সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, চিন্তাশীল – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
অধ্যায়: চিন্তাশীল
(সংক্ষিপ্ত / ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 2)
নিচের প্রশ্নগুলির প্রাসঙ্গিক ও বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. ‘চিন্তাশীল’ নাটিকায় নরহরি চরিত্রটি কেমন?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘চিন্তাশীল’ নাটিকায় নরহরি হলো এমন একজন মানুষ যে নিজেকে একজন মস্ত বড়ো দার্শনিক ও চিন্তাবিদ বলে মনে করে। কিন্তু বাস্তবে সে চরম অলস, কর্মবিমুখ এবং বাস্তবজ্ঞানহীন। দৈনন্দিন জীবনের অত্যন্ত সাধারণ ঘটনাগুলো (যেমন- মানুষের হাঁপানো বা খিদে পাওয়া) নিয়ে সে অহেতুক দার্শনিক তত্ত্ব খাড়া করে, যার ফলে সে কোনো কাজের কাজ তো করেই না, উলটে চারপাশের মানুষকে বিরক্ত করে তোলে।
2. নরহরির মা কেন ছেলের ওপর সবসময় বিরক্ত থাকতেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: নরহরির মা চাইতেন তাঁর ছেলে সময়মতো খাওয়াদাওয়া করুক এবং সাধারণ সংসারী মানুষের মতো স্বাভাবিক কাজকর্ম করুক। কিন্তু নরহরি সারাক্ষণ বই নিয়ে বসে থাকত এবং খাবার দিলে তা না খেয়ে ‘জঠরাগ্নি’, ‘সময়’ ইত্যাদি নিয়ে বড়ো বড়ো অবাস্তব কথা বলত। ছেলের এই কাজের বেলা শূন্য অথচ কথায় দার্শনিক আচরণের জন্যই মা তার ওপর সারাক্ষণ তিতিবিরক্ত থাকতেন।
3. নরহরি তার মায়ের দেওয়া জলখাবার খেতে চায়নি কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: মা যখন নরহরিকে লুচি ও বেগুনভাজা খেতে দেন, তখন সে খাবার খাওয়ার বদলে খিদে পাওয়ার কারণ খুঁজতে শুরু করে। সে বলে যে, মানুষের পেটের ভেতর জঠরাগ্নি বা আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলছে, আর খাবার হলো সেই আগুনে আহুতি দেওয়া মাত্র। সে এই তত্ত্বে এতই মগ্ন হয়ে যায় যে স্বাভাবিক মানুষের মতো খাবার খাওয়ার প্রয়োজনীয়তাটুকুও ভুলে গিয়ে তা খেতে অস্বীকার করে।
4. হরিদাস নরহরির কাছে কেন ছুটে এসেছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: হরিদাসের মায়ের হঠাৎ খুব শক্ত অসুখ বা ব্যামো হয়েছিল। তাকে দ্রুত ডাক্তার ডাকতে হতো। তাই সে চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে নরহরির কাছে ছুটে এসেছিল, যাতে নরহরি তাড়াতাড়ি গিয়ে গ্রামের প্রখ্যাত ডাক্তার বৈদ্যনাথবাবুকে ডেকে আনে।
5. “এই যে তুই হাঁপাচ্ছিস, এই হাঁপানোর কারণ কী?” – নরহরি এই হাঁপানোর কী কারণ বিশ্লেষণ করেছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: হরিদাস যখন মায়ের অসুখের জন্য চিন্তায় হাঁপাচ্ছিল, নরহরি তার কষ্ট বোঝার বদলে হাঁপানোর বৈজ্ঞানিক কারণ খুঁজতে শুরু করে। সে বিশ্লেষণ করে বলে যে, দৌড়ানোর ফলে হরিদাসের ফুসফুসের কার্যকারিতা বেড়ে গেছে এবং সে দ্রুত শ্বাস টেনে বাইরের বাতাস ভেতরে নিচ্ছে এবং ভেতরের বাতাস বাইরে ছাড়ছে। এটি নরহরির চরম কাণ্ডজ্ঞানহীনতার পরিচয় দেয়।
6. হরিদাস যখন তার মায়ের ব্যামোর কথা বলল, তখন নরহরির প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: হরিদাসের মায়ের ব্যামোর কথা শুনে নরহরি কোনো সহানুভূতি বা তৎপরতা দেখায়নি। উলটে সে ডাক্তার ডাকার বদলে ‘ব্যামো’ বা অসুখ আসলে কী, কেন মানুষের শরীরের পঞ্চভূতের উপাদানে গোলমাল হয়, এবং রোগ কীভাবে সৃষ্টি হয়—সেইসব নিয়ে বড়ো বড়ো দার্শনিক কথা ও গবেষণা শুরু করে দেয়।
