নবম শ্রেণি: বাংলা, ‘কলিঙ্গ দেশে ঝড় বৃষ্টি’ -মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর মান 2
অধ্যায় 1: কলিঙ্গ দেশে ঝড়-বৃষ্টি
(সংক্ষিপ্ত / ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 3)
নিচের প্রশ্নগুলির প্রাসঙ্গিক উত্তর দাও:
1. “দেখিয়া প্রজার মনে লাগে চমৎকার” – প্রজাদের মনে কেন ‘চমৎকার’ বা বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: কলিঙ্গ দেশের আকাশে হঠাৎ করেই ঈশান কোণে (উত্তর-পূর্ব দিকে) মেঘ জমা হতে শুরু করে। দেখতে দেখতে সেই ঘন কালো মেঘ চারদিকের আকাশ ঢেকে ফেলে এবং প্রবল মেঘের গর্জনের সাথে বিদ্যুতের ঝলকানি শুরু হয়। বিনা মেঘে হঠাৎ এমন ভয়ংকর দুর্যোগের পূর্বাভাস দেখেই আতঙ্ক ও বিস্ময়ে কলিঙ্গের প্রজাদের মনে ‘চমৎকার’ বা চরম ভীতি মিশ্রিত বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছিল।
2. “বিপাকে ভবন ছাড়ি প্রজা দিল রড়” – প্রজারা কেন বিপাকে পড়েছিল এবং তারা কী করেছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: চারদিক ঘন কালো মেঘে ঢেকে গিয়ে এমন অন্ধকার নেমে আসে যে, প্রজারা নিজেদের শরীরও দেখতে পাচ্ছিল না। এর সঙ্গে হু হু শব্দে প্রবল ধূলিঝড় বইতে শুরু করে এবং মুষলধারে বৃষ্টি নামলে কলিঙ্গের প্রজারা চরম বিপাকে বা বিপদে পড়ে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা নিজেদের প্রিয় ঘরবাড়ি (ভবন) ছেড়ে প্রাণভয়ে দ্রুতগতিতে ছুট (রড়) দিয়েছিল।
3. “চারি মেঘে জল দেয় অষ্ট গজরাজ” – ‘চারি মেঘ’ এবং ‘অষ্ট গজরাজ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর দেখো
উত্তর: হিন্দু পুরাণ অনুসারে ‘চারি মেঘ’ হলো 4 প্রকার প্রধান মেঘ— সম্বর্ত, আবর্ত, পুষ্কর ও দ্রোণ। অন্যদিকে ‘অষ্ট গজরাজ’ বলতে 8 টি দিকের রক্ষাকারী 8 টি শ্রেষ্ঠ হাতিকে (ঐরাবত, পুণ্ডরীক, বামন, কুমুদ, অঞ্জন, পুষ্পদত্ত, সার্বভৌমিক ও সুপ্রতীক) বোঝানো হয়েছে। কবির কল্পনায়, এই 8 টি হাতি 4 প্রকার মেঘের সাহায্যে হাতির শুঁড়ের মতো বিপুল ধারায় কলিঙ্গে বৃষ্টি বর্ষণ করছিল।
4. কলিঙ্গের প্রজারা কেন ঋষি জৈমিনিকে স্মরণ করছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: কলিঙ্গ দেশে ভয়ংকর ঝড়-বৃষ্টির পাশাপাশি আকাশ কাঁপিয়ে মুহুর্মুহু বজ্রপাত হতে শুরু করেছিল। প্রাচীন ভারতীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বেদব্যাস মুনির শিষ্য ঋষি জৈমিনির নাম স্মরণ করলে বজ্রপাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তাই প্রাণভয়ে ভীত কলিঙ্গের অসহায় প্রজারা বাজ পড়া থেকে বাঁচতে একমনে ঋষি জৈমিনিকে স্মরণ করতে থাকে।
5. “পরিচ্ছিন্ন নাহি সন্ধ্যা দিবস রজনী” – এমন পরিস্থিতির কারণ কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: কলিঙ্গ দেশের আকাশ অবিরাম 7 দিন ধরে গাঢ় কালো মেঘে ঢাকা ছিল। মেঘের ঘনত্ব এতটাই বেশি ছিল যে, সূর্যের আলো বা চাঁদের আলো কিছুই পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারছিল না। ফলে চারদিক সবসময় ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে ছিল, যার জন্য কলিঙ্গের অধিবাসীরা দিন (দিবস), রাত (রজনী) বা সন্ধ্যা আলাদা করে পরিচ্ছিন্ন বা বুঝতে পারছিল না।
