মকটেস্ট বেছে নাও

অফলাইন মকটেস্ট

খুব শীঘ্রই আপলোড হবে!

নবম শ্রেণি: বাংলা, খেয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর মান 5

অধ্যায় 8: খেয়া
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)

নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:

1. “পৃথিবীতে কত দ্বন্দ্ব কত সর্বনাশ/ নতুন নতুন কত গড়ে ইতিহাস”— পঙ্‌ক্তি দুটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘খেয়া’ কবিতায় মানবসভ্যতার দুটি ভিন্ন রূপের চিত্র তুলে ধরেছেন। একদিকে রয়েছে শান্ত পল্লিজীবন, অন্যদিকে রয়েছে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মত্ত বৃহত্তর পৃথিবী। উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তি দুটিতে এই বৃহত্তর পৃথিবীর রক্তাক্ত ও সংঘাতময় রূপটিই প্রতিফলিত হয়েছে।

পৃথিবীর ইতিহাস কখনোই স্থির এবং শান্ত নয়। যুগ যুগ ধরে মানুষ ক্ষমতার মোহে, সাম্রাজ্য বিস্তারের লালসায় এবং সম্পদের লোভে একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়েছে, রক্তের বন্যা বয়ে গেছে এবং অজস্র নিরীহ মানুষের প্রাণহানির মধ্য দিয়ে ভয়ংকর ‘সর্বনাশ’ সাধিত হয়েছে। এই ধ্বংস এবং রক্তপাতের ওপর দাঁড়িয়েই এক সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে এবং অন্য এক নতুন শক্তির উত্থান হয়েছে।

ক্ষমতার এই পালাবদল এবং ভাঙাগড়ার খেলাকেই কবি ‘নতুন ইতিহাস’ গড়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। কিন্তু কবির মতে, এই ইতিহাস আসলে মানুষের লোভ এবং অহংকারেরই ইতিহাস। গ্রামের সাধারণ মানুষের সহজ-সরল জীবনের কাছে এই দ্বন্দ্ব এবং রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের কোনো স্থায়ী মূল্য নেই। ক্ষমতার এই আস্ফালন যে মানবসভ্যতার বুকে কেবল ক্ষতের সৃষ্টি করে, পঙ্‌ক্তি দুটিতে সেই চরম সত্যটিই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

2. “রক্তপ্রবাহের মাঝে সোনার মুকুট/ ফুটে আর টুটে”— ‘সোনার মুকুট’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? পঙ্‌ক্তিটির অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝিয়ে দাও। (1+4=5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

সোনার মুকুট: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খেয়া’ কবিতায় ‘সোনার মুকুট’ হলো রাজশক্তি, সাম্রাজ্যের দম্ভ, অহংকার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এক শক্তিশালী প্রতীক।

অন্তর্নিহিত অর্থ: মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত সংঘাত এবং রক্তপাতের ইতিহাস। পৃথিবীতে কোনো সাম্রাজ্যই শান্তি বা ভালোবাসার মাধ্যমে গড়ে ওঠেনি। এক রাজা যখন অন্য রাজ্য দখল করে, তখন অজস্র সাধারণ মানুষের রক্ত ঝরে। মানুষের এই রক্তের স্রোতের ওপর দাঁড়িয়েই ক্ষমতালিপ্সু মানুষ ‘সোনার মুকুট’ মাথায় পরে বা সাময়িকভাবে ক্ষমতার শীর্ষে ‘ফুটে’ ওঠে।

কিন্তু এই ক্ষমতা বা অহংকার কখনোই চিরস্থায়ী হয় না। সময়ের অমোঘ নিয়মে বা কালস্রোতে একদিন সেই পরাক্রমশালী শক্তিরও পতন ঘটে। অন্য কোনো নতুন শক্তি এসে পুরনো রাজশক্তিকে ধ্বংস করে দেয়। তখন সেই অহংকারের ‘সোনার মুকুট’ ধুলোয় লুটিয়ে পড়ে বা ‘টুটে’ যায়। ক্ষমতার এই উত্থান এবং পতনের চরম অস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক রূপটি বোঝাতেই কবি এই অসামান্য রূপক পঙ্‌ক্তিটি ব্যবহার করেছেন।

3. ‘খেয়া’ কবিতায় একদিকে পল্লিজীবনের শান্ত রূপ এবং অন্যদিকে বৃহত্তর জগতের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কীভাবে ফুটে উঠেছে, তা আলোচনা করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খেয়া’ কবিতায় দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী জীবনচিত্র অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে— একটি হলো চিরন্তন পল্লিজীবন এবং অন্যটি হলো সংঘাতময় বৃহত্তর বিশ্ব।

