মকটেস্ট বেছে নাও

অফলাইন মকটেস্ট

খুব শীঘ্রই আপলোড হবে!

নবম শ্রেণি: বাংলা, ইলিয়াস‌ – লিও তলস্তয়, বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর মান 5

অধ্যায় 3: ইলিয়াস
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)

নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:

1. “পঁয়ত্রিশ বছরের পরিশ্রমে তার বিপুল সম্পত্তি হলো।” – ইলিয়াসের এই বিপুল সম্পত্তির বিবরণ দাও। এই সম্পত্তি সে কীভাবে অর্জন করেছিল? (2+3=5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

সম্পত্তির বিবরণ: বিশ্ববিখ্যাত রুশ সাহিত্যিক লিও তলস্তয়ের লেখা ‘ইলিয়াস’ গল্পে ইলিয়াসের সম্পত্তির যে হিসাব পাওয়া যায়, তা এককথায় অভাবনীয়। তার পশুসম্পদের মধ্যে ছিল 200 টি ঘোড়া, 150 টি গোরু-মোষ এবং 1200 টি ভেড়া। এছাড়া তার অধীনে কাজ করার জন্য প্রচুর মজুর ও মজুরনি ছিল। চারপাশের বহু মানুষ তার এই বিপুল সম্পত্তি দেখে তাকে ঈর্ষা করত এবং তার বাড়িতে দূরদূরান্ত থেকে প্রচুর অতিথি আসত।

সম্পত্তি অর্জনের উপায়: বিয়ের সময় ইলিয়াস মোটেই ধনী ছিল না। বাবার মৃত্যুর পর সে উত্তরাধিকার সূত্রে মাত্র 7 টি ঘটকী, 2 টি গোরু এবং 20 টি ভেড়া পেয়েছিল। কিন্তু ইলিয়াস ও তার স্ত্রী শ্যাম-শেমাগি ছিল অত্যন্ত পরিশ্রমী। তারা ভোরবেলা সবার আগে ঘুম থেকে উঠত এবং রাতে সবার শেষে ঘুমোতে যেত। সারাদিন তারা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটত। পশুদের যত্ন নেওয়া, দুধ দোওয়া, কুমিস তৈরি করা থেকে শুরু করে সব কাজ তারা নিজের হাতে তদারকি করত। এভাবেই টানা 35 বছরের অক্লান্ত ও নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের ফলেই ইলিয়াস এই বিপুল ধনসম্পত্তির মালিক হয়েছিল।

2. “ইলিয়াসের সম্পত্তিতে টান পড়ল।” – ইলিয়াসের অবস্থা কীভাবে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল এবং সে কীভাবে সর্বস্বান্ত হয়েছিল তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

লিও তলস্তয়ের ‘ইলিয়াস’ গল্পে ইলিয়াসের জীবনের উত্থানের মতোই তার পতন বা সর্বস্বান্ত হওয়ার কাহিনিও অত্যন্ত শিক্ষণীয় এবং মর্মান্তিক। তার এই চূড়ান্ত পতনের পেছনে মূলত তিনটি কারণ দায়ী ছিল:

প্রথমত, সম্পত্তি বাড়ার সাথে সাথে ইলিয়াসের দুই ছেলে অত্যন্ত বিলাসী ও অবাধ্য হয়ে ওঠে। বড়ো ছেলেটি একটি মারামারির ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে অকালে মারা যায়। ছোটো ছেলেটি এক ঝগড়াটে মেয়েকে বিয়ে করে এবং বাবার অবাধ্য হয়। বাধ্য হয়ে ইলিয়াস তাকে একটি বাড়ি ও কিছু গবাদি পশু দিয়ে আলাদা করে দেয়। ফলে তার এতদিনের জমানো সম্পত্তিতে প্রথম একটি বড়ো টান পড়ে।

দ্বিতীয়ত, এর কিছুদিন পরেই প্রকৃতির নির্মম পরিহাসে তাদের ভেড়ার পালে ভয়ংকর মড়ক বা রোগ দেখা দেয় এবং প্রচুর ভেড়া মারা যায়। এর পরের বছরই প্রবল খরা দেখা দেওয়ায় পশুর খাবারের তীব্র অভাব ঘটে, যার ফলে শীতকালে তার আরও অনেক গবাদি পশু মারা যায়।