6. “নিরবধি সাত দিন বৃষ্টি নিরন্তর” – এর ফলে কলিঙ্গ দেশে কী রূপ প্রভাব পড়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: একটানা 7 দিন অবিরাম বৃষ্টির ফলে কলিঙ্গ দেশ জলে সম্পূর্ণ ডুবে গিয়েছিল। জলমগ্ন হয়ে যাওয়ায় পথ এবং ঘাটের কোনো পার্থক্য ছিল না। মাঠে বোনা কৃষকদের ফসল উলটে গিয়ে পচে নষ্ট হয়েছিল এবং জলের তলায় গর্ত ডুবে যাওয়ায় সাপেরা ডাঙায় ভেসে বেড়াচ্ছিল। সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল।
7. কলিঙ্গ দেশে ব্যাঙেরা কেন ডাকতে ভুলে গিয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: কলিঙ্গের আকাশে 7 দিন ধরে জমাট বাঁধা কালো মেঘের কারণে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারেনি। চারদিক সবসময় অন্ধকারে ঢেকে থাকায় দিন ও রাতের মধ্যে কোনো পার্থক্য বোঝা যাচ্ছিল না। সাধারণত ব্যাঙেরা রাতে ডাকে, কিন্তু দিন-রাতের এই বিভ্রান্তি এবং অবিরাম বৃষ্টির প্রবল শব্দে তারা ডাকতেই ভুলে গিয়েছিল।
8. “ভাদ্রমাসে যেন পড়ে থাকা তাল” – এই উপমাটি কবি কেন ব্যবহার করেছেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: কলিঙ্গ দেশে প্রবল বৃষ্টির সাথে আকাশ থেকে ভয়ংকর শিলাবৃষ্টি হচ্ছিল। বড়ো বড়ো শিলাগুলি যখন ঘরের চাল ভেদ করে মেঝেতে এসে পড়ছিল, তখন সেগুলির বিশাল আকার বোঝাতে কবি এই উপমা ব্যবহার করেছেন। ভাদ্র মাসে যেমন বড়ো বড়ো পাকা তাল গাছ থেকে সজোরে মাটিতে পড়ে, আকাশ থেকে পড়া শিলাগুলিও ঠিক তেমনই বড়ো ও ভারী ছিল।
9. “উঠে পড়ে ঘরগুলা করে দলমল” – ঘরগুলির এমন অবস্থা হওয়ার কারণ কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: কলিঙ্গ দেশে প্রবল ঝড়-বৃষ্টির সাথে সাথে ভয়ংকর বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল। দেবীর আদেশে নদনদীগুলি পর্বতের মতো উঁচু ঢেউ তুলে কলিঙ্গের দিকে ছুটে এসেছিল। সেই বিশাল ঢেউ ও প্রবল জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কায় কলিঙ্গের সাধারণ মাটির ঘরগুলি ভিত্তি হারিয়ে জলের স্রোতে ভাসতে শুরু করে এবং টলমল করতে থাকে।
10. কলিঙ্গের মাঠে বোনা শস্যের কী পরিণতি হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: কলিঙ্গ দেশে সৃষ্ট হওয়া একটানা 7 দিনের প্রবল বৃষ্টি এবং ভয়ংকর বন্যার কারণে সম্পূর্ণ শস্যক্ষেত্র জলের তলায় ডুবে যায়। এর ফলে কৃষকদের কষ্ট করে বোনা ফসল সম্পূর্ণ উলটে যায় এবং পচে নষ্ট হয়ে যায়। এই ক্ষতি কলিঙ্গের কৃষকদের জীবনে চরম হাহাকার ডেকে এনেছিল।
11. “গর্ত ছাড়ি ভুজঙ্গ ভাসিয়া বুলে জলে” – এমন পরিস্থিতির কারণ কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: একটানা 7 দিন ধরে মুষলধারে বৃষ্টির ফলে কলিঙ্গ দেশ একটি বিশাল জলাশয়ে পরিণত হয়েছিল। পথ, ঘাট, প্রান্তর সব কিছু জলের তলায় তলিয়ে যাওয়ায় সাপ বা ভুজঙ্গদের থাকার গর্তগুলিও জলে ভরে যায়। ফলে প্রাণ বাঁচাতে তারা গর্ত ছেড়ে ডাঙার খোঁজে চারদিকের বন্যার জলে ভেসে বেড়াচ্ছিল।
12. “করিকরে সমান বরিষে জলধারা” – পঙ্ক্তিটির অর্থ বুঝিয়ে দাও।
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘করিকর’ শব্দের অর্থ হলো হাতির শুঁড়। কলিঙ্গ দেশে বৃষ্টির তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, তা কোনো সাধারণ বৃষ্টির মতো পড়ছিল না। হাতির শুঁড় দিয়ে যেমন মোটা ধারায় প্রবল বেগে জল ছিটকে বের হয়, আকাশ থেকেও ঠিক তেমনই মোটা ও অবিরাম ধারায় জলবর্ষণ হচ্ছিল, যা বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।
13. “ধূলিময় চারিদিক ছাইল এমন” – কলিঙ্গের পরিবেশ ধূলিময় হয়ে ওঠার কারণ কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: বৃষ্টি শুরু হওয়ার ঠিক আগেই কলিঙ্গের ঈশান কোণে জমা হওয়া মেঘ চারদিক অন্ধকার করে দেয়। সেই সঙ্গে হু হু শব্দে প্রবল বাতাস বা ঘূর্ণিঝড় বইতে শুরু করে। সেই ঝড়ের দাপটে মাঠের ধুলো উড়ে গিয়ে চারপাশ এমনভাবে ঢেকে দেয় যে, পুরো পরিবেশ ধূসর ও ধূলিময় হয়ে উঠেছিল এবং সবুজ ফসল ধুলোয় ঢাকা পড়েছিল।
14. কলিঙ্গ দেশে ঝড়-বৃষ্টির সময় মঠ ও অট্টালিকার কী দশা হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: কলিঙ্গ দেশে কেবল বৃষ্টিই হয়নি, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বইছিল সব কিছু চূর্ণ করে দেওয়ার মতো ভয়ংকর ঝড় বা ‘প্রভঞ্জন’। সেই প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে এবং পর্বতপ্রমাণ ঢেউয়ের ধাক্কায় কলিঙ্গের বড়ো বড়ো পাকা মঠ এবং অট্টালিকাগুলিও নিজেদের ভিত্তি ধরে রাখতে পারেনি, সেগুলি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে পড়েছিল।
15. “চণ্ডীর আদেশে ধায় নদ-নদীগণ” – নদনদীগণ কোথায় এবং কেন ধেয়ে এসেছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: দেবী চণ্ডীর নির্দেশ পেয়ে নদনদীগুলি প্রবল জলোচ্ছ্বাস ঘটিয়ে পর্বতের মতো বড়ো বড়ো ঢেউ তুলে কলিঙ্গ দেশের দিকে ধেয়ে এসেছিল। দেবীর উদ্দেশ্য ছিল কলিঙ্গ দেশকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ধ্বংস করে প্রজাদের সেখান থেকে বিতাড়িত করা, যাতে তারা গুজরাট নগরীতে গিয়ে বসবাস শুরু করে।
16. মেঘের গর্জনের ভয়াবহতা কবিতায় কীভাবে বোঝানো হয়েছে?
উত্তর দেখো
উত্তর: মেঘের ডাক অত্যন্ত ভয়ংকর ছিল। মুষলধারে বৃষ্টির সাথে এমন গম্ভীর শব্দে মেঘ ডাকছিল যে, কাছাকাছি থাকা দুজন মানুষের কথাও কেউ শুনতে পাচ্ছিল না। এই গগনভেদী শব্দ এবং মুহুর্মুহু বজ্রপাতের ভয়াবহতা কলিঙ্গের প্রজাদের মনে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল।
17. কলিঙ্গ দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের নেপথ্যে মূল কারণটি কী ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের নেপথ্যে মূল কারণ ছিল দেবী চণ্ডীর ইচ্ছা। দেবী ব্যাধ কালকেতুকে দিয়ে গুজরাট নগরী স্থাপন করিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে প্রজারা থাকতে চায়নি। তাই কলিঙ্গের প্রজাদের বিপদে ফেলে তাদের কলিঙ্গ ত্যাগে বাধ্য করার জন্যই দেবী মায়াজাল বিস্তার করে এই প্রলয়ের সৃষ্টি করেছিলেন।
18. “নিরবধি সাত দিন” – এই 7 দিনে কলিঙ্গের অবস্থা সংক্ষেপে কী দাঁড়িয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: একটানা 7 দিনের প্রবল ঝড়-বৃষ্টি, বন্যা এবং শিলাপাতে কলিঙ্গ দেশ সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। মাঠের শস্য নষ্ট হয়েছিল, মঠ-অট্টালিকা চূর্ণ হয়েছিল এবং পথঘাট ডুবে একাকার হয়ে গিয়েছিল। প্রাণ বাঁচাতে প্রজারা নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র পালাতে বাধ্য হয়েছিল।