7. “বড়ো চিন্তার বিষয়” – কোন্ বিষয়টিকে নরহরি বড়ো চিন্তার বিষয় বলে মনে করেছিল এবং কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: হরিদাসের মায়ের হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার খবরটিকেই নরহরি ‘বড়ো চিন্তার বিষয়’ বলেছিল। তবে এই চিন্তা কোনো সহানুভূতির চিন্তা ছিল না। সে মনে করেছিল মানুষের শরীর কীভাবে সুস্থ অবস্থা থেকে হঠাৎ অসুস্থতায় পরিণত হয়, তার পেছনের দার্শনিক ও তাত্ত্বিক কারণটি খুঁজে বের করাটাই হলো প্রকৃত চিন্তার বিষয়।
8. সময় নিয়ে নরহরির দার্শনিক যুক্তিটি কী ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: নরহরি মনে করত সময় কখনোই থেমে থাকে না। সে সময়কে নিমিষ, পল এবং দণ্ড—এই তিনটি ক্ষুদ্র ভাগে ভাগ করে বিশ্লেষণ করেছিল। সে যুক্তি দিয়েছিল যে, একটি নিমিষ বা মুহূর্ত চলে যাওয়া মানেই মানবজীবনের একটি অংশ খসে পড়া এবং মৃত্যুর দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। এই চিন্তা করে সে বাস্তব কাজ ফেলে রাখত।
9. হরিদাসের সাথে নরহরির আচরণের তুলনামূলক পার্থক্য কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: হরিদাস এবং নরহরি সম্পূর্ণ দুই বিপরীত মেরুর মানুষ। হরিদাস অত্যন্ত বাস্তববাদী, দায়িত্বশীল এবং কাজের মানুষ। বিপদের সময় সে সরাসরি সমাধানের পথ (ডাক্তার ডাকা) খোঁজে। অন্যদিকে, নরহরি হলো অলস এবং বাস্তবজ্ঞানহীন। সে কাজের কাজ কিছু না করে কেবল বড়ো বড়ো কথা ও তত্ত্বের জালে আসল কাজকে এড়িয়ে যায়।
10. “যা তুই পাগলের পাল্লায় পড়ে আর কাজ নেই।” – কে, কাকে, কেন এ কথা বলেছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: হরিদাস বিরক্ত হয়ে কথাটি নরহরিকে (এবং নিজেকে উদ্দেশ্য করে) বলেছিল। মায়ের অসুস্থতার খবর শুনে নরহরি যখন ডাক্তার ডাকার বদলে হাঁপানো, ব্যামো আর রোগ নিয়ে অবাস্তব দার্শনিক আলোচনা শুরু করে দেয়, তখন হরিদাস বুঝতে পারে যে এই কাণ্ডজ্ঞানহীন বন্ধুকে দিয়ে তার কোনো কাজ হবে না। তাই সে হতাশ হয়েই এ কথা বলে চলে যায়।
11. ‘চিন্তাশীল’ নাটিকাটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কীসের সমালোচনা করেছেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই নাটিকায় সমাজের সেইসব তথাকথিত পণ্ডিতদের তীব্র সমালোচনা ও ব্যঙ্গ করেছেন, যারা কেবল পুঁথিগত বিদ্যা অর্জন করেছে কিন্তু যাদের বাস্তববোধ বা কাণ্ডজ্ঞান একেবারেই শূন্য। অহেতুক তর্ক, দার্শনিক বাগাড়ম্বর এবং কর্মবিমুখতা যে মানুষের কোনো কাজে আসে না, লেখক হাস্যরসের মাধ্যমে সেটাই বুঝিয়েছেন।
12. নরহরির ‘চিন্তাশীলতা’ কি প্রকৃত চিন্তাশীলতা? তোমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও.
উত্তর দেখো
উত্তর: না, নরহরির চিন্তাশীলতা মোটেই প্রকৃত চিন্তাশীলতা নয়, বরং তা হলো অলসতা ও কর্মবিমুখতার একটা ঢাল মাত্র। প্রকৃত চিন্তা মানুষকে সঠিক পথ দেখায়, সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে এবং মানুষের কাজে আসে। কিন্তু নরহরির চিন্তা বিপদের সময় বন্ধুকে সাহায্য করে না, কেবল শব্দের মায়াজাল তৈরি করে। তাই তার চিন্তা নিছকই এক পাগলামি ও কাণ্ডজ্ঞানহীনতা।