তৃতীয়ত, ইলিয়াসের এই দুর্বল অবস্থার সুযোগ নিয়ে কিরঘিজ উপজাতির চোরেরা তার সবচেয়ে ভালো ঘোড়াগুলি চুরি করে নিয়ে যায়। এইভাবে একের পর এক বিপদের আঘাতে তার অবস্থার এতটাই অবনতি হয় যে, 70 বছর বয়সে সে নিজের পশমের কোট, ঘোড়ার জিন এবং শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে সম্পূর্ণ পথের ভিখারি হয়ে পড়ে।

3. “পঞ্চাশ বছর ধরে সুখ খুঁজেছি, এতদিনে পেয়েছি।” – উক্তিটির আলোকে ইলিয়াস ও তার স্ত্রীর প্রকৃত সুখের স্বরূপটি বিশ্লেষণ করো। তারা কীভাবে এই সুখ পেয়েছিল? (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

লিও তলস্তয়ের ‘ইলিয়াস’ গল্পের মূল নির্যাস এই উক্তিটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে। 50 বছর ধরে ইলিয়াস ও তার স্ত্রী শ্যাম-শেমাগি ভেবেছিল যে ধনসম্পদ ও ঐশ্বর্যই হলো জীবনের প্রকৃত সুখ। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তারা এক গভীর সত্য উপলব্ধি করতে পেরেছিল।

বিপুল সম্পত্তির মালিক হওয়ার পর তাদের জীবনে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি ছিল না। রাতে ঘুমোনোর সময়ও তাদের চিন্তা হতো যে নেকড়ে এসে ভেড়ার পাল খেয়ে ফেলবে বা চোর এসে ঘোড়া চুরি করবে। মজুরেরা ঠিকমতো কাজ করছে কি না বা অতিথিদের আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি হচ্ছে কি না— এই চিন্তায় তাদের সারাক্ষণ প্রবল মানসিক চাপের মধ্যে কাটাতে হতো। এমনকি ঈশ্বরের উপাসনা করার বা স্বামী-স্ত্রী নিজেদের মধ্যে শান্তিতে দুটি কথা বলার সময়ও তাদের ছিল না।

কিন্তু 70 বছর বয়সে সব কিছু হারিয়ে তারা যখন প্রতিবেশী মহম্মদ শাহের বাড়িতে সামান্য মজুর হিসেবে কাজ শুরু করে, তখন তাদের জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়। তাদের কোনো বিশাল দায়িত্ব ছিল না, হারানোর কোনো ভয় ছিল না। তারা মালিকের কাজ করত এবং নিশ্চিন্তে ঘুমাত। এই জীবনে তাদের কোনো পাপ বা দুশ্চিন্তা ছিল না, বরং ঈশ্বরের নাম করার অফুরন্ত সময় তারা পেয়েছিল। দুশ্চিন্তাহীন, শান্তিময় এবং ঈশ্বরমুখী এই জীবনকেই তারা প্রকৃত সুখ বলে উপলব্ধি করেছিল, যা ধনসম্পদ তাদের কোনোদিন দিতে পারেনি।

4. ‘ইলিয়াস’ গল্পে মহম্মদ শাহের চরিত্রটি কীভাবে ফুটে উঠেছে তা বিস্তারিত আলোচনা করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

লিও তলস্তয়ের ‘ইলিয়াস’ গল্পে মহম্মদ শাহ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বচরিত্র। তার চরিত্রের মধ্যে দিয়ে গল্পের মূল মানবিক দিকটি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

মহম্মদ শাহ খুব বেশি ধনী না হলেও সে ছিল একজন অত্যন্ত ভালো এবং হৃদয়বান মানুষ। একসময় ইলিয়াস যখন বিত্তশালী ছিল, তখন মহম্মদ শাহও তার আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিল। সে এই ঋণ ভোলেনি। 70 বছর বয়সে ইলিয়াস যখন তার সমস্ত সম্পত্তি হারিয়ে কপর্দকশূন্য হয়ে পড়ে, তখন তার সেই চরম দুর্দশা দেখে মহম্মদ শাহের মনে গভীর করুণার সৃষ্টি হয়। সে ইলিয়াস ও তার স্ত্রীকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেয় এবং তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তরমুজ খেত পরিষ্কার করা বা ঘোড়ী দোওয়ার মতো সহজ কাজ করতে বলে।

সমাজের অন্যান্য মানুষ যখন সর্বস্বান্ত ইলিয়াসকে ভুলে গিয়েছিল, তখন মহম্মদ শাহ মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। অতিথিদের সামনেও সে ইলিয়াসকে অসম্মান করেনি, বরং তার অতীত জীবনের কথা অত্যন্ত সম্মানের সাথে উল্লেখ করেছিল। মহম্মদ শাহের চরিত্রটি আমাদের শেখায় যে বিপদের দিনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হলো মানবতার শ্রেষ্ঠ রূপ।

5. “অতিথিরা হেসে উঠল।” – অতিথিদের হাসির কারণ কী? এরপর ইলিয়াস তাদের কী বুঝিয়েছিল? (2+3=5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

হাসির কারণ: মহম্মদ শাহের বাড়িতে আসা অতিথিরা যখন ইলিয়াসের স্ত্রী শ্যাম-শেমাগিকে তার বর্তমান জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তখন বৃদ্ধা জানায় যে, 50 বছর ধনসম্পত্তির মধ্যে থেকেও তারা যে সুখ পায়নি, আজ মজুর বৃত্তি গ্রহণ করে তারা সেই প্রকৃত শান্তি পেয়েছে। সাধারণ মানুষের ধারণা অনুযায়ী, ধনসম্পদই হলো আসল সুখ। তাই অতিথিরা ভেবেছিল, বৃদ্ধা হয়তো নিজের চরম দারিদ্র্য ও কষ্ট লুকানোর জন্যই এমন রসিকতা বা তামাশা করছে। এই অজ্ঞতা ও ভুল ধারণার বশবর্তী হয়েই অতিথিরা হেসে উঠেছিল।

ইলিয়াসের বক্তব্য: অতিথিদের হাসতে দেখে ইলিয়াস অত্যন্ত শান্তভাবে এগিয়ে এসে তাদের ভুলটি ভেঙে দেয়। সে বলে যে, এটি মোটেও কোনো তামাশা বা রসিকতা নয়, এটি তাদের জীবনের এক চরম বাস্তব সত্য। সে বোঝায় যে, অর্থ বা সম্পত্তি মানুষকে কেবল বাইরের আরাম দিতে পারে, কিন্তু তা মনের ভেতরের প্রকৃত শান্তি কেড়ে নেয়। সম্পত্তির লোভে মানুষ ঈশ্বরকে ভুলে যায়। আজ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেও পরিশ্রম করে ঈশ্বরের উপাসনা করার মাঝেই যে তারা পরম শান্তি খুঁজে পেয়েছে, সেই সত্যটিই ইলিয়াস অতিথিদের গভীরভাবে বুঝিয়েছিল।

6. ‘ইলিয়াস’ গল্পটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। অথবা, এই গল্পের মূল শিক্ষণীয় দিকটি আলোচনা করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

সাহিত্যে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ সার্থক নামকরণের মাধ্যমেই রচনার মূল বিষয়বস্তু পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্ববিখ্যাত রুশ সাহিত্যিক লিও তলস্তয়ের আলোচ্য গল্পটির ‘ইলিয়াস’ নামকরণটি বিষয়বস্তুর দিক থেকে সম্পূর্ণ সার্থক এবং শিক্ষণীয়।

গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ঘটনাটি আবর্তিত হয়েছে প্রধান চরিত্র ইলিয়াসকে কেন্দ্র করে। তার প্রথম জীবনের দারিদ্র্য, 35 বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে তার বিপুল সম্পত্তির মালিক হওয়া, দুই ছেলের অবাধ্যতা, পশুর মড়ক ও কিরঘিজদের চুরির কারণে তার পুনরায় সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়া এবং অবশেষে মহম্মদ শাহের বাড়িতে মজুর জীবন গ্রহণ করা— গল্পের প্রতিটি স্তরে ইলিয়াসই হলো প্রধান বিন্দু।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই গল্পের যে মূল শিক্ষা— “ধনসম্পদ মানুষকে প্রকৃত সুখ দিতে পারে না, বরং ঈশ্বরভক্তি ও মানসিক শান্তিই হলো আসল সুখ”— তা ইলিয়াস ও তার স্ত্রীর জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয়েছে। যেহেতু ইলিয়াসের জীবন এবং তার উপলব্ধিই এই গল্পের মূল চালিকাশক্তি, তাই এই চরিত্রকেন্দ্রিক নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক ও যুক্তিযুক্ত হয়েছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার