিঃসন্দেহে একটি অসামান্য সুন্দর স্থাপত্য, কিন্তু তাজমহলের সৌন্দর্য একা তার নিজের নয়। তাজমহলের এই অখণ্ড সৌন্দর্যের পেছনে তার বিশাল দরজা, চারপাশের চারটি মিনারিকা, সবুজ বাগান, জলাশয় এবং ফোয়ারার বড় অবদান রয়েছে। এই সব কিছু মিলিয়েই তাজমহলকে সুন্দর দেখায়।

কিন্তু কুতুব মিনারের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। কুতুব মিনারকে সুন্দর দেখানোর জন্য চারপাশের কোনো বাগিচা, ফোয়ারা বা অন্য কোনো ছোট মিনারিকার ওপর নির্ভর করতে হয় না। সে একাই, কারোর সাহায্য ছাড়া স্বাধীনভাবে স্বমহিমায় নিজের অসামান্য সৌন্দর্য বিস্তার করে দাঁড়িয়ে আছে। তাজমহল হলো একটি স্মৃতিসৌধ যা চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে গিয়ে সৌন্দর্য সৃষ্টি করে, আর কুতুব মিনার হলো একটি স্বাধীন বিজয়স্তম্ভ যা তার একাকীত্ব এবং নিখুঁত অনুপাতের জোরেই দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার