সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, চিরদিনের – সুকান্ত ভট্টাচার্য, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর
অধ্যায়: চিরদিনের
(দীর্ঘ / রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 4)
নিচের প্রশ্নগুলির প্রাসঙ্গিক ও বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. ‘চিরদিনের’ কবিতায় পল্লিবাংলার যে চিরন্তন ও শাশ্বত রূপ ফুটে উঠেছে, তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর ‘চিরদিনের’ কবিতায় পল্লিবাংলার এক অকৃত্রিম, শান্ত এবং চিরন্তন রূপ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন।
গ্রামের পরিবেশ শহরের মতো যান্ত্রিক বা কোলাহলপূর্ণ নয়। এখানে বৃষ্টি নামলে গ্রামটি এক স্নিগ্ধ ও লাজুক রূপ ধারণ করে, যেখানে ঘড়ির কাঁটার ব্যস্ততা এসে থেমে যায়। বর্ষার দিনে সারা গ্রাম জুড়ে শোনা যায় ব্যাঙের একঘেয়ে ডাক। সন্ধ্যা নামলে আজও গ্রামের ঘরে ঘরে মঙ্গলময় শাঁখ বেজে ওঠে। সকালবেলা পাখির ডাকে কৃষকের ঘুম ভাঙে এবং তারা লাঙল-বলদ নিয়ে মাঠের দিকে ছুটে যায়। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর সন্ধেবেলায় তারা দাওয়ায় বসে গল্পগুজব করে। 1350 সালের ভয়াবহ আকাল বা মন্বন্তর সাময়িকভাবে এই গ্রামে মৃত্যুর বিভীষিকা ও শূন্যতা ডেকে আনলেও, গ্রামের এই চিরন্তন রূপটিকে ধ্বংস করতে পারেনি। শত দুর্যোগ পেরিয়েও পল্লিপ্রকৃতি এবং তার মানুষের জীবনযাত্রা তার নিজস্ব শান্ত ও শাশ্বত ছন্দেই বয়ে চলেছে।
2. 1350 সালের আকালের যে মর্মান্তিক চিত্র ‘চিরদিনের’ কবিতায় ফুটে উঠেছে, তা বর্ণনা করো। আকালের পর গ্রামের মানুষ কীভাবে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছে?
উত্তর দেখো
উত্তর: 1350 বঙ্গাব্দে অবিভক্ত বাংলায় এক ভয়ংকর আকাল বা দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, যা ইতিহাসে ‘তেতাল্লিশের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। এই দুর্ভিক্ষের ফলে খাদ্যের তীব্র অভাবে গ্রামের সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। খাদ্যাভাব ও মহামারিতে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং অনেকেই গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। ফলে গ্রামের চারদিক এক চরম হতাশা, শূন্যতা এবং মৃত্যুর বিভীষিকায় ঢেকে গিয়েছিল।
কিন্তু আকালের এই অন্ধকার চিরস্থায়ী হয়নি। গ্রামের মানুষের নাড়ির টান এই মাটির সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাই আকালের চরম অবস্থা একটু কাটতেই তারা আবার নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে আসে। চোখের কোলে অতীতের হাহাকার লুকিয়ে রেখেও তারা নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। তারা পুনরায় মাঠে যায়, লাঙল ধরে এবং কঠোর পরিশ্রম করে মাটির বুক চিরে নতুন ফসল ফলায়। মাঠে সবুজ ফসলের সমারোহই তাদের মন থেকে আকালের সমস্ত শূন্যতা দূর করে প্রাচুর্য বা সুবর্ণ যুগ আসার নতুন স্বপ্ন দেখায়।
3. ‘চিরদিনের’ কবিতায় কৃষকের চরিত্র ও জীবনসংগ্রাম কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তা আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘চিরদিনের’ কবিতায় বাংলার অদম্য, পরিশ্রমী ও চির-আশাবাদী কৃষকদের জীবনসংগ্রামের এক অনবদ্য ছবি ফুটে উঠেছে।
কৃষকই হলো পল্লিবাংলার মেরুদণ্ড। 1350 সালের ভয়াবহ মন্বন্তর তাদের সর্বস্বান্ত করে দিয়েছিল। অভাব এবং মৃত্যুর তাড়নায় তারা হয়তো সাময়িকভাবে দিশেহারা হয়েছিল, কিন্তু তারা চিরকালের জন্য হাল ছেড়ে দেয়নি। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতেই তারা আবার শূন্য ভিটেমাটিতে ফিরে এসেছে এবং তাদের চিরাচরিত পেশাকেই আঁকড়ে ধরেছে। কাকভোরে পাখির ডাকে ঘুম থেকে উঠে তারা লাঙল-বলদ নিয়ে মাঠে যায়। তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে রুক্ষ জমিও সবুজ ফসলে ভরে ওঠে। শত বিপর্যয় এবং হাহাকারও কৃষকের মাটি ও ফসলের প্রতি এই অকৃত্রিম ভালোবাসাকে টলাতে পারে না। কবিতায় তাদের এই হার-না-মানা মনোভাব, চরম সহনশীলতা এবং নতুন করে সৃষ্টি করার অদম্য জীবনীশক্তিই স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
4. “এখানে বৃষ্টিমুখর লাজুক গাঁয়ে / এসে থেমে গেছে ব্যস্ত ঘড়ির কাঁটা।” – পংক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে পল্লিপ্রকৃতির শান্ত ও নিস্তব্ধ রূপের পরিচয় দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর: উদ্ধৃত পংক্তিটির মধ্য দিয়ে কবি শহরের যান্ত্রিক জীবনের সঙ্গে পল্লিগ্রামের শান্ত জীবনের এক সুন্দর বৈপরীত্য বা পার্থক্য তুলে ধরেছেন।
শহরের জীবন ঘড়ির কাঁটার মতো অত্যন্ত ব্যস্ত, যান্ত্রিক এবং দ্রুতগতি সম্পন্ন। সেখানে মানুষের দাঁড়ানোর বা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার কোনো সময় নেই। কিন্তু বৃষ্টিস্নাত পল্লিগ্রামের পরিবেশ শহরের এই কৃত্রিম ব্যস্ততা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। গ্রামের জীবন চলে প্রকৃতির নিজস্ব ধীর ও শান্ত ছন্দে। বৃষ্টির দিনে সেই গ্রাম যেন প্রকৃতির চাদরে নিজেকে আরও গুটিয়ে নেয় এবং এক সলজ্জ, মায়াবী ও স্নিগ্ধ রূপ ধারণ করে। সেখানে ঘড়ির কাঁটার যান্ত্রিক নির্দেশ খাটে না, তাই কবি বলেছেন ব্যস্ত ঘড়ির কাঁটা এখানে এসে থেমে গেছে। এই পংক্তিটি পল্লিপ্রকৃতির সেই চিরকালীন নিস্তব্ধতা, প্রশান্তি এবং অন্তর্মুখী রূপটিকেই অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
5. ‘চিরদিনের’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: সাহিত্যের নামকরণ সাধারণত রচনার মূল ভাব, বিষয়বস্তু বা কোনো গভীর ব্যঞ্জনাকে নির্দেশ করে। ‘চিরদিনের’ শব্দটির অর্থ হলো যা চিরকালীন বা শাশ্বত।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের এই কবিতায় পল্লিবাংলার এবং তার কৃষিজীবী মানুষের এক চিরন্তন ও শাশ্বত বেঁচে থাকার রূপটিই মূল বিষয় হিসেবে আলোচিত হয়েছে। 1350 সালের ভয়াবহ আকাল বা মন্বন্তর সাময়িকভাবে বাংলার বুকে মৃত্যুর হাহাকার ডেকে আনলেও, তা বাংলার চিরায়ত রূপটিকে মুছে ফেলতে পারেনি। আকালের শেষে মানুষ আবার ফিরে এসেছে। আবার সকালে পাখির ডাক শোনা যায়, সন্ধ্যায় শাঁখ বাজে, কৃষক মাঠে লাঙল চষে এবং সবুজ ফসল ফলায়। দুর্যোগ ও ধ্বংসের মাঝেও সৃষ্টি ও বেঁচে থাকার এই যে অদম্য ইচ্ছা এবং চিরন্তন প্রক্রিয়া—এটি আবহমান কাল ধরেই চলে আসছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে। যেহেতু গ্রামবাংলার এই মৃত্যুহীন, চিরস্থায়ী ও শাশ্বত জীবনপ্রবাহই কবিতার মূল উপজীব্য, তাই ‘চিরদিনের’ নামকরণটি সম্পূর্ণ অর্থবহ, সার্থক এবং ব্যঞ্জনাধর্মী হয়েছে।