পল্লিজীবনের শান্ত রূপ: কবিতার শুরুতেই আমরা দেখি নদীর দুই তীরে দুটি গ্রাম অবস্থিত। তাদের মধ্যে কোনো বিদ্বেষ নেই, বরং রয়েছে নিবিড় আত্মীয়তা এবং জানাশোনা। খেয়া নৌকো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই দুই পারের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। মানুষ নিজেদের প্রাত্যহিক প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হয় এবং কাজ শেষে শান্তিতে ঘরে ফেরে। এই জীবন অত্যন্ত সহজ, সরল, প্রবহমান এবং চিরন্তন।

বৃহত্তর জগতের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব: এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় বাইরের পৃথিবীতে। সেখানে প্রতিনিয়ত সাম্রাজ্য বিস্তারের লালসায় রাজায় রাজায় যুদ্ধ চলে। মানুষের রক্তপাতে নতুন ইতিহাস তৈরি হয়, সোনার মুকুট অর্থাৎ রাজক্ষমতার উত্থান ও পতন ঘটে। সভ্যতার নব নব তৃষ্ণা ও ক্ষুধার কারণে কেবল হলাহল বা বিষাক্ত সংঘাতের সৃষ্টি হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বৃহত্তর জগতের এই রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতার পালাবদল পল্লিজীবনের এই শাশ্বত ও শান্ত রূপকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ বা পরিবর্তন করতে পারে না।

4. “এই খেয়া চিরদিন চলে নদীস্রোতে”— ‘খেয়া’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? এটি চিরদিন চলার কারণ কী? কবিতা অবলম্বনে লেখো। (2+3=5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

খেয়ার তাৎপর্য: আক্ষরিক অর্থে ‘খেয়া’ হলো নদী পারাপারের একটি সাধারণ নৌকো। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কবিতায় ‘খেয়া’ হলো একটি অসামান্য রূপক। এটি মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মিক বন্ধন, সম্প্রীতি এবং চিরন্তন যোগাযোগের প্রতীক। একইসঙ্গে এটি কালনদীর বুকে বয়ে চলা শাশ্বত মানবজীবনের অবিরাম যাত্রারও এক প্রতীক।

চিরদিন চলার কারণ: পৃথিবীতে ক্ষমতার দম্ভ, রাজবংশের উত্থান-পতন বা সাম্রাজ্যের ভাঙাগড়া একটি অস্থায়ী ঘটনা। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, ইতিহাস বদলায়, কিন্তু এর কোনোটিই মানবজীবনের স্বাভাবিক ছন্দকে থামাতে পারে না। গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবন মূলত বেঁচে থাকার স্বাভাবিক তাগিদ এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের মধ্যে যোগাযোগের যে প্রয়োজন, একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর যে মানবিকতা, তা রাষ্ট্রীয় পটপরিবর্তনের অনেক ঊর্ধ্বে। যতদিন পৃথিবীতে মানবসমাজ থাকবে, মানুষের এই প্রাত্যহিক কর্মপ্রবাহ এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট থাকবে। এই চিরন্তন জীবনধারা এবং মানবিক সম্পর্কের বাহক হিসেবেই খেয়া নৌকো চিরদিন নদীস্রোতে পারাপার করে।

5. ‘খেয়া’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। (5)

উত্তর দেখো
উত্তর:

সাহিত্যে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক, কারণ এর মাধ্যমেই রচনার মূল ভাববস্তু বা অন্তর্নিহিত দর্শন পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোচ্য কবিতাটির ‘খেয়া’ নামকরণটি বিষয়বস্তু এবং রূপক— উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত সার্থক।

কবিতার শুরুতেই আমরা দেখি, একটি সাধারণ খেয়া নৌকো নদীর দুই তীরের দুটি গ্রামের মানুষকে যুক্ত করেছে। মানুষ তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনে এই খেয়ায় পারাপার করে। এরপর কবি বৃহত্তর পৃথিবীর চিত্র আনেন, যেখানে সাম্রাজ্য বিস্তারের লালসায় রাজায় রাজায় দ্বন্দ্ব হয়, রক্তপাত হয় এবং সভ্যতার বুকে কেবল হলাহল বা বিষ ওঠে। ক্ষমতার এই আস্ফালন মানুষকে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং ধ্বংস ডেকে আনে।

কিন্তু ক্ষমতার এই অহংকার কখনোই চিরস্থায়ী নয়, তা কালস্রোতে বিলীন হয়ে যায়। এর বিপরীতে যা চিরস্থায়ী, তা হলো মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ এবং আত্মীয়তার বন্ধন। আর এই যোগাযোগের নীরব প্রতীক হলো ‘খেয়া’। রাজনীতি বা ইতিহাসের পালাবদল এই খেয়া নৌকোর পারাপারকে অর্থাৎ সাধারণ মানুষের প্রবহমান জীবনযাত্রাকে স্তব্ধ করতে পারে না। যেহেতু খেয়া নৌকোই এই কবিতায় শাশ্বত মানবজীবন এবং মানববন্ধনের মূল প্রতীক হিসেবে সমগ্র কবিতার ভাববস্তুকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তাই ‘খেয়া’ নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক এবং ব্যঞ্জনাধর্মী হয়েছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার