সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, দুটি গানের জন্ম কথা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
অধ্যায়: দুটি গানের জন্মকথা
(সংক্ষিপ্ত / ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 2)
নিচের প্রশ্নগুলির প্রাসঙ্গিক ও বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. ‘দুটি গানের জন্মকথা’ প্রবন্ধে কোন্ দুটি গানের উল্লেখ আছে এবং সেগুলি কোন্ কোন্ দেশের জাতীয় সংগীত?
উত্তর দেখো
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘দুটি গানের জন্মকথা’ প্রবন্ধে মূলত দুটি কালজয়ী গানের সৃষ্টি ও নেপথ্য ইতিহাসের কথা বলা হয়েছে। প্রথম গানটি হলো ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে’, যা বর্তমানে স্বাধীন ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃত। দ্বিতীয় গানটি হলো ‘আমার সোনার বাংলা’, যা 1971 সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গীত হয়ে আসছে।
2. ‘জনগণমন’ গানটি রচনার প্রেক্ষাপট কী ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: 1911 সালে ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জের ভারত আগমন উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক রাজভক্ত বন্ধু তাঁকে সম্রাটের বন্দনা করে একটি গান রচনার জন্য জোরাজুরি করেন। এই অন্যায় অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত হন। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি ‘জনগণমন’ গানটি রচনা করেছিলেন, যেখানে তিনি কোনো ব্রিটিশ সম্রাটের নয়, বরং চিরন্তন ঈশ্বর বা ভারতভাগ্যবিধাতার জয়গান গেয়েছিলেন।
3. ‘জনগণমন’ গানে ‘ভারতভাগ্যবিধাতা’ বলতে রবীন্দ্রনাথ কাকে বুঝিয়েছেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘জনগণমন’ গানে ‘ভারতভাগ্যবিধাতা’ বলতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোনো রক্তমাংসের মানুষ, ব্রিটিশ সম্রাট বা পঞ্চম জর্জকে বোঝাননি। তিনি এখানে ভারতের সমস্ত সাধারণ মানুষের অন্তর্যামী, চিরন্তন পথপ্রদর্শক, এবং যুগ-যুগান্তরের মানবভাগ্য রথচালক স্বয়ং পরমেশ্বর বা ভগবানকেই ভারতের ভাগ্যবিধাতা বা নিয়ন্তা হিসেবে বন্দনা করেছেন।
4. রবীন্দ্রনাথের রাজভক্ত বন্ধুটি ‘জনগণমন’ গানটি শুনে কী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: রবীন্দ্রনাথের রাজভক্ত বন্ধুটি সম্রাট পঞ্চম জর্জের বন্দনাগান লেখার জন্য অনুরোধ করলেও, রবীন্দ্রনাথ তা প্রত্যাখ্যান করে ঈশ্বরের বন্দনাগান হিসেবে ‘জনগণমন’ রচনা করেন। গানটি শোনার পর সেই বন্ধুটির বিন্দুমাত্র খুশি হওয়ার কথা নয়, কারণ গানটিতে সম্রাটের কোনো উল্লেখ ছিল না। কিন্তু বন্ধুটি এতটাই বুদ্ধিমান ছিলেন যে, গানের প্রকৃত অর্থ বুঝতে পেরেও তিনি এই গানটি সম্পর্কে আর কোনো প্রতিবাদ বা আপত্তি জানাননি।
5. ‘জনগণমন’ গানটি নিয়ে বিরোধীরা কী অপপ্রচার করেছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘জনগণমন’ গানটি রচিত হওয়ার পর, রবীন্দ্রনাথের কিছু নিন্দুক এবং বিরোধী গোষ্ঠী একটি জঘন্য অপপ্রচার শুরু করেছিল। তারা প্রচার করেছিল যে, এই গানটি নাকি রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জের প্রতি আনুগত্য ও রাজভক্তি দেখানোর জন্য তাঁরই বন্দনাগান হিসেবে রচনা করেছেন। এই ভ্রান্ত প্রচার দীর্ঘদিন ধরে সমাজে এক অযাচিত বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল।
6. পুলিনবিহারী সেন রবীন্দ্রনাথকে কেন চিঠি লিখেছিলেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ছাত্র এবং রবীন্দ্রনাথের একান্ত অনুরাগী পুলিনবিহারী সেন সমাজে প্রচলিত অপপ্রচারগুলি শুনে অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন। ‘জনগণমন’ গানটি কি সত্যিই পঞ্চম জর্জের বন্দনাগান, নাকি এর নেপথ্যে অন্য কোনো গভীর তাৎপর্য আছে—এই চরম বিভ্রান্তি ও বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে গানের রচনার আসল প্রেক্ষাপট ও সত্যতা জানার উদ্দেশ্যেই তিনি সরাসরি রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখেছিলেন।
7. “সেই ক্ষোভের আলোড়ন অন্তরের মধ্যে…” – কোন্ ক্ষোভের কথা বলা হয়েছে?
উত্তর দেখো
উত্তর: রবীন্দ্রনাথের এক রাজভক্ত বন্ধু তাঁকে ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জের ভারত আগমন উপলক্ষে একটি স্তুতিগান রচনার জন্য পীড়াপীড়ি করেছিলেন। একজন পরাধীন দেশের কবিকে দিয়ে বিদেশি শাসকের জয়গান লেখানোর এই হীন প্রচেষ্টা রবীন্দ্রনাথের গভীর আত্মমর্যাদায় আঘাত করেছিল। এই অন্যায্য অনুরোধের ফলে কবির মনে যে তীব্র অপমানবোধ ও ক্রোধের সৃষ্টি হয়েছিল, এখানে সেই ক্ষোভেরই কথা বলা হয়েছে।
8. ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি কোন্ ঐতিহাসিক ঘটনার সময় রচিত হয় এবং এর মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি 1905 সালের লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ এবং তার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা স্বদেশি আন্দোলনের এক উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছিল। বাংলার মাটি, প্রকৃতি এবং মানুষকে ব্রিটিশদের চক্রান্ত থেকে রক্ষা করা, মানুষের মনে গভীর দেশপ্রেম জাগানো এবং হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে অটুট ঐক্য ও সম্প্রীতি গড়ে তোলাই ছিল এই গান রচনার মূল উদ্দেশ্য।
9. গগন হরকরা কে ছিলেন? তাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় কীভাবে হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: গগন হরকরা ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্গত শিলাইদহ অঞ্চলের এক অত্যন্ত সাধারণ ডাকপিয়ন বা হরকরা। পেশায় ডাকপিয়ন হলেও, তিনি ছিলেন এক অসাধারণ প্রতিভাবান বাউল গায়ক। যৌবনে জমিদারি দেখাশোনার কাজে রবীন্দ্রনাথ যখন শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে গিয়ে থাকতেন, সেই সময়েই এই মাটির কাছাকাছি থাকা বাউল গায়ক গগন হরকরার সঙ্গে তাঁর পরিচয় এবং গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
10. ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির সুরের ওপর গগন হরকরার কী প্রভাব রয়েছে?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির সুর কোনো বিদেশি বা ধ্রুপদী রাগ-রাগিণীর অনুকরণে নয়, বরং বাংলার নিজস্ব লোকসংগীতের সুরে বাঁধা। শিলাইদহে থাকার সময় বাউল গায়ক গগন হরকরার গাওয়া ‘আমি কোথায় পাব তারে’ গানটির সুর রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। সেই মুগ্ধতা থেকেই তিনি গগন হরকরার ওই অকৃত্রিম বাউল সুরের ওপর ভিত্তি করেই ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির সুরারোপ করেছিলেন।
11. “সেই মূঢ়তার উত্তর দিতে প্রবৃত্তি হয়নি” – কোন্ মূঢ়তা এবং কার প্রবৃত্তির কথা বলা হয়েছে?
উত্তর দেখো
উত্তর: এখানে ‘মূঢ়তা’ বলতে রবীন্দ্রনাথের কিছু সমালোচক এবং নিন্দুকদের সেই অজ্ঞতা ও অপপ্রচারকে বোঝানো হয়েছে, যারা প্রচার করেছিল যে ‘জনগণমন’ গানটি সম্রাট পঞ্চম জর্জের বন্দনাগান হিসেবে লেখা। আর এই ভিত্তিহীন ও অবমাননাকর অপপ্রচারের প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার কোনো প্রবৃত্তি বা ইচ্ছা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজেরই হয়নি, কারণ তিনি এই ধরনের হীন বিতর্কে জড়ানোকে নিজের আত্মসম্মানের পরিপন্থী মনে করেছিলেন।
12. ‘জনগণমন’ গানটির ইংরেজি অনুবাদ কে, কী নামে করেছিলেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘জনগণমন’ গানটির ইংরেজি অনুবাদ অন্য কেউ করেননি, স্বয়ং রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই করেছিলেন। 1919 সালে দক্ষিণ ভারত সফরের সময় মদনপল্লির থিওসফিক্যাল কলেজে বসে তিনি এই গানটিকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। তিনি এই ইংরেজি অনুবাদটির নাম দিয়েছিলেন ‘দ্য মর্নিং সং অফ ইন্ডিয়া’ (The Morning Song of India)।